হোল্ডিং ট্যাক্স খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি

বছরে ৫০ কোটি টাকার রাজস্ববঞ্চিত বিসিসি

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিসিসি

হোল্ডিং ট্যাক্স খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বেপরোয়া অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি)। হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া পুনঃজরিপে এ খাতে দুর্নীতির ব্যাপক তথ্য উঠে এসেছে। প্রথম ধাপে চারশ’র মতো ভবনের পুনঃজরিপেই ধরা পড়েছে বড় অংকের দুর্নীতি।

কর্পোরেশনের সচিব এবং রাজস্ব কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ইসরাইল হোসেন বলেন, সব হোল্ডিংয়ের পুনঃজরিপ শেষ হলে এ খাতের আয় বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৪ গুণ হবে। সেক্ষেত্রে এ খাতে বছরে আয় বর্তমানের ২০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ হোল্ডিং ট্যাক্স খাতে বছরে ৫০ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে বিসিসি।

২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি জারি হওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ ভাগ করা হয় নগরীকে। মূল শহর, মধ্যম শহর এবং বর্ধিত শহর আখ্যা দিয়ে বর্গফুট প্রতি সর্বনিম্ন ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত কর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ হার অনুযায়ী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারিত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের পর মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ নতুনভাবে সব হোল্ডিংয়ের কর নির্ধারণ জরিপের নির্দেশ দেন। আর নতুন জরিপেই ধরা পড়ে অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয়গুলো।

বিষয়টি নিয়ে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, দুর্নীতির কারণে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন শুরু থেকেই পঙ্গু হয়ে ছিল। জ্বালানি খাতে মাসে লোপাট হতো প্রায় ১০ লাখ টাকা। ভুয়া কর্মচারীর নামে বেতন তুলে গায়েব করে ফেলা হতো মাসে ৬০-৭০ লাখ টাকা। এ যে হোল্ডিং ট্যাক্স, এ খাতে দুর্নীতি না হলে বছরে আমাদের আয় বাড়ত কম হলেও ৫০ কোটি টাকা।

মেয়র বলেন, ২০০৫ সালের পর থেকে যারা অবসরে গেছেন তাদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। আমি ১ দিনে তাদের সাড়ে ৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর যাবতীয় বকেয়া পরিশোধের পরও আমাদের রাজস্ব খাতে জমা আছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। আমার ঘোষণা ছিল, নগর ভবনকে দুর্নীতিমুক্ত করা। সেটা বাস্তবায়ন করছি। নগর ভবন এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের আয় দিয়ে ছোটখাটো উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নসহ চাহিদা মেটাতে পারব।

নতুন জরিপ নিয়ে নগর ভবনের অ্যাসেসমেন্ট বিভাগের প্রধান মুশফিক আহসান আজম বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ৪ হাজার হোল্ডিং চিহ্নিত করে নতুনভাবে অ্যাসেসমেন্ট চালানো হয় যেগুলোর স্থাপনার আকার পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৫শ’র মতো এমন স্থাপনার অ্যাসেসমেন্ট শেষ হয়েছে। আর এর সবক’টাতেই ধরা পড়েছে শুভংকরের ফাঁকি। বাজার রোড এলাকায় থাকা একটি ইলেকট্রিকাল কোম্পানির কারখানা আগে যেখানে ট্যাক্স দিত মাত্র ৩ হাজার টাকা সেখানে নতুন অ্যাসেমেন্টে করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ টাকা।

সদর রোডের একটি অভিজাত খাবার প্রতিষ্ঠান এবং সংলগ্ন অন্য আরেকটি স্থাপনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই দুটি প্রতিষ্ঠান মিলে বছরে হোল্ডিং ট্যাক্স দিত মাত্র ২৭ হাজার টাকা। নতুন জরিপে এর একটি প্রতিষ্ঠানেরই হোল্ডিং ট্যাক্স এসেছে ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।

অ্যাসেসমেন্ট বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, নতুন জরিপে হওয়া প্রায় সব ভবনেই ধরা পড়ছে লাখ লাখ টাকার ট্যাক্স ফাঁকির ঘটনা। ২৩নং ওয়ার্ডে খন্দকার মোহসেনা বেগম নামে এক গ্রাহক তার দ্বি-তল ভবনের জন্য বছরে ট্যাক্স দিতেন ৪ হাজার টাকা। সম্প্রতি ভবনটি ৪ তলা করেছেন। নতুন জরিপে এ ভবনের ট্যাক্স দাঁড়িয়েছে ২ লাখ টাকা। ১১নং ওয়ার্ডের মেডিকেল কলেজ লেনের আবদুর রহিম সিকদার তার ১ তলা ভবনের জন্য বছরে ট্যাক্স দিতেন ১ হাজার ৬২০ টাকা। ভবনটি ৭ তলা করার পর নতুন জরিপে এর ট্যাক্স এসেছে ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।

নির্ধারিত হারের তুলনায় কম ট্যাক্স দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপরোল্লিখিত ভবন মালিকদের প্রায় সবাই বলেন, নগর ভবন যেভাবে ট্যাক্স নির্ধারণ করেছে আমরা সেভাবেই এত বছর ট্যাক্স দিয়ে এসেছি। এখানে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। বরঞ্চ বর্তমানে অনেক বেশি হারে ট্যাক্স চাপানো হচ্ছে আমাদের ওপর। ১১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, অতিরিক্ত ট্যাক্স নির্ধারণ বিষয়ে আপিল বোর্ডে আবেদন করা হয়েছে। শুনানিও হয়েছে। এখন দেখি কর্তৃপক্ষ কি সিদ্ধান্ত দেয়।

আপিল এবং ট্যাক্স ফাঁকি বিষয়ে জানতে চাইলে নগর ভবনের সচিব ইসরাইল হোসেন বলেন, নাগরিকদের করা অভিযোগের শুনানি করছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি মিলছে না। আসলে জটিলতা অন্য জায়গায়। যাদের মোটামুটি ক্ষমতা রয়েছে তারা সাবেক মেয়রদের ধরে ট্যাক্স কমিয়েছেন। আর যাদের সেই সুযোগ ছিল না তারা মাঠপর্যায়ে জরিপে যাওয়া কর্মকর্তাদের নানাভাবে ম্যানেজ করে কর কমিয়েছেন। ফলে নতুন জরিপের পর অনেকের মনে হচ্ছে যে হঠাৎ করে কর বেড়ে গেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×