চাকরি দেয়ার নামে জমি রেজিস্ট্রি

মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য হবু জামাইকে চাকরি দিতে আবদুল্লাহ আরেফকে নগদ অর্থ ছাড়াও ৫ কাঠা জমি লিখে দেন মতিয়ার, কিন্তু পরে কিছুই পাননি * ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দেখতে কিউআর কোডটি স্ক্যান করুন * এভাবে চাকরি বাণিজ্যের শিকার মাগুরার অনেকে, অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার মূল্যবান সম্পদ নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন

  নেসারুল হক খোকন ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরি দেয়ার নামে জমি রেজিস্ট্রি
ফাইল ছবি

‘মেয়ে বিয়ে দিতে পাত্র ঠিক করেছিলাম। পাত্রপক্ষের দাবি ছিল বেকার ছেলের জন্য একটি চাকরির নিশ্চয়তা। ছেলের চাকরি হলেই বিয়ে হবে মেয়ের। আশ্বাস দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে আসেন গ্রামের বড় কর্মকর্তা এসপি আবদুল্লাহ আরেফ।

কিন্তু পুলিশে চাকরি দেয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন তিনি। কথাবার্তার একপর্যায়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং আবদুল্লাহ আরেফের গ্রামের পুকুরপাড়ের ৬ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে বলা হয়। তাও রেজিস্ট্রি করে দিই।

চাকরি তো দূরের কথা, চার বছর ধরে টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে উল্টো ভুয়া মামলার আসামি হয়েছি। ভাংচুর করা হয় আমার জরাজীর্ণ বসতঘরও’, এক শ্বাসে কথাগুলো বলেন মতিয়ার রহমান।

শুধু এক মতিয়ার রহমানই নয়, এমন অভিযোগ মাগুরার সদর উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়ি লক্ষ্মীকোণ গ্রামের অনেকেরই। এই গ্রামেই বাড়ি ফরিদপুর নৌপুলিশের এসপি আবদুল্লাহ আরেফের।

চাকরি বাণিজ্যের এসব অভিযোগ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের আইজি ও র‌্যাবের ডিজিসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে আবেদনও করা হয়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে মাগুরায় লক্ষ্মীকোণ গ্রামে খোঁজ নিতে গিয়ে পাওয়া যায় আবদুল্লাহ আরেফের চাকরি বাণিজ্যের ভয়াবহ সব তথ্য।

ভুক্তভোগী মতিয়ার রহমান প্রতিবেদককে বলেন, ‘চাকরির জন্য দেয়া জমি ফেরত চাওয়ায় আমার বাড়িঘর কুপিয়ে চুরমার করা হয়। আবদুল্লাহ আরেফ স্থানীয় সন্ত্রাসী এবং মাদক ব্যবসায়ী বদর ও টিপু বিশ্বাসসহ কয়েকজনকে দিয়ে এই হামলা চালান।’

তিনি বলেন, ‘শুধু বাড়িঘরে হামলা করেই ক্ষ্যান্ত হননি তিনি। ভুয়া মামলায় আমাকে আসামিও করেন।’ একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মতিয়ার।

বলেন, ‘স্কুল-কলেজে পড়ুয়া এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে এই ভাঙা ঘরেই এখন থাকতে হচ্ছে। বড় মেয়ের বিয়ে দিতে ২০১৪ সালে পাত্র ঠিক করেছিলাম। পাত্রকে চাকরির আশ্বাস দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ আরেফ। বিনিময়ে টাকা দাবি করেন।

এরপর ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ৬ শতক জমি আবদুল্লাহ আরেফের নামে রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়। এর আর চাকরিও হয়নি, মেয়ের বিয়ে দেয়াও সম্ভব হয়নি, বলেই কাঁদতে থাকেন মতিয়ার রহমান।

এ অবস্থা দেখে পাশ থেকে স্বামীকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসেন তার স্ত্রী ও দুই মেয়েও। জীর্ণশীর্ণ ঘরের এক কোনায় টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বইগুলো দেখিয়ে বড় মেয়ে (নাম প্রকাশ করা হল না) বলেন, ‘অন্যের জমিতে কাজ করে বাবা যে টাকা আয় করেন, তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। অন্যের বই ধার করে লেখাপড়া করি।’

মতিয়ার রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয় এসপি আবদুল্লাহ আরেফ নিজের নামেই কি ৬ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন? এ কথার জবাব না দিয়েই বলেন, বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? একটু দাঁড়ান, বলেই ঘর থেকে সেই দলিলের ফটোকপি এনে প্রতিবেদককে দেন। দলিলে দেখা যায়, ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় ৬ শতক জমি মতিয়ার রহমানের কাছ থেকে ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রেজিস্ট্রি করে নেন আবদুল্লাহ আরেফ। মাগুরা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং ৮৭৫। হস্তান্তরিত সম্পত্তির মূল্য নগদ অর্থে পরিশোধ দেখানো হয়েছে দলিলে। এ বিষয়ে মতিয়ার রহমান বলেন, ‘নগদ পরিশোধ না দেখানো হলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল রেজিস্ট্রি করেন না। দলিলে তো আর আমি লিখতে পারিনি যে, চাকরির বিনিময়ে জমি রেজিস্ট্রি!’

ফুলবাড়ি লক্ষ্মীকোণ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আরেফের বাড়ির উল্টোদিকে বসবাসকারী সদরুল হায়দার বিলকিস বলেন, ‘আবদুল্লাহ আরেফ আমার সম্পর্কে ভাতিজা। আমার বাবা বন বিভাগে চাকরি করতেন। বাবার চাকরিটাই আমাকে নিয়ে দিতে তিনি ৫০ হাজার টাকা নেন। চাকরি তো দূরের কথা, টাকা ফেরত চাইতে গেলেই মারধর করেন। একবার আমাকে লাঞ্ছিতও করা হয়। এরপর আর আমি টাকাও ফেরত চাই না।’

আবদুল্লাহ আরেফের গ্রামের সম্পর্কে চাচাতো ভাই আসাদুজ্জামান ডাবলু অভিযোগ করে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫টি মামলা দিয়েছেন আবদুল্লাহ আরেফ। আমাকে শীর্ষ সন্ত্রাসীও বানানো হয়েছে। আমি একজন কৃষক, সামান্য ব্যবসা করি এই গ্রামেই। পারিবারিক সম্পত্তি জোর করে দখল করতে বাধা দেয়া এবং প্রতিবাদ করায় এসব মামলার আসামি হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে অনেকটা ফেরেশতার মতো মাগুরায় এসপি হিসেবে যোগ দেন মুনিবুর রহমান। তিনি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ব্যবস্থা করেন।’

একই গ্রামের মোস্তফা হাসান বলেন, ‘আবদুল্লাহ আরেফ সম্পর্কে আমার ভাতিজা। বিমানবাহিনী থেকে যখন তাকে বিদায় করে দেয়, তখন তার থাকার জায়গা ছিল না। তখন ঢাকায় আমার বাসায় তাকে থাকার জায়গা দিই।’ তিনি বলেন, ‘আমি তখন মাস্টাররোলে ঢাকায় বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে চাকরি করতাম। এরপর তার পুলিশে চাকরি হয়। আমার চাকরিটা স্থায়ী করে দিতে ২ লাখ টাকা দাবি করে। আমি তাকে দেড় লাখ টাকা দিই। চাকরি স্থায়ী তো দূরের কথা, তার কারণে চাকরি ছেড়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে।’ আবদুল্লাহ আরেফ তার এক সোর্সকে বাদী করে বাড্ডা থানায় আমার বিরুদ্ধে একটি প্রতারণার মিথ্যা মামলাও করান। কিছু দিন আগে আবার নারী পাচারকারী হিসেবে খুলনার কয়রা থানায় আমার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দিয়ে রেখেছে। যাতে টাকা ফেরত না চাই।

ফুলবাড়ি গ্রামের নিজাম উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ‘খুলনায় অ্যাডিশনাল এসপি থাকাবস্থায় ছোট ভাইকে পুলিশে চাকরি দেয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছিলেন আবদুল্লাহ আরেফ। অনেকদিন ঘুরে সেই টাকা থেকে কিছু টাকা ফেরত পাই। এখনও ৭১ হাজার টাকা পাওনা আছি।’

প্রশ্নবিদ্ধ সম্পদ : ঢাকায় গুলশান ও মোহাম্মদপুরে দুটি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে সেগুলো কেনা হয়েছে আবদুল্লাহ আরেফের মায়ের নামে। আইনের দৃষ্টিতে ফ্ল্যাট দুটির মালিকানা তার মায়ের হলেও অভিযোগ রয়েছে টাকার সংস্থান করেছেন এসপি আবদুল্লাহ আরেফ। এছাড়া খুলনায় দলিল-দস্তাবেজে মূল্যবান ৫ কাঠা জমির বৈধ মালিক হলেও সেখানে অন্তত ১৫ থেকে ২০ কাঠা জমি দখল করা অবস্থায় দেখা যায়। খুলনার বয়রা নতুন পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন জমিটির মূল মালিক হাউজিং স্ট্রেট সোসাইটি। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৬ লাখ টাকা রেজিস্ট্রি মূল্যে জমিটি কেনা হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই জমির বাস্তব বাজার দর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। মা নাদিরা লাইজু, বোন আয়শা আশরাফি ও আবদুল্লাহ আরেফের নামে জমিটি রেজিস্ট্রি হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, ৫ কাঠার স্থলে অন্তত ২০ কাঠা জমির ওপর বাঁশবেতের বেড়া দেয়া। ভেতরে গাছের সঙ্গে বাঁধা একটি সাইনবোর্ডে লেখা আছে, ‘ক্রয়সূত্রে এই জমির মালিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আমিরুল ইসলাম ফরহাদ গং। প্লট নং-১৩৭, ব্লক-ডি, বয়রা হাউজিং স্ট্রেট। জমিটির কেয়ারটেকার শেখ ফরিদ যুগান্তরকে বলেন, ‘এখানে আবদুল্লাহ আরেফ স্যারের অন্তত ২০ কাঠা জমি আছে। পুরোটাই স্যারের কেনা সম্পত্তি।’

আবদুল্লাহ আরেফের বাবা আমিরুল ইসলাম ফরহাদ মারা গেছেন ১৯৯৯ সালে। কিন্তু প্রকৃত তথ্য গোপন করতে মৃত বাবার নামেই খুলনায় জমির মালিকানার সাইনবোর্ড লাগানোর কথা জানিয়েছেন তার একজন নিকটাত্মীয়।

এদিকে গত বছর মা নাদিরা লাইজুর নামে গুলশান-১-এ আলিশান একটি ফ্ল্যাট কেনেন আবদুল্লাহ আরেফ। দলিলে দুটি কার পার্কিংসহ ২৮শ’ স্বয়ার ফিটের এই ফ্ল্যাটের দাম ৯৩ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। তবে বাস্তবে এর দাম প্রায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার ওপরে বলে বাড়িটির অন্য এক বাসিন্দা দাবি করেছেন। সরেজমিন দেখা গেছে, গুলশান ১-এর সিডব্লিউএস (বি) ব্লকের ৩৯ নং প্লটে ১০ কাঠার জমিতে ৬ তলা বাড়ির দক্ষিণ পার্শ্বে ৩/সি ফ্ল্যাটটিতে এখন সপরিবারে বসবাস করেন আবদুল্লাহ আরেফ। একশত বাষট্টি অযুতাংশ জমিসহ ফ্ল্যাটটি রেজিস্ট্রি করা হয়।

ফ্ল্যাটটি কেনার সময় মধ্যস্থতাকারী একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘ফ্ল্যাটটির ভেতরে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে আধুনিক ডিজাইনে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। বাড়িটির নিচ তলায় কার পার্কিংয়ে রেজিস্ট্রেশনবিহীন একটি দামি গাড়িও রয়েছে। উত্তর কোরিয়া দূতাবাসের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে গাড়িটি তিনি কিনেছেন বলে জানা গেছে। অবৈধভাবে কেনার কারণে গাড়িটি এখনও রেজিস্ট্রি করতে পারেননি। এছাড়া মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে ৩৯নং মেট্রোপলিটন হাউজিং সোসাইটিতে ৫-এ নং ফ্ল্যাটে একসময় পরিবারসহ বসবাস করতেন। সেটিও ১৪শ’ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট। তবে নতুন ফ্ল্যাট কেনার পর বর্তমানে সপরিবারে তিনি গুলশানেই থাকেন। ফেসবুকে গুলশানের বাড়ি থেকে ২৫ এপ্রিল একটি ছবিও আপলোড করেন। মাগুরায় গ্রামের বাড়িতেও ২০১৭ সালে নির্মাণ করেন আধুনিক নির্মাণশৈলী একতলা ভবন।

মতিয়ার রহমানের অভিযোগের বিষয়ে আবদুল্লাহ আরেফ বলেন, ‘জমি তো মতিয়ার রেজিস্ট্রিমূলে আমার কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। দলিলের এক জায়গায় বলা আছে, জমি বিক্রির নগদ টাকা বুঝিয়া পাইলাম।’ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আজকাল কি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় পুলিশের কোনো চাকরি হয় নাকি? চাকরি দেয়ার নামে জমি রেজিস্ট্রি করে নেয়ার বিষয়টি মিথ্যা।

মায়ের নামে গুলশানে আলিশান ফ্ল্যাট কিনেছেন কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘এই প্রথম শুনলাম গুলশানে ফ্ল্যাট কিনেছেন মা। আর মা কিনে থাকলে তার জবাব তিনিই দেবেন। তিনি এনবিআরে আয়-ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল করেন।’ অন্য চাকরি প্রার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, এই অভিযোগগুলো ২০১৭ সালের পর থেকে আসতে থাকে। কারণ আপন চাচা যখন অভিযোগ দেয়, তখন থেকেই এসব সামনে আসে।’ গুলশানের ফ্ল্যাটের মালিকানার বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হয় তার মা নাদিরা লাইজুর সঙ্গে। কিন্তু সেল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×