চলতি অর্থবছর

প্রথম নয় মাসে রাজস্ব আদায়ে ধস

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে একরকম ধস নেমেছে। প্রথম ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় কম হয়েছে।

বছর শেষে এ ব্যবধান আরও বাড়তে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, আমদানি-রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে করতে না পারা, আমদানি পণ্যে ‘লোডেড মূল্যের’ ওপর শুল্ক চাপিয়ে দেয়া এবং কাস্টম হাউসে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন পদ্ধতি চালু না হওয়ার কারণেই মূলত রাজস্ব আদায়ে এমন নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া কাস্টম কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতি ও হয়রানিও এ পরিস্থিতি সৃষ্টিতে ‘বিশেষ ভূমিকা’ রাখছে। যদিও কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষের দাবি, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের কথা চিন্তা করে চলতি অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকা টার্গেট বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এছাড়া আমদানি-রফতানিও আগের তুলনায় অনেক কমেছে। এ কারণেই চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত রাজস্ব আদায় অপেক্ষাকৃত কম হয়েছে।

সূত্র জানায়, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫৭ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত (প্রথম নয় মাস) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪১ হাজার ৯৫৭ দশমিক ২০ কোটি টাকা। কিন্তু এ সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩২ হাজার ৪১৯ দশমিক ৮ কোটি টাকা।

অর্থাৎ এখনও ঘাটতি আছে ৯ হাজার ৫৩৮ দশমিক ১২ কোটি টাকা। এমন অস্বাভাবিক রাজস্ব কমে যাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. সিকান্দার খান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমদানি-রফতানি যদি বাড়ে, তখন আমরা সাধারণভাবে বুঝব যে দেশের উন্নতি হচ্ছে। বিভিন্ন খাতে অর্থনীতির সূচক যদি ঊর্ধ্বমুখী হয়, কাস্টমসে কেন নিম্নমুখী হবে বা রাজস্ব আয় কমবে- সেটাও একটা প্রশ্ন। নিশ্চয় এখানে কোনো গোলমাল রয়েছে।

কাস্টমসে শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। এর সঙ্গে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেমন জড়িত, তেমনি অসাধু ব্যবসায়ীরাও। কারণ দুই পক্ষের মধ্যে যোগসাজশ না থাকলে এটা সম্ভব হয় না।’

সিকান্দার খান আরও বলেন, ‘শুল্ক ফাঁকি রোধে শুল্ক বিভাগকে ‘সাফিশিয়ান্টলি ইকুইপ্ট’ হতে হবে। যদি তা না হয় তবে ফাঁকির সুযোগ থেকে যাবে। আবার এমনটিও অবাস্তব নয় যে, দুর্নীতির পথ খোলা রাখার জন্য শুল্ক বিভাগ ‘সাফিশিয়ান্টলি ইকুইপ্ট’ হচ্ছে না।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কমার্শিয়াল পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক যেমন বাড়িয়ে রাখা হয়েছে, তেমিন বাজারমূল্যের পরিবর্তে ‘লোডেড মূল্যের’ ওপর শুল্ক ধার্য করা হচ্ছে। এ কারণে অনেক আমদানিকারক বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন। অতিরিক্ত ও চাপিয়ে দেয়া শুল্ক পরিশোধ করে লোকসান দেয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী কমার্শিয়াল আমদানি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বন্ডের আওতায় পণ্য আমদানি করলে সে ক্ষেত্রে শুল্ক দিতে হয় নামেমাত্র।

বন্ড সুবিধায় কমার্শিয়াল পণ্য এনে বিক্রি করা হচ্ছে খোলাবাজারে। এতে একদিকে সরকার শুল্ক পাচ্ছে না, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পকারখানায় উৎপাদিত পণ্যও মার খেয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সিনিয়র সহসভাপতি এএম মাহবুব চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার বেশকিছু কারণ রয়েছে।

প্রধান কারণ হচ্ছে কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতি। তারা ঠিকমতো রাজস্ব আদায় করছেন না। নানা অজুহাতে হয়রানি করেন ব্যবসায়ীদের। এছাড়া টেলিকম খাতে এ বছর আমদানি হয়নি।

খাদ্যদ্রব্য খাতে বিশেষ করে চাল ও চিনি আমদানি না হওয়া, গাড়ি আমদানি হলেও তা মোংলা বন্দরে খালাস হওয়ার কারণে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস রাজস্ব পায়নি। মাহবুব চৌধুরী আরও বলেন, কাস্টমসে হয়রানির আরও একটি কারণ হচ্ছে রাজস্ব আদায়ে টার্গেট ধরে দেয়া। টার্গেট দেয়া হলে তো ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হবেনই।

পণ্যের লোডেড মূল্যের ওপর শুল্ক চাপিয়ে দেবে কাস্টম হাউস এবং দিচ্ছেও। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা অমাদানি না করলে তাদের তো জোর করে আমদানিতে নামানো যাবে না।

কাস্টম হাউসের কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এটি মাথায় রেখে ২০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব টার্গেট দেয়া হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে। কিন্তু এই আইন কার্যকর না হওয়ায় এ খাত থেকে টার্গেটেড রাজস্ব আসেনি। তাছাড়া আমদানিও আগের চেয়ে অনেকাংশে কমেছে। কেবল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস নয়; দেশের অন্যান্য শুল্ক স্টেশনগুলোতেও রাজস্ব আদায় কমেছে।

কাস্টম থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, গত অর্থবছরের ৯ মাসের তুলনায় চলতি বছরের ৯ মাসে যেসব খাতে এবার শুল্ক আদায় কমেছে, এর মধ্যে চিনি আমদানি খাতে ৩২৭ কোটি টাকা, ওয়েল্ডেড এমএস পাইপ আমদানি খাতে ১০২ কোটি টাকা, ট্রান্সমিশন মডেম আমদানি খাতে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকা, এসিড আমদানি খাতে ৮৬ কোটি এবং ট্রান্সফরমার আমদানি খাতে ৬৫ কোটি টাকা। এছাড়া অপরিশোধিত লবণ আমদানি খাতে ৭০ কোটি টাকা, সেলুলার টেলিফোন সেট আমদানি খাতে ৫৪ কোটি টাকা, ওয়েল কেক আমদানি খাতে ৮০ কোটি টাকা রাজস্ব কমেছে।

সিরামিক টাইলস আমদানি খাতে ১৩২ কোটি টাকা, চাল আমদানি খাতে ১১৮ কোটি টাকা রাজস্ব কমেছে। এভাবে বিভিন্ন খাতে আমদানি কমেছে। তাই রাজস্বও কমেছে।

সূত্র আরও জানায়, চলতি অর্থবছরে গাড়ি আমদানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরে যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৮ হাজার গাড়ি আমদানি হয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে গাড়ি আমদানি হয়েছে চার হাজারের কিছু বেশি।

এই একটি খাতেই সরকারের রাজস্ব কমেছে পৌনে চারশ কোটি টাকা। শুল্ক গোয়েন্দারা জানান, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, গাড়ির পুরনো ইঞ্জিন আমদানিসহ বিভিন্ন পণ্য চালান আমদানিতে প্রতিনিয়ত শুল্ক ফাঁকি দেয়া হয়। কেবল গাড়ির পুরনো ইঞ্জিন আমদানি খাতেই হাজার কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দেয়া হয়েছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।