ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি বিতর্ক: অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি

  মাহমুদুল হাসান নয়ন ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছাত্রলীগ

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া ‘বিতর্কিত নেতা’দের মধ্যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছিল ছাত্রলীগ। তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণে বুধবার রাতে ২৪ ঘণ্টার সময় নিয়েছিল তারা। কিন্তু সময় শেষে আরও ২৪ ঘণ্টা কেটে গেলেও তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়নি সংগঠনটি।

পদবঞ্চিতরা এ ১৭ জন ছাড়াও যে ৮২ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনেছেন সেগুলো তদন্তেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনের কথা থাকলেও শুক্রবার পর্যন্ত তা করা হয়নি। মধুর ক্যান্টিনে পদবঞ্চিতদের ওপর হামলায় গঠিত তদন্ত কমিটিও নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দেয়নি।

এ অবস্থায় কমিটি থেকে বিতর্কিত সবাইকে বাদ না দিলে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা।

সম্মেলনের ১ বছর পর সোমবার ঘোষণা করা হয় ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এর আগে ১৫ দফা সময় দিয়েও তা ঘোষণা করা হয়নি। ফলে কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সর্বশেষ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অর্ধশত নেতার বাদ পড়া ও প্রত্যাশিত অনেকের পদ না পাওয়ায় সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।

মধুর ক্যান্টিনে তা প্রকাশ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পদবঞ্চিতরা। পরে কমিটিতে থাকা বিতর্কিতদের বাদ দেয়ার দাবিতে আন্দোলনে নামেন তারা।

বৃহস্পতিবার বিতর্কিত ৯৯ নেতার নাম প্রকাশ করেন আন্দোলনরত নেতারা। রাতে আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের কাছে তথ্য-উপাত্তসহ তালিকা জমা দেন। সেখানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কথা বলেন। এ সময় নানক তাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানান।

এর আগে বুধবার মধ্যরাতে নবগঠিত কমিটির ১৭ বিতর্কিত ও বিভিন্ন অপরাধ-অপকর্মে অভিযুক্তর নাম প্রকাশ করে ছাত্রলীগ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বহিষ্কার করে কমিটিতে বঞ্চিতদের স্থান করে দেয়ার ঘোষণা দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। কিন্তু শুক্রবারও ছাত্রলীগ কিছু জানায়নি।

আবার যে ১৭ জনের নাম ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ করেছেন তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মধ্যে এমন কয়েকজন রয়েছেন যারা সংগঠনের দুঃসময়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, সর্বশেষ কমিটিতে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অপরাধের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম।

এ তালিকায় সংগঠন থেকে আজীবন বহিষ্কার, বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে জড়িতদের নাম না এনে এমন সব ত্যাগী নেতাকর্মীদের নাম আসা দুঃখজনক। বেশি আলোচনা নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি ও সাবেক কৃষি শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বরকত হোসেন হাওলাদারকে নিয়ে।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটির প্রচার সম্পাদক সাইফ উদ্দিন বাবু যুগান্তরকে বলেন, শতাধিক অভিযুক্তর মধ্যে কেন শুধু ১৭ জনের নাম এলো তা পরিষ্কার নয়। তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের নিয়ে বিতর্ক রয়েছে সেটি যেমন সত্য, এর চেয়েও বড় সত্য হল এর চেয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এমন অনেকের নাম তালিকায় আসেনি।

পদবঞ্চিতরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে আজ তারা সাক্ষাৎ করবেন। সেখানে মধুর ক্যান্টিনে ডাকসু ও ছাত্রলীগের নারী নেত্রীদের ওপর বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের হামলা, আলোচিত ১৭ জন এবং অন্য আরও ৮২ জনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইবেন তারা।

পদবঞ্চিতদের অন্যতম সর্বশেষ কমিটির কর্মসূচি ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন শুক্রবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, কমিটিতে শতাধিক অভিযুক্ত রয়েছে। অথচ নাম ঘোষণা করা হয়েছে মাত্র ১৭ জনের। এ তালিকা নিয়ে শুরু থেকেই আমাদের আপত্তি ছিল। তবুও যেহেতু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা, সেখানে এখনও সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ওই পদগুলো শূন্য ঘোষণা করে বঞ্চিতদের জায়গা দেয়ার কথা, তাও করা হয়নি। বাকি যে ৮২ বিতর্কিতদের নাম তথ্য-উপাত্ত সহকারে দিয়েছি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি অভিযোগ তদন্তে কোনো কমিটিও হয়নি। মধুর ক্যান্টিনে ডাকসু ও ছাত্রলীগের নেত্রী বোনদেরসহ আমাদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচার হয়নি এখনও। আমরা ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে কথা বলব।

তিনি জানান, বিতর্কিতদের না সরানো পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

মধুর ক্যান্টিনে হামলার ঘটনায় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিকে বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। শুক্রবার বিকালেও তারা তদন্ত শেষ করতে পারেনি।

এ বিষয়ে কমিটির প্রধান ও ছাত্রলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় শুক্রবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, যেহেতু বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আমাদের কথা বলতে হয়েছে, তাই প্রতিবেদন তৈরিতে কিছুটা বেশি সময় লাগছে। প্রতিবেদন শেষ পর্যায়ে। এখন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে সেটি চূড়ান্ত করা হবে।

তিনি আরও জানান, যেহেতু নবগঠিত কমিটির দফতর সম্পাদক আহসান হাবীব বিতর্কিত ১৭ জনের মধ্যে রয়েছেন, তাই প্রতিবেদনটি তার কাছে না দিয়ে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছেই জমা দেয়া হবে।

ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য : এসব বিষয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী যুগান্তরকে বলেন, যেহেতু এটা (১৭ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা) অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাই তাদের আমরা আরেকটু সময় দিয়েছি। ইতিমধ্যে ৭ জন নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরীর নাম অভিযোগের প্রাসঙ্গিকতা না থাকায় আগেই বাদ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, পরশুদিন (কাল) ১৭ জনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর ইচ্ছা আছে।

অন্য ৮২ জনের বিষয়ে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, কতিপয় গোষ্ঠী একদম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বর্তমান কমিটিকে বিতর্কিত করতে এসব অভিযোগ এনেছে। এগুলোর বেশিরভাগেরই সত্যতা নেই। যেসব নাম এসেছে, সেগুলোর অধিকাংশই মিথ্যা। ইতিমধ্যে তাদের চারজন মানহানি মামলা করেছে। অনেকেই মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে অভিযুক্ত যেগুলোর প্রমাণ পাওয়া যাবে সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কিংবা দফতর সেলে এখনও আমরা এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। তবুও সংবাদ সম্মেলন করে যা বলেছি, তা স্বপ্রণোদিত হয়ে বলেছি। ফেসবুকে কি এলো, পত্রিকায় কি ছাপল সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমাদের কাছে তো অভিযোগ আসতে হবে। অভিযুক্তদের বাদ দিলে যেসব পদ শূন্য হবে সেগুলোতে বঞ্চিতদের পদায়ন করা হবে।

মধুর ক্যান্টিনে হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির বিষয়ে গোলাম রাব্বানী বলেন, যারা অভিযোগকারী তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। তারা রেসপন্স করছে না। সেক্ষেত্রে কিছু ভিডিও ফুটেজ কমিটি দেখেছে। যথাসম্ভব সবার সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, সেদিন সেভাবে কেউ আহত হয়নি। শুধু একজনের একটু আঘাত লাগার বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। বরং যারা অভিযোগ করছে তাদের বিরুদ্ধে হামলার কিছু তথ্য তদন্ত কমিটি পেয়েছে। যেহেতু অভিযোগকারীরা তদন্তে অসহযোগিতা করছে তাই তদন্ত করতে সময় বেশি লাগছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×