রমজানুল মোবারক

বদরের চেতনায় জেগে উঠুক মুসলমান

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

আজ সতেরো রমজান। ইসলামের ইতিহাসে খুবই স্মরণীয় একটি দিন। এ দিন ইসলাম ও মুসলমানের ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ বাধে। ঘুমিয়ে পড়া জীর্ণশীর্ণ মুসলমানকে জাগিয়ে দেয়ার জন্য ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ চেতনার চেয়ে কার্যকরী আর কী হতে পারত।

আজকের মুসলমানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ধনে-জনে, জ্ঞান-গরিমায় পিছিয়ে নেই তারা। নবীজির জামানায় না ছিল ধন, না ছিল জনবল, ছিল না কোনো ডক্টরেট-মাস্টার্স করা উচ্চশিক্ষিতের ছড়াছড়ি।

আজ সে ইসলাম বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে অঢেল সুখ-সম্পদ নিয়ে। বোধহয় এ সময়ের কথা ভেবেই নবীজি খুব আফসোস করে বলেছিলেন, একদিন আমার উম্মত অনেক সম্পদের মালিক হবে। হায়! সেদিন তারা ইমানি সম্পদে জীর্ণশীর্ণ এক দুর্দশাগ্রস্ত জাতিতে পরিণত হবে।

দ্বিতীয় হিজরির রমজান মাসের ১৭ তারিখ। বদরের মাঠে কাফের বাহিনীর এক হাজার সশস্ত্র সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি মাত্র তিনশ’ তেরোজন মর্দে-মুমিনের ছোট্ট কাফেলা। জাগতিক দৃষ্টিতে দেখলে যে কেউই যুদ্ধের আগে মুমিন বাহিনীর নিশ্চিত পরাজয়ের কথা বলে দিতে পারবে। কিন্তু এ বাহিনী তো জাগতিক দৃষ্টির বাইরেও আরেকটি দৃষ্টি অর্জন করেছিল। তা ছিল দৃঢ় ইমানি দৃষ্টি।

জাগতিক অস্ত্র ছাড়াও ইমানি অস্ত্র তাদের কলবের খাপে মোড়ানো ছিল। তাই তো তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে, খেজুর গাছের শুকনা ডাল হাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন চকচকে তরবারিধারীদের ওপর।

বোখারি শরিফের কিতাবুল মাগাজিতে এসেছে, যেসব সাহাবি শুকনো খেজুরের ডাল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, এক সময় তারা দেখেন খেজুরের ডাল আর খেজুরের ডাল নেই। চকচকে তরবারি বনে গেছে। সুবহানাল্লাহ। জাগতিক অস্ত্রের মোকাবেলায় ইমানি অস্ত্রের এমনই কেরামতি হয়ে থাকে।

আরেকটি ঘটনা শুনুনু! নবীজি (সা.) সৈন্যবাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আবেগময়ী ভাষণ দিচ্ছেন। একপর্যায়ে বলছেন, ওই জান্নাতের দিকে ছুটে আসো যা আসমান ও জমিনের চেয়েও বড়। ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করে শহীদ হলে এমন দশটি পৃথিবীর সমান একটি জান্নাত তোমাকে দেয়া হবে। পাশেই একজন সাহাবি খেজুর খাচ্ছিলেন। যখন জান্নাতের কথা শুনলেন, তখন বললেন, বাহ! কী চমৎকার জান্নাত বানিয়ে রেখেছেন আল্লাহতায়ালা। আমি যদি হাতে থাকা খেজুরগুলো খেতে থাকি তাহলে তো জান্নাতে যেতে খুব দেরি হয়ে যাবে। এই বলে হাতের সব খেজুর ছুড়ে ফেলে তক্ষুণি চলে যান জিহাদের ময়দানে।

জগতের মানুষ ভরসা করে জাগতিক উপকরণের ওপর। মুমিন ভরসা করে আল্লাহর ওপর। তাই তো রাসূল (সা.) যুদ্ধ শুরুর প্রারম্ভে আকাশের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বলছিলেন, হে আল্লাহ! এত বিশাল সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার শক্তি এ ছোট্ট মুমিন বাহিনীর নেই। আজ যদি এ মুমিন বাহিনী হেরে যায়, তাহলে তোমাকে আল্লাহ বলে ডাকার আর কেউই থাকবে না। এভাবে দোয়া শেষ করে রাসূল (সা.) নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন যুদ্ধের ময়দানে। আর তক্ষুণি আল্লাহর সাহায্য নেমে এলো। বিশ্বাসীরা জয়ী হলেন।

অস্ত্রের বলে নয় দোয়া এবং সাহসের ফলে বিজয় লাভ- এটাই বদরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আফসোস! আজ মুসলমানের সব আছে, শুধু ইমানি শক্তিতে তারা হয়ে পড়েছেন জীর্ণশীর্ণ। পৃথিবীর এখানে ওখানে অন্যায়-অসত্য মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, মানবতার মুখে চুনকালি মেখে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে, হায়! মুসলমানের সাহায্যে মুসলমান এগিয়ে আসছে না।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ড. মাহাথির মুহাম্মাদ বড় আফসোস করে বলেছেন, মুসলমানের তো এমন শক্তি অর্জন করার কথা ছিল, বিশ্বের কোথাও মুসলমানের দিকে অন্যায়ভাবে কেউ চোখ তুলে তাকানো মাত্রই পুরো বিশ্বে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ঝড় উঠবে- কেন আমার ভাইয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানো হল। অথচ পাখির মতো মুসলমান হত্যা করা হচ্ছে, প্রতিরোধ তো দূরের কথা মৌখিক নিন্দাও জানায় না মুসলিম বিশ্বের রাজা-বাদশাহরা।

আর একশ্রেণীর মুসলমান আছে, যারা বলে বদরে রাসূল (সা.)-এর দোয়ার ফলে বিজয় এসেছে। আমরাও খানকা-মসজিদে বসে বসে তাসবিহ গুনে গুনে বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানের মুক্তি নিশ্চিত করব।

এদের সম্পর্কে মাহাথির মুহাম্মাদ বলেছেন, এমন মূর্খের মতো কোনো মুসলমান চিন্তা করতে পারে, তা ভাবতেও লজ্জা লাগে। তারা কি দেখে না নবীজি দোয়া করে যেমন চোখ ভিজিয়েছেন, তেমনই যুদ্ধ করেও রক্তে শরীর রাঙিয়েছেন। শুধু দোয়া করলেই যদি সব হতো তাহলে বদরের ময়দানে ৭০ জন সাহাবি শহীদ হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। হে আল্লাহ! বদরের ইমানি জজবা আজকের মুসলমানের হৃদয়ে ঢেলে দিন। অসত্যের বিরুদ্ধে মুসলমানকে জাগিয়ে তুলুন।

লেখক : মোফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব