প্রথম ধাপে ১১ জেলায় পরীক্ষা

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস

সাতক্ষীরায় চক্রের ২৯ সদস্য আটক, ব্যাংক কর্মকর্তা ও শিক্ষকসহ ২১ জনকে দণ্ড * ১০-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে মোবাইলে প্রশ্ন বলে দেয়া হচ্ছিল * পটুয়াখালীতে স্ত্রীকে নকল সরবরাহ করতে গিয়ে ধরা পুলিশ কর্মকর্তা

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রশ্নপত্র ফাঁস
প্রশ্নপত্র ফাঁস। প্রতীকী ছবি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপে সাতক্ষীরায় লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। ঢাকা থেকে একটি চক্র প্রশ্ন ফাঁস করে। এতে সাতক্ষীরার স্থানীয় ৫ ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

শুক্রবার পরীক্ষার আগে সাতক্ষীরার একটি কোচিং সেন্টার থেকে র‌্যাব প্রশ্নের উত্তর বলে দেয়ার সময় পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় চক্রের সদস্যসহ ২৯ জনকে আটক করে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ২১ জনকে ২ বছর করে দণ্ড দেন। এদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা এবং প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক আছেন। চক্রের ঢাকার মূল হোতাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে পটুয়াখালীতে নকল সরবরাহের সময় ধরা পড়া এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ১ মাসের দণ্ড দেয়া হয়েছে। লক্ষ্মীপুরেও সোলায়মান নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি ফেসবুকে কথিত প্রশ্ন আপলোড করেছিলেন, যার সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি পরীক্ষার্থীদের।

অনিয়মের দায়ে পাবনায় ৮ জন আটক এবং ৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বেশ কয়েকজনকে আটক ও বহিষ্কারের খবর পাওয়া গেছে।

এবার ৬১ জেলার ৪ ধাপে পরীক্ষা নেয়া হবে। শুক্রবার প্রথম ধাপে ১১ জেলায় পরীক্ষা নেয়া হয়। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র ছাপানো হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণে মন্ত্রণালয়ের ১৪ সদস্যের কমিটি কাজ করে।

এবার একটি প্রশ্নপত্র করা হলেও বিন্যাস পরিবর্তন করে সেট করা হয়েছে ৮টি। ওই প্রশ্ন এনক্রিপ্ট ফরমেটে দুই ভাগে একটি ডিসি এবং আরেকটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। পরে দু’জনে একত্রিত হয়ে বিশেষ পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে ডাউনলোড করে বৃহস্পতিবার রাতে ছাপানোর ব্যবস্থা নেন।

আটককৃতদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র সাতক্ষীরা নয়, ঢাকা থেকে ফাঁস করা হয়েছে। সাতক্ষীরায় রাতভর মোবাইল ফোনে প্রশ্ন সংগ্রহ করে উত্তর লিখে দেয়া হচ্ছিল পরীক্ষার্থীদের।

সন্দেহ করা হচ্ছে, দেশের অন্যান্য জেলায়ও ফাঁসকৃত প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু তৎপরতার অভাবে কোথাও ধরা পড়েনি। কেউ কেউ বলছেন, সাতক্ষীরা থেকেও ফাঁস হতে পারে। তবে গ্রেফতার ব্যক্তিদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মূল হোতাদের বের করা সম্ভব হবে।

পরীক্ষার তত্ত্বাবধান করছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম-আল-হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, দু-এক জেলায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষা হয়েছে।

পরীক্ষা নিতে গিয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। প্রশ্ন ফাঁস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি বড় কমিটি প্রশ্ন তৈরির কাজ করে। তাদের মধ্যে ৮ জন মিলে যদি ৫টি করে প্রশ্নও মুখস্থ করেন তাহলেও ৪০টি প্রশ্ন হয়ে যায়। তবে এবারের অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতে আরও ত্রুটিমুক্ত পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার সকালে কলারোয়া থানার কাছে একটি ভবনে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর লেখার কাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও দালাল চক্রের সদস্যসহ ২৯ জনকে আটক করে র‌্যাব। তাদের মধ্যে পাঁচজন প্রশ্ন সরবরাহকারী, ১৬ জন পরিক্ষার্থী। বাকিরা অভিভাবক। তাদের কাছে পাওয়া প্রশ্নপত্রের সাঙ্গে মূল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামালও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

র‌্যাব-৬ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সৈয়দ মোহাম্মদ নুরুস সালেহিন ইউসুফ দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, পরীক্ষার্থীরা জড়ো হন কলারোয়া উপজেলা সদরের সোনালী সুপার মার্কেট ভবনের কিডস ক্লাব সেন্টারে। তারা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেখানে যান এবং রাতেও থাকেন। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত মোবাইল ফোনে তাদের কাছে প্রশ্ন আসতে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্লাকবোর্ডে লিখে দেয়া হচ্ছিল উত্তর।

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা শাখার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাতক্ষীরা ক্যাম্প কমান্ডার লে. মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে র‌্যাব সদস্যরা ভবনটি ঘিরে ফেলেন। সেখান থেকে প্রথমে ২২ জন পরে তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী আরও ৭ জনকে আটক করা হয়।

আটককৃতদের মধ্যে দু’জন ব্যাংক কর্মকর্তাও রয়েছেন। এরা হলেন কিডস কোচিং সেন্টারের পরিচালক জনতা ব্যাংক সেনেরগাঁতি শাখা ম্যানেজার আফতাবুজ্জামান, কৃষি ব্যাংকের অফিসার মনিরুল ইসলাম, রামকৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমিরুল ইসলাম, প্রশ্ন ফাঁস চক্রের ঢাকা সিন্ডিকেট প্রধান কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার আবদুল হালিম ও আশাশুনির শিক্ষক তরিকুল ইসলাম।

আটক ১৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে সাতজন নারী। আটজন অভিভাবককে ছেড়ে দেয়া হয়।

আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পর র‌্যাব জানিয়েছে, ঢাকায় বসে প্রশ্ন ফাঁসের চক্রান্ত করা হয়েছে। জনপ্রতি ১০-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন ফাঁস ও উত্তর বলে দেয়ার চুক্তি হয়। অগ্রিম ৫ লাখ টাকা করে দেয়া হয়। বাকিটা পরীক্ষা শেষে দেয়ার কথা ছিল।

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, পরীক্ষায় নকল সরবরাহের অভিযোগে পুলিশের উপ-সহকারী পরিদর্শক (এএসআই) মাহবুবুর রহমানকে ১ মাসের দণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরীক্ষা চলাকালে শহরের রশিদ কিশলয় বিদ্যা নিকেতন কেন্দ্রে অনধিকার প্রবেশ করে স্ত্রীকে নকল সরবরাহকালে হাতেনাতে তাকে ধরা হয়। পরীক্ষা শেষে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে হাবিবা তাকে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে ৮ জনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার সকালে পরীক্ষা শুরুর পর পাবনা শহরের শুভ ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে ৪ বহিরাগত যুবককে আটক ও তাদের কাছ থেকে বেশকিছু ডিভাইস ও ২টি চাকুসহ অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।

আটক ব্যক্তিরা হলেন- সাঁথিয়া উপজেলার ধোপাদহ ইউনিয়নের দয়রামপুর গ্রামের মৃত হযরত আলীর ছেলে শাকিব উদ্দিন (২০), তেথুলিয়া গ্রামের জাকির হোসেন লেবুর ছেলে আবদুস সোবাহান (২১), চাটমোহর উপজেলার আটলংকা নতুনগ্রামের আবদুস সামাদ সরকারের ছেলে আনোয়ার হোসেন (২৪) ও একই গ্রামের সাহেব আলীর ছেলে সানাউল্লাহ সানি (২৪)।

এছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ৪ পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×