অর্থনীতি সমিতির সংবাদ সম্মেলন

১২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ১০ লাখ ২৫১০ কোটি টাকা * ঘাটতি ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা * রাজস্ব আদায়ে তিন উপায়- পাচার হওয়া ও কালো টাকা উদ্ধার এবং সম্পদ কর * বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ উদ্যোগ * ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আর্থিক খাতে ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব * আমি অর্থমন্ত্রী হলে কোনো বাধা না থাকলে এ বাজেটই দিতাম -আবুল বারকাত * বোরো ধানের মণ ১২শ’ টাকা হওয়া উচিত

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৬ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট প্রস্তাব

আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯০ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করেছে অর্থনীতি সমিতি। এটা অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব করতে যাওয়া ৫ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বাজেটের দ্বিগুণ।

বিকল্প বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ ২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রত্যক্ষ কর ধরা হয়েছে ৬৯ শতাংশ এবং পরোক্ষ কর হবে ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ মোট বাজেটের ৮১ শতাংশই আসবে রাজস্ব আয় থেকে। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাজেট প্রস্তাব করেন সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। এ সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদসহ অর্থনীতি সমিতির সদস্য, পোশাক শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে অবকাঠামো সুবিধাসহ ব্যবসার ব্যয় কমিয়ে আনা এবং ব্যবসা প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার, আর্থিক খাতে ন্যায়পাল নিয়োগ, কর্মসংস্থান বাড়ানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, রফতানি বহুমুখীকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন, অর্থ পাচার রোধসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

এক প্রশ্নের উত্তরে আবুল বারকাত বলেন, ‘আমি অর্থমন্ত্রী হলে কোনো বাধা না এলে আগামী অর্থবছরের জন্য এ বাজেটই দিতাম। কারণ আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা।’

আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ফলে এ বাজেটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে ২০টি নতুন উৎস নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অর্থ পাচার রোধ, কালো টাকা উদ্ধার এবং সম্পদ কর- এ তিন উৎস থেকেই অতিরিক্ত ৯৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে। এ টাকা দিয়ে প্রতি বছর তিনটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব। ফলে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে কোনো বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হবে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

এটি কোনো বড় ঘাটতি নয়।’ বিকল্প বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে। এ দুই খাতে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পরই আছে জনপ্রশাসন খাত, পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্য খাত, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাত। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো হল- কৃষি, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিস, জনশৃঙ্খলা-নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা খাত। আবুল বারকাত বলেন, ‘গত বাজেটে ১০০ টাকার বরাদ্দে উন্নয়ন ব্যয় হতো ৩৯ টাকা। সেখানে প্রস্তাবনা হচ্ছে উন্নয়ন ব্যয় ৫৭ টাকা করতে হবে। আমাদের বাজেট উন্নয়ন অভিমুখী। সেই সঙ্গে উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকারী ও বৈষম্য হ্রাস করার বাজেট।’

বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম পথ হল- অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসার ব্যয় (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস) কমিয়ে আনা, ব্যবসা প্রক্রিয় সহজ (ইজি অব ডুয়িং বিজনেস) করা।’ ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঋণের তুলনামূলক উচ্চ সুদ হারের কারণে (যদিও সরকারি ভাবে সুদ হার কমানোর কথা বলা হচ্ছে) ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ঋণ গ্রহণের উৎসাহ কম।

তাছাড়া নিকট অতীতে সংঘটিত ব্যাংক খাতের অঘটনগুলো আগ্রহী ব্যাংকারদের ঋণ প্রদানে অনুৎসাহিত করেছে। সেই সঙ্গে ব্যবসার অনুকূল পরিবেশের অভাব রয়েছে। সব কিছু মিলে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ও ঋণ নীতি হতে হবে বিনিয়োগবান্ধব।

সেই সঙ্গে অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের মোকাবেলায় সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তাদের পূর্ণোদ্যমে চালু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ঠিক হবে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ সহজ করতে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ২৫ শতাংশ ১ কোটি টাকার কম পুঁজিসম্পন্ন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে দেয়ার বাধ্যবাধকতা করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক ব্যাংকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সেল গঠন করতে হবে। সর্বোপরি আর্থিক খাতের জন্য আলাদা ন্যায়পাল নিয়োগ করতে হবে।’

বাজেটে আরও যেসব প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হল- কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা, কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিভিন্ন বীমা চালু, চর-হাওর-আইলা-সিডর-সাইক্লোন এলাকার মানুষের জন্য সুদবিহীন ঋণ প্রদান, ফসলের উৎপাদন অঞ্চল গঠন, শস্য বহুমুখীকরণ, উপকরণ সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো এবং চাল আমদানি বন্ধ করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত কর। এ সময় ড. বারকাত বোরো ধানের বিক্রয় মূল্য মণপ্রতি ১২শ’ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান।

কর্মসংস্থান বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দেশে প্রতি বছর ৩০ লাখ মানুষ শ্রম বাজারে প্রবেশ করে। এর মধ্যে ২০ লাখেরই কর্মসংস্থান হয় না। এজন্য আত্মকর্মসংস্থানসহ ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেকারদের জন্য বছরে কমপক্ষে ২০০ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে গত বছরের তুলনায় ৩ গুণ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পেনশনভোগীদের আয় থেকে সর ধরনের আয়কর, কর, শুল্ক সম্পূর্ণ রহিত করা উচিত। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। শিক্ষা খাতে বৈষম্য, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মানের অবক্ষয় রোধে পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোচিং সেন্টার নিষিদ্ধ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রবাসী কর্মীদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। এছাড়া শিল্পায়ন বাড়াতে শিল্পনীতি সংস্কার, বিদ্যুৎ খাতে অবকাঠামো নির্মাণ, তেল-গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠন, বিনিয়োগ বোর্ডের সংস্কার করা উচিত। কর-রাজস্ব বাড়াতে কর উপদেষ্টা নিয়োগ, রাজস্ব কমিশন গঠন, ভ্যাট লাইসেন্সধারীদের তথ্য সংরক্ষণ ও ভ্যাট আদায়, সিগারেট-বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যে অধিক হারে আবগারি শুল্ক আরোপ, টিআইএনধারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আওতা বাড়ানো ও বৃহৎ করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে।’ অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, দেশে বছরে ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ পাচার হচ্ছে। এ অর্থ পাচার রোধ করে বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব। সেই সঙ্গে কালো টাকা উদ্ধার থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা আহরণ সম্ভব।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×