শ্যামপুরে ওয়াসার পয়ঃশোধনাগার

লেগুনের বিষাক্ত মাছ বাজারে

জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর * আক্রান্ত হতে পারে কিডনি, যকৃত, পাকস্থলী, স্নায়ুতন্ত্র

  আহমদুল হাসান আসিক ২৭ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিষেধাজ্ঞা আছে হাইকোর্টের, অনুমোদন নেই ওয়াসারও। কিন্তু তাতে থেমে নেই রাজধানীর শ্যামপুরের ওয়াসার ‘পাগলা পয়ঃশোধনাগার’র ১৬টি লেগুনে মাছ চাষ। স্থানীয় প্রভাবশালী ও ওয়াসার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর এসব লেগুনে মাছ চাষ হচ্ছে।
প্রতীকী ছবি

নিষেধাজ্ঞা আছে হাইকোর্টের, অনুমোদন নেই ওয়াসারও। কিন্তু তাতে থেমে নেই রাজধানীর শ্যামপুরের ওয়াসার ‘পাগলা পয়ঃশোধনাগার’র ১৬টি লেগুনে মাছ চাষ। স্থানীয় প্রভাবশালী ও ওয়াসার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর এসব লেগুনে মাছ চাষ হচ্ছে।

আর বিষাক্ত ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সেসব মাছ বিক্রি করা হচ্ছে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে। রাজধানীর লাখ লাখ মানুষের প্রাত্যহিক মল ও অন্য বর্জ্যসহ নর্দমার দূষিত পানি জমা হওয়া ওই জলাশয়ে অতি দ্রুত মাছ বেড়ে উঠে।

শ্যামপুরের এ লেগুনে চাষ হচ্ছে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, আফ্রিকান মাগুর, সিলভার কার্প ও নাইলোটিকা নয়, ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে রুই, কাতলা, মৃগেল আর নলা। বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগার এবং মৎস্য অধিদফতরের পরীক্ষায় এসব লেগুনের মাছে মাত্রাতিরিক্ত কলিফর্ম, ইকোলাই এবং অ্যালুমিনিয়াম, দস্তা, ক্যাডমিয়াম, পারদ প্রভৃতি পদার্থ পাওয়া গেছে। কলিফর্ম জীবাণু ডায়রিয়া, জন্ডিস, যকৃৎসহ পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। ইকোলাই কিডনি ক্রমশ অচল করে দেয়। স্নায়ুতন্ত্রের উপরেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে।

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বাজারের ক্রেতাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় যে, তারা এসব বিষাক্ত মাছ কিনছেন এবং সেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

এসব লেগুনে মাছ চাষের শুরু গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। স্থানীয় কিছু লোক মাছ চাষ করে ব্যাপক লাভবান হওয়ার পর ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমবায় সমিতি ওয়াসার অনুমোদন নিয়ে লেগুনগুলো বাণিজ্যিকভিত্তিতে মাছ চাষের জন্য লিজ দিতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ওয়াসা নিজ উদ্যোগে একাধিক বৈজ্ঞানিক সংস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা করিয়ে মাছ বিষাক্ত হওয়ার প্রমাণ পায়। তারপর লিজ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু লেগুনে মাছ চাষ চলছেই। বিশেষত, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা ওয়াসার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় এ বিষাক্ত মাছ চাষ করছে।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ২ মাস পরপর বিষ ঢেলে মাছ নিধনের কথা থাকলেও ওয়াসা বিষ দেয় বছরে মাত্র একবার। স্থানীয়রা একে বলছেন, ‘আই ওয়াশ’। মাছ নিধনের আগে রাতের আঁধারে জাল ফেলে সব মাছ ধরার পর লেগুনে বিষ ঢালা হয়। সারা বছরই রাতের আঁধারে লেগুনা থেকে মাছ ধরে ট্রাক-পিকআপে করে নেয়া হয় সোয়ারীঘাট, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। কিছু মাছ চলে যায় নারায়ণগঞ্জে। তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় পাইকারি মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে এসব মাছের ব্যাপক চাহিদা।

স্থানীয়রা বলেন, মাছ চাষ ও ধরার নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরির সাবেক সিবিএ নেতা ও শ্রমিক লীগ নেতা মো. শাহজাহান ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি মো. হোসেন। একই কথা বলেন শ্যামপুরের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হারুন অর রশীদ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ওয়াসার লেগুনে মাছ চাষ ও মাছ ধরার নেতৃত্বে মো. শাহজাহান এবং হোসেন। তারাই ওয়াসাকে ম্যানেজ করে লেগুন থেকে মাছ ধরে ব্যবসা করছেন।

স্থানীয় কৃষক লীগের এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, লেগুনে এখনও মাছ চাষ হয়। লেগুনের মাছ চাষ ও মাছ ধরে বিক্রির নেতৃত্বে রয়েছেন শাহজাহান। বেশ কয়েকটি লেগুনায় হোসেন মাছ চাষ করে। এ দু’জনের নেতৃত্বেই চলে মাছ চাষ ও ধরা। তাদের অনেক সহযোগীও রয়েছে। তাদের সঙ্গে অনেক রাঘববোয়ালও জড়িত।

পাগলার পয়ঃশোধনাগারের ওয়াসা গেটের একাধিক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ওয়াসার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা লেগুনে মাছ চাষ করে। ১৬টি লেগুনের মধ্যে ১ ও ২ নম্বর লেগুনেই বেশি মাছ চাষ করা হয়। অন্য লেগুনগুলোতে প্রাকৃতিকভাবেই মাছ উৎপাদন হয়। একটি লেগুনে একবার জাল টানলে এক পিকআপ মাছ ধরা পড়ে। লেগুনে মাছ চাষ ও মাছ ধরে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ওয়াসার কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শ্রমিক লীগ নেতা মো. শাহজাহানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে একজন নারী তা রিসিভ করেন। শাহজাহানের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, শাহজাহান অসুস্থ। এখন কথা বলতে পারবেন না। অন্যদিকে মো. হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ৮-১০ বছর আগে আমি লেগুনে মাছ চাষ করতাম। এখন করি না। এর সঙ্গে শাহজাহান জড়িত। তার সঙ্গে অনেকেই রয়েছেন। মোবাইল ফোনে এত কথা বলা তো সম্ভব নয়।

পাগলা ওয়াসা পয়ঃশোধনাগারের লেগুনের নিরাপত্তার দায়িত্বে একটি আনসার ক্যাম্প রয়েছে। ক্যাম্পের ইনচার্জ হোসেন হায়দার যুগান্তরকে বলেন, এক মাস আগে আমি এ ক্যাম্পে যোগ দিয়েছি। এর আগে ওয়াসা লেগুনে বিষ দিয়ে মাছ নিধন করেছে। আমি যোগ দেয়ার পর কেউ মাছ ধরেননি।

পয়ঃশোধনাগারটির নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির। ১৬টি লেগুনের দেখভালের সার্বিক দায়িত্ব তার। রাতের আঁধারে লেগুনে মাছ ধরার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হুময়ায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, রাত-বিরাত, দিন-দুপুরে অনেক কিছুই হতে পারে। মাছ চাষে তো ওয়াসা কাউকে অনুমতি দেয়নি। মাছ নিধনে আমরা সব সময় সচেষ্ট আছি। মানুষ যেন লেগুনে ঢুকতে না পারে সে বিষয়ে আমরা চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে দেয়াল তৈরি করা হয়েছে।

এদিকে এ বিষয়ে এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে ২০১৫ সালের এক রায়ে হাইকোর্ট সাত দফা নির্দেশনা দেন। নির্দেশনা অনুসারে, দুই মাস পরপর ওষুধ প্রয়োগ করে লেগুনের মাছ নিধন করতে হবে। অথচ প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, বছরে একবার করে কেমিক্যাল দিয়ে মাছ নিধন করা হয়। একবার এ কাজ করতে প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ হয়। এখন আমরা এমন একটা সিস্টেমে চলে এসেছি বিষ দেয়াই লাগবে না। এতে মাছও থাকবে না।

হাইকোর্টের নির্দেশনায় আরও বলা হয়, লেগুন এলাকায় তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আনসার ও নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ করতে হবে। লেগুন এলাকায় নৈশ টহল জোরদার করতে হবে। জনসচেতনতার জন্য ‘এ মাছ বিষাক্ত, ক্ষতিকর এবং মাছ চাষ ও ধরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ লেখা প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। ওই এলাকার জনপ্রতিনিধিরা নাগরিক কমিটি গঠন করে মাছ চাষ বন্ধের ব্যবস্থা নেবেন এবং ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করবেন। কিন্তু সরেজমিন লেগুন এলাকায় জনসচেতনতামূলক কোনো সাইনবোর্ড চোখে পড়েনি। ৪ বছরেও হয়নি কোনো নাগরিক কমিটি।

হাইকোর্টের নির্দেশনা কেন মানা হচ্ছে না এ বিষয়ে জানতে চাইলে পয়ঃশোধনাগারের নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, ভাই, আপনাকে আমি এমনিতেই অনেক কথা বলেছি। আমি এসব কথা বলার কোনো অথরিটি নই। আপনি ওয়াসার জনসংযোগ অফিসে যোগাযোগ করেন।

তবে আদালতে এ বিষয়ে রিট আবেদনের পক্ষে থাকা আইনজীবী মনজিল মোরসেদ যুগান্তরকে বলেন, যদি কেউ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে তবে তা আদালত অবমাননার শামিল।

বিষাক্ত এসব মাছ চাষ ও বিক্রি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকাশ কুমার ভৌমিক যুগান্তরকে বলেন, আমি বেশিদিন হয়নি কাউন্সিলর হয়েছি। আমি আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে অবগত হয়েছি। এখন শিগগিরই একটি কার্যকর নাগরিক কমিটি গঠন করব। বিষাক্ত মাছ চাষ বা বিক্রির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আমরা এ বিষয়ে সবসময় সচেষ্ট থাকব।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×