৩ সংগঠনের যৌথ সংবাদ সম্মেলন

বন্ডের অপব্যবহার বন্ধ ও ৫ শতাংশ প্রণোদনা দাবি

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্পের জন্য আত্মঘাতী হবে -বিটিএমএ সভাপতি * নতুন বাজারের প্রণোদনাতেও শুভংকরের ফাঁকি : ইএবি’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পোশাকশিল্প

বন্ডের আওতায় আনা সুতা, কাপড় খোলাবাজারে দেদার বিক্রির কারণে দেশের স্পিনিং, উইভিং, প্রিন্টিং, ফিনিশিং মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে। মিলগুলো বাধ্য হয়ে কম দামে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করছে।

অন্যদিকে শ্রমিকদের বেতন দিতে না পারায় এক মাসে ২২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মালিক কারখানার মেশিন বিক্রি করে বেতন-বোনাস দিচ্ছেন। এ সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে উত্তরণে আগামী ৫ বছর তৈরি পোশাক খাতে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দিলে রফতানি আয় ও কর্মসংস্থানে শীর্ষে থাকা খাতটি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

সোমবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে পোশাক খাতের ৩ সংগঠন যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানিয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মনসুর আহমেদ, রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

ড. রুবানা হক বলেন, নির্বাচনের কারণে ক্রেতারা অর্ডার কম দিয়েছে। ফলে অনেক কারখানা শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিতে পারছে না। এ অবস্থায় পোশাক খাত সহযোগিতা না পেলে আরও ধুঁকতে থাকবে।

সরকার প্লাস্টিক দ্রব্য রফতানিতে ১০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে, এতে রফতানি ৪৬ মিলিয়ন ডলার বেড়েছে। সিরামিক পণ্যে ১০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে, রফতানি বেড়েছে ২১ মিলিয়ন ডলার, চামড়া ও ফার্নিচারে ২৫ শতাংশ দিচ্ছে, এ দুই খাতে ৯৬২ মিলিয়ন ডলার বেড়েছে। তৈরি পোশাকে আগামী ৫ বছর ৫ শতাংশ প্রণোদনা দিলে, এ খাত ফের ঘুরে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতকে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দিলে অতিরিক্ত ১১ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা লাগবে। যেখানে হলমার্ক ৫ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যায়, সেখানে এই টাকা কিছুই নয়। এ ছাড়া প্রণোদনার অর্থ পেতে এক থেকে দেড় বছর লাগে, এটা সহজ করতে হবে। শিল্পের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বেতন দিতে না পারায় ঈদের আগে আরও ২-৪টি কারখানা বন্ধ হতে পারে।

বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে শুল্কমুক্ত ও মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা সুতা, কাপড় ও বিদেশি ড্রেস ম্যাটেরিয়াল অবাধে বিক্রির কারণে দেশের স্পিনিং, উইভিং, প্রিন্টিং, ফিনিশিং মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে।

উদ্যোক্তারা কম দামে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এ কারণে মিলগুলোর আর্থিক কাঠামো নাজুক হয়ে পড়েছে। বাজেটে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া না হলে শিল্প আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, নতুন ভ্যাট আইনের কারণে ট্যারিফ প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় সর্বনিম্ন গ্রেডের সুতার দাম ১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের সুতার দাম প্রতি কেজি ২৩ টাকা বাড়বে। তাই সুতায় ট্যারিফ মূল্য বহাল রাখা উচিত।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে তা শিল্পের জন্য আত্মঘাতী হবে মন্তব্য করে খোকন বলেন, গত এক বছর ধরে প্রতি কেজি সুতায় ব্যবসায়ীরা ২০-৩০ সেন্ট লোকসান দিচ্ছে। এ অবস্থায় গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ বাড়বে। এ বর্ধিত ব্যয় টেক্সটাইল শিল্পে অন্য কোনো খাতে সমন্বয়ের সুযোগ নেই। তাই গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে নিশ্চিতভাবে ধ্বংসের দোরগোড়ায় গিয়ে পৌঁছবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সার্কুলারে ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেয়া হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব সার্কুলারে ভালো ঋণ গ্রাহকদের সুযোগ দেয়া হয়নি। রেয়াতের যে কথা বলা হয়েছে, তা সাপলুডু খেলার মতো। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের পরও কেউ শিপমেন্টের কারণে এক মাসের কিস্তি দিতে না পারলে রেয়াত সুবিধা পায় না। অথচ বিনাশর্তে ঋণখেলাপিদের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে।

বিকেএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মনসুর আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল পোশাকের বাজার রয়েছে। শুল্ক বাধার কারণে এসব বাজারে রফতানি সম্ভব হচ্ছে না। জিএসপি সুবিধা বাতিলের পর ১৬-৩০ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির জন্য ১৬ শতাংশ প্রণোদনা দিলে রফতানি বহুলাংশে বাড়বে।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক খাত ক্রান্তিকাল পার করছে। এ খাতকে বিদ্যমান সব প্রণোদনার পাশাপাশি আগামী বাজেটে নতুন ৫ শতাংশ প্রণোদনা দিলে শিল্প টিকে থাকবে। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রণোদনা পেতে রফতানিকারকদের হয়রানি হতে হয়।

নতুন বাজারের প্রণোদনাতেও শুভংকরের ফাঁকি আছে। ৫ শতাংশের জায়গায় ৩ দশমিক ২ শতাংশের বেশি প্রণোদনা পাওয়া যায় না। প্রণোদনা পেতে শুরুতে অডিট ফার্মের সার্টিফিকেট হয়রানি, এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট বিভাগের হয়রানি ও সর্বশেষ স্থানীয় রাজস্ব অডিট অধিদফতরের কাছে হয়রানি হতে হয়। এত সব হয়রানির পর প্রণোদনা পেতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগে। এ হয়রানি থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রণোদনা সহজীকরণ করতে হবে।

বাজেটে সংগঠনগুলোর চাওয়া : পোশাক খাতের সংকট মোকাবেলায় আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তের জন্য একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে ৩টি সংগঠনই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- রফতানির উৎসে কর দশমিক ২৫ শতাংশ বহাল, কর্পোরেট কর ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত পণ্য ও সেবাকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা, ভ্যাট রিটার্ন দাখিল থেকে অব্যাহতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিলের বিপরীতে শতভাগ ভ্যাট অব্যাহতি, নিরাপত্তা সামগ্রী আমদানিতে ৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ স্ট্যাম্প ডিউটি থেকে অব্যাহতি এবং বন্ড অডিটের জন্য দলিলাদি জমার সময়সীমা ৩ মাসের পরিবর্তে ৬ মাস বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পোশাক কারখানার জন্য ব্যাংক ঋণের সুদ হার এক অংকে নামিয়ে আনা এবং তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে সংগঠনগুলো। ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মেয়াদ দ্বিগুণ এবং এ খাতে অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যেসব কারখানা ইচ্ছাকৃত খেলাপি নয়, তাদের উৎপাদন কাজে ফিরে যাওয়া এবং ব্যবসা সচল রাখার সুযোগ হিসেবে ঋণ পুনঃতফসিলের মেয়াদ দ্বিগুণ করা উচিত। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতিও সুফল ভোগ করবে। এ জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এ ছাড়া এলসি খোলা ও স্বীকৃতির কমিশন ২০ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনগুলো।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×