বিশ্ব দুগ্ধ দিবস আজ

ভেজালমুক্ত দুধ নিশ্চিতে জনসচেতনতা জরুরি

দুগ্ধ খামারি ১২ লাখ, দেশেই উৎপাদন হচ্ছে চাহিদার ৭০ শতাংশ দুধ

  শিপন হাবীব ০১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুষ্টি চাহিদা পূরণে প্রাণিজ আমিষ হিসেবে গাভীর দুধের কোনো বিকল্প নেই
পুষ্টি চাহিদা পূরণে প্রাণিজ আমিষ হিসেবে গাভীর দুধের কোনো বিকল্প নেই। ছবি: সংগৃহীত

আজ বিশ্ব দুগ্ধ দিবস। মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় খ্যাদ্য উপাদান প্রোটিনের অন্যতম উৎস দুধ। আদর্শ এ খাবারের চাহিদার ৭০ শতাংশই দেশে উৎপাদন হচ্ছে। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ বছরে দেশে দুগ্ধ খামারির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২ লাখ। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন দুধ উৎপাদন হচ্ছে ৯৪ লাখ টন (২০১৮ সালের পরিসংখ্যান)। ৯৪ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুগ্ধ খামার ব্যবসায় জড়িত। দুধের চাহিদা যেমন প্রতি বছর বাড়ছে, তেমনি উৎপাদনও বাড়ছে। তবে এরই মধ্যে দুধে ভেজাল দেয়া, ইউরিয়া, রং, ডিটারজেন্টসহ ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে নকল দুধ বিক্রির যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে তাতে প্রকৃত দুগ্ধ ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজালমুক্ত দুধ নিশ্চিতে সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উপকারিতা বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উদ্যোগে ২০০১ সাল থেকে প্রতি বছর জুনের প্রথম দিনে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবারে দুগ্ধ দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘দুধ পানের অভ্যাস গড়ি, পুষ্টির চাহিদা পূরণ করি।’ নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আজ দিবসটি পালিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, দুধে ভেজাল হিসেবে যেসব বস্তু ব্যবহৃত হয় সেগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক ও মারাত্মক রোগের জন্য দায়ী। তবে দেশে ভেজাল দুধ নির্ণয়ে উন্নতমানের মেশিন নেই। এছাড়া বাজারে যাওয়ার আগে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় দুধে এ ভেজাল যোগ হচ্ছে তাও পুরোপুরি উদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি। এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট থেকে এ বিষয়ে এক নির্দেশ দেয়া হয়। ঢাকাসহ সারা দেশে গরুর দুধ, দই এবং গো-খাদ্যে কী পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া, কীটনাশক, সিসা রয়েছে তা নিরূপণের জন্য একটি জরিপ পরিচালনার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ১৫ দিনের মধ্যে খাদ্য সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব, কৃষি সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যানসহ সব সদস্য, কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি ও বিএসটিআইয়ের চেয়ারম্যানকে জরিপের প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। এরপর উচ্চ আদালতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দাখিল করা প্রতিবেদনে দুধে ভেজালের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা ভয়াবহ। সারা দেশ থেকে সংগৃহীত গাভীর খোলা দুধের ৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ৯৩ শতাংশেই বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর অণুজীব পাওয়া গেছে। অণুজৈবিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৯৩টি নমুনাতে টিপিসি ও কলিফরম ক্ষতিকর মাত্রায় বিদ্যমান। একটি নমুনায় সালমোনেলা পাওয়া গেছে। আর মানবদেহের জন্য গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা মিলেছে ১৫ শতাংশ দুধে। ১৩ শতাংশ দুধে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি টেট্রাসাইক্লিন, ৯ শতাংশের গ্রহণযোগ্য মাত্রার বেশি কীটনাশক ও ৩ শতাংশের গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি আফলাটক্সিনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম জানান, পুষ্টি চাহিদা পূরণে প্রাণিজ আমিষ হিসেবে গাভীর দুধের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে অন্তত ১ কাপ দুধ খাওয়া উচিত। শুধু রাজধানী ঢাকার জনগোষ্ঠী যদি দিনে ১ কাপ করে দুধ খায়, তাহলে প্রায় ১০ লাখ লিটার দুধ প্রতিদিন প্রয়োজন। দুধে ভেজাল দেয়া মানেই হচ্ছে ভেজালমুক্ত আর কিছু রইল না। এ পরিস্থিতি থেকে একদিকে যেমন নাগরিকদের পুষ্টি চাহিদার ঘাটতির চিত্র ফুটে উঠছে, তেমনি তা দেশে দুধ উৎপাদন ও বিপণনের বিশাল বাজারের সম্ভাবনাকেও নির্দেশ করছে। সরকারের এখন একদিকে যেমন বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত দুধের ভেজাল বন্ধ করে নিরাপদ দুধের জোগান নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, তেমনি বিপুল সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যৎমুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে সামাজিক সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।

পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার আলো বলেন, দুধে ভেজাল একটি জাতির জন্য ভয়ানক। শিশুদের জন্য খুবই মারাত্মক, শিশুদের শৈশবটি ধ্বংস করে দেয় ভেজাল দুধ। তার মেধা-প্রজ্ঞাকে বাধাগ্রস্ত করে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। তাই আমরা বলি, বিশেষ করে গরুর দুধ শিশুদের না খাওয়াতে। কারণ, ভেজালতো আছেই। সরাসরি গাভীর দুধ এনে খাওয়ানো হলেও সমস্যা রয়েছে। গাভীতে দুধ বাড়াতে বেশি পরিমাণ ভিটামিন ও বিভিন্ন ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে। এতে করে ওই দুধ আর স্বাভাবিক দুধ থাকে না। ওই দুধ ভেজাল দুধের মতোই বিষাক্ত হয়। তিনি বলেন, সামাজিক সচেতনতা ও আন্দোলন ছাড়া এমন ভয়ানক অবস্থান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়। ভেজাল দুধ ও গাভীকে ভিটামিন নামক বিষাক্ত ওষুধ খাওয়া বন্ধে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ এমরান যুগান্তরকে বলেন, ভেজাল দুধ সরবরাহকারীসহ এর সঙ্গে যুক্তদের শক্ত হাতে দমনের পক্ষেই আমাদের অবস্থান। তবে আদালতের নির্দেশনার পর দুধে ভেজাল নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ঢালাওভাবে বলা হচ্ছে- দুধে মাত্রার চেয়ে বেশি সিসাসহ ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। এ বিষয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়া উচিত বলে মনে করি।

দুগ্ধ খামারীদের দাবি- পোলট্রি ও মৎস্য শিল্পের মতো দুগ্ধ খামারিদের স্বল্পসুদে ঋণ বিতরণে এবং আগামী ২০ বছর পর্যন্ত আয় করমুক্ত রাখা। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব দুগ্ধ দিবস উপলক্ষে আজ রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরে বিনামূল্যে দুধ বিতরণসহ সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×