সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মূলধন জোগান

জবাবদিহি করতে হবে করের টাকা নিলে

রাজনৈতিক চাপমুক্ত হলে জবাবদিহিতা বাড়বে-ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ * দুর্নীতি করলে আটকে যাবে পেনশন

  দেলোয়ার হুসেন ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি খাতের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধন বাবদ সরকারের কাছ থেকে জনগণের করের টাকা নিলে জবাবদিহি করতে হবে। মূলধনের অর্থ কিভাবে খরচ হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হবে। ঋণ বা বিনিয়োগের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, ঋণ আদায় না হওয়ার কারণ কি এসব তথ্যও পর্যালোচনা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে মাসিকভিত্তিতে এ সংক্রান্ত তথ্য অবহিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ, নির্বাহী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকেও জবাবদিহি করতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে সংস্থার সংশ্লিষ্টদের পদোন্নতি, ইক্রিমেন্ট স্থগিত থাকবে। দুর্নীতি করলে আটকে যাবে পেনশনের সুবিধা। এবার বিষয়গুলো কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি খাতের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধন বাবদ সরকারের কাছ থেকে জনগণের করের টাকা নিলে জবাবদিহি করতে হবে। মূলধনের অর্থ কিভাবে খরচ হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হবে। ঋণ বা বিনিয়োগের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, ঋণ আদায় না হওয়ার কারণ কি এসব তথ্যও পর্যালোচনা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে মাসিকভিত্তিতে এ সংক্রান্ত তথ্য অবহিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ, নির্বাহী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকেও জবাবদিহি করতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে সংস্থার সংশ্লিষ্টদের পদোন্নতি, ইক্রিমেন্ট স্থগিত থাকবে। দুর্নীতি করলে আটকে যাবে পেনশনের সুবিধা। এবার বিষয়গুলো কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।

সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আলোকে সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জবাবহিদিতা আদায় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক চাপ বেশি। রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে এগুলো পরিচালিত হলে অবস্থার উন্নতি হবে। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা বাড়বে।

তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বাংলাদেশ ব্যাংক কাউকে পরিচালক বা এমডি নিয়োগ না দিলেও মন্ত্রণালয় তার নিজস্ব ক্ষমতায় নিয়োগ দিচ্ছে। এ প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

সূত্র জানায়, সরকারি খাতের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধনের বড় অংশই সরকার জনগণের করের টাকা থেকে জোগান দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, সরাসরি মূলধন হিসেবে অর্থ দেয়া, রাইট শেয়ার কেনার মাধ্যমে, বাজেটের মাধ্যমে বরাদ্দ রেখে অর্থের জোগান দেয়া হয়। এসব অর্থ সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ হিসাবে বিনিয়োগ করে। কিন্তু ঋণ আদায় না হওয়ায় খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধন সংকটে পড়েছে। এ সংকট মেটাতে সরকার থেকে আবারও অর্থের জোগান দেয়া হচ্ছে। এগুলো যাতে বন্ধ হয় সেজন্য তাদের কাছ থেকে জবাবদিহিতা আদায় করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের পর্ষদে যারা থাকেন তাদের কাজের যেমন জবাবদিহিতা নেই, তেমনি নির্বাহী ও কর্মকর্তাদেরও নেই। ফলে দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। নিজ নিজ অবস্থান থেকে পর্ষদ, নির্বাহী ও কর্মকর্তারা সব ধরনের সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন।

এর আগে সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। হলমার্ক গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের ৪ হাজার কোটি টাকা হাওয়া করে দেয়। এছাড়া লোকসানের ভারে জর্জরিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাবিনকো। যথাযথ তদারকির অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো এ অবস্থায় পড়েছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সে উদ্যোগই নেয়া হয়েছে।

এর আগে গত বছর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এমন একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তখন জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, বাজেটের আওতায় অর্থ নিলে সে অর্থ কোথায় কিভাবে খরচ করা হচ্ছে তা মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। কিন্তু এ বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করা হয়নি। এবার এসব প্রতিষ্ঠানকে দেয়া সব ধরনের সরকারি অর্থের জবাবদিহিতা আদায়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে কোথায় কিভাবে বিনিয়োগ করছে তা নিয়মিতভাবে দেখা হবে। অনিয়ম হলে শাখার কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পর্ষদ পর্যন্ত যে যতটুকু দায়বদ্ধ তার দায়িত্ব তাকে নিতে হবে। সে আলোকেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। আগে বিশেষ পরিদর্শনের মাধ্যমে দেখা হতো। তখন অনিয়মের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু সুপারিশ করত। অনেক ক্ষেত্রেই সুপারিশের আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হতো না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলেও আর্থিক বাজারের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে না। অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।

সূত্র জানায়, সরকার থেকে মূলধন নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে সেগুলোতেও একই পদ্ধতি আরোপ করা হবে। এছাড়াও যেসব প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজার থেকে জনগণের অর্থ নিচ্ছে বা গ্রাহকদের আমানত নিয়ে কাজ করছে ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বও সরকারের। এ কারণে এগুলোর জবাবদিহিতা আরও কঠোর করা হবে।

প্রতিটি সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তদারকি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ আইন দ্বারা পরিচালিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আইন সংশোধন করে তদারকির ক্ষমতা দেয়া হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। ইতিমধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ওই ব্যাংকের তদন্তেরর ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক আগে ছিল একটি বিশেষায়িত ব্যাংক। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। গত বছর আইন সংশোধন করে এটিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আসায় তদারকি করতে পারবে।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে তদারকি চলছে। এখন শুধু ব্যাংকগুলোতে এ তদারকি চলে। শিগগিরই অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তদারকির আওতায় আসবে। এর বাইরে মালিক হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ও তদারকি করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে সরকারি খাতে বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে ৬টি, বিশেষায়িত ব্যাংক ২টি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ২টি। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আছে, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, সমবায় ব্যাংক, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক ও কর্মসংস্থান ব্যাংক।

বর্তমানে কর্মসংস্থান ব্যাংক, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এসব প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি তদারকি করতে পারে না। বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে তদন্ত করতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব আইনে চলে। এগুলোকেও কেন্দ্রীয় ব্যংকের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বর্তমানে আইসিবি তদারকি করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক তদারকি করে সমবায় অধিদফতর। কর্মসংস্থান ব্যাংক ও বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন তদারকি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

এছাড়াও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, জীবন বীমা কর্পোরেশন, সাধারন বীমা কর্পোরেশনে সরকারের অর্থ রয়েছে। এর মধ্যে জীবন বীমা ও সাধারণ বীমা কর্পোরেশনকে তদারকি করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ। এসব প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারের ব্রোকারেজ হাউস হিসেবে কাজ করে। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক তদারকি করে জাতীয় ডাকঘর। প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মালিক হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানে তদারকি জোরদার করবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×