ঈদ সামনে রেখে নীরব চাঁদাবাজি

আপসে চাঁদা দেন ব্যবসায়ীরা, ভয়ে থানায় যান না * ফুটপাতে বেড়েছে তিনগুণ চাঁদা, তুলছে ৫ শতাধিক লাইনম্যান

  ইকবাল হাসান ফরিদ ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদ সামনে রেখে রাজধানীতে নীরব চাঁদাবাজি চলছে। ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে বড় বড় শপিংমলের ব্যবসায়ী এমনকি বাড়িওয়ালাদেরও গুনতে হচ্ছে চাঁদা। তবে ভয়ে মুখ খুলছেন না ভোক্তভোগীরা। তারা আপসে মেটাচ্ছেন চাঁদাবাজদের দাবি।
ফাইল ছবি

ঈদ সামনে রেখে রাজধানীতে নীরব চাঁদাবাজি চলছে। ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে বড় বড় শপিংমলের ব্যবসায়ী এমনকি বাড়িওয়ালাদেরও গুনতে হচ্ছে চাঁদা। তবে ভয়ে মুখ খুলছেন না ভোক্তভোগীরা। তারা আপসে মেটাচ্ছেন চাঁদাবাজদের দাবি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোর মতো এবারও ঈদ ঘিরে সক্রিয় চাঁদাবাজদের বিভিন্ন গ্রুপ। শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসী ও ক্ষমতাসীন দলের ওয়ার্ড পর্যায়ের কিছু নেতা চাঁদাবাজিতে নেমেছেন। টাকা তুলছে পুলিশও। বসে নেই পাড়ার উঠতি সন্ত্রাসীরাও। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শুধু টাকা নয়, শার্ট, পাঞ্জাবি, শাড়ি, থ্রিপিসও দাবি করছে চাঁদাবাজরা। এরা সবাই পরিচিত কিংবা মুখ পরিচিত। যে কারণে পুলিশে অভিযোগ করেন না তারা।

রাজধানীর পুরান ঢাকা, মিরপুর, নিউমার্কেট ও পুরান ঢাকার বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, চাঁদাবাজদের ভয়ে তারা অপরিচিত ফোন ধরাই ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু ল্যান্ডফোনে চাঁদা চাওয়া এড়ানো যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে আপসরফা করেই নিরাপদ থাকার চেষ্টা করছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো নেতার নামেও চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। ১০ ও ১১ নম্বর বেনারসি পল্লীর একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তারা চাঁদা দিয়েই এ এলাকায় ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। একজন বলেন, ‘১৫ রোজার পর থেকেই শুরু হয়েছে ঈদ সেলামি দেয়া। না দিয়ে রেহাই নেই। লাইফ ও ব্যবসার রিস্ক থাকে।’

ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, মিরপুর রোডের ধানমণ্ডি ও নিউমার্কেট অংশে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কিছু ক্যাডার সারা বছরই চাঁদা উঠায়। তবে ঈদ-পার্বণে এদের উৎপাত বেড়ে যায়।

পুরান ঢাকার ইসলামপুরের এক কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, ‘ডাকাত শহীদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা এখনও এলাকায় তৎপর। জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থেই তাদের টাকা দিয়ে ব্যবসা করছি।’

চাঁদা না দেয়ায় ২৬ মে শ্যামলীর ‘ঢাকা টায়ার-ব্যাটারি সেলস’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হাসানুজ্জামান শান্তকে (৩৮) কুপিয়ে জখম করে সন্ত্রাসীরা। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। গুলিস্তান হকার্স, গাউছিয়া, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, খিলগাঁও তালতলা, মিরপুর শাহআলী, ১ নম্বর, মিরপুরের মুক্তিযোদ্ধা সুপার, মুক্তবাংলা, কো-অপারেটিভ সোসাইটি, কুসুম-এ বাগদাদ, গুলশান ১-২, ধানমণ্ডি হকার্স, তালতলা সুপার এবং উত্তরা ও পুরান ঢাকার বেশির ভাগ মার্কেট ও শপিং কমপ্লেক্স ঘুরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। চাঁদার অঙ্ক ১০ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা।

এদিকে চাঁদাবাজদের উৎপাতে রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন ফুটপাতের হকাররা। তারা জানিয়েছেন, চাঁদার পরিমাণ বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। দুইশ’ টাকার চাঁদার জায়গায় ৬শ’ টাকা গুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এমএ কাশেম বলেন, সরকারি-বিরোধী দলের সাঙ্গোপাঙ্গো এবং পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্য- এই তিন শ্রেণীর লোক একাট্টা হয়ে চাঁদাবাজি করছে। যেখানে হকার আছে, সেখান থেকেই চাঁদা নেয়া হচ্ছে। রাজধানীতে লাইনম্যান নামধারী ৫ শতাধিক ব্যক্তি পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের হয়ে চাঁদাবাজি করছে। আর দুলাল নামে এক ব্যক্তি লাইনম্যানদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুলিশকে দেয়। তিনি জানান, গুলিস্তান রাস্তায় হকারদের কাছ থেকে টাকা উঠায় আমিন, মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষিণ পাশের ফুটপাত থেকে চাঁদা উঠায় ফেনসি নাসিরের সহযোগী আজাদ, সোনালী ব্যাংকের সামনের ফুটপাতে চাঁদা উঠায় মকবুল, রূপালী ব্যাংকের সামনে তাজুল ও তার ছেলে বাবলু, বলাকার সামনে নুর ইসলাম, জীবন বীমা ভবনের সামনের ফুটপাতে চাঁদা উঠায় কালা কাশেম, ফকিরাপুলে চাঁদা তুলে আনোয়ার, বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে দুম্বা রহিম, তোপখানা এলাকায় রহিম, পল্টন জিপিওর সামনে দাড়িওয়ালা সালাম, গুলিস্তানে হামদর্দের সামনে চাঁদা উঠায় জুয়ারি সালাম, পূর্ণিমার সামনে আক্তার ও জাহাঙ্গীর, গুলিস্তান রাজধানী হোটেলের সামনে হিন্দু বাবুল, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সামনে সুলতান, খদ্দের মার্কেটের সামনে কাদের, বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটে কাদের (২), পীর ইয়ামিনী মার্কেটের সামনের ফুটপাতে লম্বা শাহজাহান, গোলাপ শাহ মাজারের সামনে গাওরা বাবুল, নগর ভবনের সামনে হিন্দু শাহীন, সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের পাশের জুতাপট্টিতে সালেহ, কানা সিরাজ, বাবুল, সেলিম; বঙ্গভবন পার্কের পশ্চিম পাশের ফুটপাতে লম্বা হারুন ও তার শ্যালক দেলু চাঁদাবাজি করে। আর ফার্মগেটে শাহ আলম, জুতা মোবারক ও চুন্নু ফুটপাতের চাঁদা নিয়ন্ত্রণ করে। নিউমার্কেটে চাঁদা উঠায় ইব্রাহিম ওরফে ইবু, সাত্তার মোল্লা, রফিক, বাচ্চু, ইসমাইল।

তিনি জানান, শুধু ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে এমন গডফাদার গুলিস্তানে চারজন, মতিঝিলে তিন, সদরঘাট এলাকায় তিন, নিউমার্কেটে তিন, ফার্মগেটে তিন, মিরপুর-১ নম্বরে দুইজন, ১০ নম্বরে দুইজন, উত্তরায় দুইজন, বাড্ডায় দুইজন ও কুড়িলে দুইজন রয়েছে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, মিরপুরের কচুক্ষেত ও কাফরুল এলাকায় শাহীন শিকদার নামে এক ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের কাছে টেলিফোনে চাঁদা চাচ্ছে। তবে কাফরুল থানার ওসি মো. সেলিমুজ্জান যুগান্তরকে বলেন, কেউ চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেনি। কিংবা জিডিও করেনি।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, রমজানে ছিনতাই, টানা পার্টিসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে র‌্যাব বরাবরের মতো বিশেষ টহলের ব্যবস্থা করেছে। গভীর রাত পর্যন্ত শপিংমলের নিরাপত্তায় র‌্যাব কাজ করছে। এখন পর্যন্ত রাজধানীতে বড় ধরনের অপরাধ ঘটেনি। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া সম্প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘ঢাকা মহানগরীতে যদি আমরা থাকি তবে কোনো চাঁদাবাজ থাকতে পারবে না। চাঁদাবাজ যেই হোক, অভিযোগ পেলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে আইনের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স।’

ঈদ সামনে রেখে মহাসড়কে চাঁদাবাজি রোধে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি চাঁদাবাজি বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি সোহেল রানা বলেন, কেউ চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন- এমন অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×