এটিএম বুথে জালিয়াতি: ইউক্রেনের ৬ নাগরিক ৩ দিনের রিমান্ডে

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এটিএম বুথে জালিয়াতি
এটিএম বুথে জালিয়াতি। ছবি: সংগৃহীত

কার্ড জালিয়াতি করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে দু’দফা টাকা উত্তোলনের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় ইউক্রেনের ছয় নাগরিকের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম ধীমান চন্দ্র মণ্ডল এ আদেশ দেন। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো. আরিফুর রহমান আসামিদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের আট দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন।

রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হল- দেনিস ভিতোমস্কি, নাজারি ভজনোক, ভালেনতিন সোকোলোভস্কি সের্গেই উইক্রাইনেৎস, আলেগ শেভচুক ও ভালোদিমির ত্রিশেনস্কি। আদালতে আসাবিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। আসামিরা জামিনও চায়নি।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামিরা একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্রের সদস্য। তারা অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাক করে। ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য তারা বাংলাদেশে এসেছে মর্মে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, জালিয়াতির মাধ্যমে হ্যাক হয়ে যাওয়া টাকা, জালিয়াতির পদ্ধতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে আসামিদের রিমান্ড প্রয়োজন।

জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার অভিযোগে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ডেলিভারি চ্যানেলের হেড অব অলটারনেট মশিউর রহমান বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় রোববার মামলা করেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, সংঘবদ্ধ ডিজিটাল জালিয়াত চক্রটি খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের সামনের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথসহ ব্যাংকের অন্যান্য বুথ থেকে ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করেছে।’

শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ব্যাংকটির বাড্ডা বুথের দুটি এটিএম বুথ থেকে দুই বিদেশি নাগরিক বিভিন্ন কার্ড ব্যবহার করে একাধিকবার টাকা উত্তোলন করে। বুথ থেকে একজন বের হওয়ার পর আরেকজন টাকা তোলে। এ সময় বুথে নিরাপত্তাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, টাকা উত্তোলনের সময় মাস্ক দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করেছে তারা, চোখে ছিল সানগ্লাস, মাথায় ছিল টুপি।

অভিনব এ নতুন কৌশলে টাকা চুরির ঘটনায় নতুন করে চিন্তার ছাপ পড়েছে ব্যাংকারদের কপালে। কারণ এর আগে যতবারই এটিএম থেকে টাকা চুরি হয়েছে, প্রতিবারই গ্রাহকের কার্ডের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করে। প্রতিবারই গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হন। এবারের ঘটনায় পুরো এটিএম বুথের নিয়ন্ত্রণ নেয় জড়িত বিদেশিরা। টাকা তুলতে কোনো পিন লাগে না। কার্ড মেশিনে প্রবেশ করানোর সঙ্গে সঙ্গে মূল সার্ভারের সঙ্গে বুথের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কোনো রেকর্ড থাকে না। অভিনব এই ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনায় দেশের এটিএম সেবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, শনিবার সকালে বাড্ডার এটিএম বুথের টাকার হিসাব মেলানোর সময় তিন লাখ টাকা কম হয়। ওই এটিএমের দায়িত্বে ছিলেন ওরনেট গ্রুপের নিরাপত্তাকর্মী। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দুই বিদেশি কর্তৃক টাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর সব এটিএম বুথে নিরাপত্তা বাড়ায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। শনিবার রাতেই খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় ডাচ্-বাংলার এটিএমে টাকা চুরি করতে গেলে দুই বিদেশির একজন ধরা পড়ে। পরে আরও পাঁচ বিদেশিকে আটক করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (পূর্ব) খিলগাঁও অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া কার্ডগুলো এটিএম বুথে ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে ওই বুথের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর তারা নিজেদের মতো করে টাকা তুলে নেয়। এটি সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব পদ্ধতি। আগে কখনও এই পদ্ধতির ব্যবহার তাদের নজরে আসেনি।

সতর্ক ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, অন্য ব্যাংকগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার : ঘটনার পর ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সতর্কতামূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জালিয়াতরা যাতে আর কোনো টাকা তুলতে না পারে সে জন্য ছোট কলেবরের এটিএম বুথগুলো থেকে গ্রাহকদের সেবা দেয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু বুথ থেকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষই টাকা সরিয়ে নিয়েছে। তবে ফাস্টট্র্যাক এটিএম বুথগুলো শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্বল্প পরিসরে খোলা রাখা হয়েছে। গ্রাহকরা এসব বুথ থেকে টাকা তুলতে পারছেন। রাজধানী ঢাকাসহ সব জেলা শহরেই ফাস্টট্র্যাক এটিএম বুথ রয়েছে। এমন কি কোনো কোনো থানা পর্যায়েও ফাস্টট্র্যাক এটিএম বুথ রয়েছে। ফলে ওইসব বুথ থেকে গ্রাহকরা টাকা তুলতে পারছেন।

এদিকে ডাচ্-বাংলার পাশাপাশি অন্য সব ব্যাংকের বুথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দারাও বিশেষ নজরদারিতে নেমেছেন। সব ব্যাংকই তাদের তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সফটওয়্যারগুলো নিখুঁতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। ঈদের ছুটিতেও ব্যাংকগুলোর তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগ খোলা থাকবে। যেসব বুথ খোলা রয়েছে সেগুলোতে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। গ্রাহকদের কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

জানতে চাইলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবুল কাশেম মো. শিরিন যুগান্তরকে বলেন, ‘এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরির ঘটনায় বিভিন্ন বুথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। চুরির পদ্ধতি সম্পূর্ণ অভিনব। যে কার্ড দিয়ে চুরি করা হয়, সে কার্ডের সঙ্গে আমরা পরিচিত নই। কার্ডগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।’

ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, ওই ঘটনায় কোনো গ্রাহকের টাকা খোয়া যায়নি। গ্রাহকদের হিসাবে যাতে কোনো জটিলতার সৃষ্টি না হয় সেদিকে ব্যাংক সতর্ক রয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, ইতিমধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ছোট ছোট এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিকটবর্তী ফিডিং ব্রাঞ্চে (যে শাখা থেকে আঞ্চলিক বুথগুলোতে টাকা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়) নেয়া হয়েছে। বেশ কিছু বুথের এটিএম মেশিন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যেগুলোর মেশিন খোলা আছে সেগুলোতে টাকা রাখা হয়নি। এসব বুথে গ্রাহকরা টাকা তুলতে গেলে নিয়োজিত দারোয়ানরা কাড ঢোকাতে নিষেধ করছেন। তারা গ্রাহকদের পরামর্শ দিচ্ছেন নিকটবর্তী ফাস্টট্র্যাক এটিএম বুথগুলোতে গিয়ে টাকা তুলতে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×