কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার: বিদেশিদের বেতন পাঠানোর নিয়ম শিথিল

  দেলোয়ার হুসেন ০৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে কাজ করছেন এমন বিদেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেশের বাইরে পাঠানোর নীতিমালা শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের ৪৫ দিনের মধ্যে অর্থ পাঠাতে হবে।
ফাইল ছবি

বাংলাদেশে কাজ করছেন এমন বিদেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেশের বাইরে পাঠানোর নীতিমালা শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের ৪৫ দিনের মধ্যে অর্থ পাঠাতে হবে।

বৈদেশিক মুদ্রায় বা বহির্গামী রেমিটেন্স আকারে বেতন-ভাতার একটি অংশ পাঠাতে পারবেন বিদেশিরা। আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষে ৩০ দিনের মধ্যে পাঠানোর সুযোগ ছিল।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জানা গেছে, এসবের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নীতিমালা সংশোধন করে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন সহজ করতেই এ সংশোধনী আনা হয়েছে।

এর আগে গত বছরও বিধিমালাটি সংশোধন করা হয়। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ফের সংশোধন করা হল। সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের আরও কয়েকটি বিধি সংশোধন করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের যে কোনো ব্যাংক শাখায় বিদেশিদের অ্যাকাউন্ট খোলার বিধান করা হয়েছে। আগে তারা বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী শাখা ছাড়া অন্য কোনো শাখায় হিসাব খুলতে পারতেন না।

বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য টাকায় ঋণ নেয়ার বিধানও করা হয়েছে। আগে তারা টাকায় ঋণ নিতে পারতেন না।

বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রায় স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেয়ার বিধিও শিথিল করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশে-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের নিয়ম-কানুন যত বেশি শিথিল থাকবে ততবেশি বিদেশিদের কাছে আস্থা সৃষ্টি হবে।

কেননা উন্নত দেশগুলো থেকে অর্থ অন্য কোনো দেশে নিতে অনুমতি লাগে না। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে নিতে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন। দেশের রিজার্ভের ভিত্তি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এ কারণে অনুমোদন নেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তবে রিজার্ভের পরিমাণ গত ১১ বছর ধরে টানা বাড়তে থাকায় এখন বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নীতিমালা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নীতি শিথিল করাটা ভালো। এতে বিদেশিদের মনে আস্থা বাড়বে।

কিন্তু দেশ থেকে বিভিন্ন পথে যেভাবে মুদ্রা পাচার হচ্ছে সেটা ঠেকানো যাচ্ছে না। ব্যাংকিং চ্যানেলের মতো বৈধ পথের পাশাপাশি অবৈধ পথেও এখন অর্থ পাচার হচ্ছে। এই শিথিলতার সুযোগ নিয়ে যাতে অর্থ পাচার না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

সূত্র জানায়, দেশ থেকে যেসব অর্থ পাচার হচ্ছে তার একটি অংশ যাচ্ছে বেআইনিভাবে থাকা বিদেশিদের মাধ্যমে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে কর্মরত দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোতে যেসব বিদেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারী আছেন তারা যে বেতন-ভাতা বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পান তার একটি অংশ নিজ দেশে বা অন্য দেশে পাঠাতে পারেন। তারা প্রাপ্য বেতন-ভাতার পুরোটা পাঠাতে পারেন না।

এ থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাদ দিয়ে সঞ্চয়ের টাকা পাঠাতে পারেন। জীবনযাত্রার খরচ নির্ভর করে বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল কতজন সঙ্গে থাকেন, তাদের জীবনযাত্রার ধরন কেমন, তার ওপর।

এসব অর্থ পাঠাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে অর্থ পাঠাতে হতো। অনুমোদনের পর এসব অর্থ পাঠাতে নানা ধরনের বিধিবিধান পরিপালন করতে হতো। অফিসের কাজ করে অনেকেই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অর্থ পাঠাতে পারতেন না। এ বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর পর তারা এর মেয়াদ আরও ১৫ দিন বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এখন ৪৫ দিনের মধ্যে বেতন-ভাতা বাবদ প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বিদেশিদের উচ্চমাত্রায় বেতন-ভাতা দেয়া হয়। সার্কুলার অনুযায়ী কর্মরত বিদেশিরা স্থানীয় মুদ্রায় বা টাকায় বেতন-ভাতা পান। খরচের অতিরিক্ত অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে বিদেশে পাঠাতে পারেন।

বাংলাদেশে বিদেশিদের কাজ করতে হলে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয়। কাজের ধরনভেদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে থাকে।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ৮৬ হাজার বিদেশি কর্মরত আছেন। বেসরকারি হিসাবে এর পরিমাণ আরও বেশি। এর মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ৩৬ হাজার। বাকি ৫০ হাজার অন্যান্য দেশের। এর মধ্যে চীনের ১৪ হাজার। জাপানের ৫ হাজার।

এদের বেশিরভাগই বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, কান্ট্রি ম্যানেজার, কনসালট্যান্ট, শিক্ষক, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার, মার্চেন্ডাইজার, টেকনেশিয়ান, সুপারভাইজার, আমদানিকারকের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, নার্স, ম্যানেজার, প্রকৌশলী, প্রোডাকশন ম্যানেজার, ডিরেক্টর, কুক, ফ্যাশন ডিজাইনার পদে নিয়োজিত। এর মধ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন নিয়ে বৈধভাবে আছেন ২০ হাজার কর্মী। বাকি ৬৬ হাজার কর্মীর কোনো বৈধতা নেই। শুধু বৈধরাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে বিদেশে অর্থ পাঠাতে পারেন। অন্যরা পারেন না। অবৈধরা পাঠান হুন্ডির মাধ্যমে। ফলে সেগুলো পাচার হয়ে যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈধরা বছরে দেশ থেকে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি ডলার বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। অবৈধরা নিচ্ছেন আরও বেশি। যা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে।

এদিকে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা বছরে দেশে রেমিটেন্স পাঠান গড়ে দেড় হাজার কোটি ডলার। এর প্রায় অর্ধেকই নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশিরা। ফলে সার্বিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধির হার কমেছে, বেড়ে গেছে ব্যয়ের হার। এতে বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে দেশে কাজ করছেন এমন বিদেশিদের নিয়ে ডাটাবেজ তৈরির জন্য ২০১৬ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

এতে সদস্য হিসেবে রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিডা, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদফতর (এনএসআই), বেপজা, পাসপোর্ট অধিদফতর, এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ও এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধি। তারা এখনও কাজ করছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×