আইএমইডির খসড়া প্রতিবেদন

ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক প্রকল্প: গোড়ায় গলদ থাকায় গেছে অতিরিক্ত অর্থ ও সময়

সংশ্লিষ্টরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেননি * রাস্তা টেকসই ও যুগোপযোগী হয়নি

  হামিদ-উজ-জামান ১৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক
ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক। ফাইল ছবি

ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের গোড়ায় গলদ ছিল। অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরিতে ছিল দুর্বলতা। আর এ কারণেই বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে দেখা দেয় নানা বিপত্তি।

ফলে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা, যা মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৫৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

অন্যদিকে অতিরিক্ত সময় লেগেছে ৫ বছর, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৬ দশমিক ৯২ শতাংশ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) খসড়া প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই প্রকল্প গ্রহণ ও সঠিক ট্রাফিক ফোরকাস্ট না করায় প্রকল্পটি শেষ হওয়ার দুই বছর না যেতেই কোথাও কোথাও রাস্তা উঁচু-নিচু হয়েছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ফলে অনেক জায়গায় রাস্তার ঢাল ভেঙে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পুরুত্ব কম পাওয়া গেছে। রোড মার্কিংয়ের অবস্থাও ভালো নেই। রাস্তার মাঝে গাছ লাগানো হলেও পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঠিক দায়িত্ব পালন না করায় রাস্তা টেকসই ও যুগোপযোগী হয়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব জটিলতা ছিল সেগুলো হল- অর্থায়নে বিলম্ব, পণ্যকার্য ও সেবা সংগ্রহে দেরি এবং ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটির নিয়োগ করা প্রতিষ্ঠান আইআরজি ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড। দ্বিতীয় খসড়া প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে। শিগগিরই এটি চূড়ান্ত করা হবে।

আইএমইডির সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ মঙ্গলবার যুগান্তকে বলেন, সমাপ্ত হওয়ার পরও প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে। কেননা এটি একটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন প্রকল্প। প্রতিবেদনে প্রকল্পের যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি উঠে এসেছে, এগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তুলে ধরা হবে। এতে প্রথম কাজ হবে যেখানে যেখানে ত্রুটি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সংস্কার করতে পারবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতে একই ধরনের অন্য প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. বেলায়েত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ডিপিপি তৈরির সময় ত্রুটি ছিল, এটি অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে শুধু একটি কারণেই যে প্রকল্পটির টাইম ওভার রান ও কস্ট ওভার রান হয়েছে, সেটি বলা যায় না। কেননা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার ধারে ২৩টি মসজিদ, ৫টি মন্দির, ৮টি কবরস্থান ছিল। এগুলো সরিয়ে অন্য স্থানে তৈরি করতে হয়েছে। তাছাড়া অর্থায়নের সমস্যা ছিল। চায়না ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভালো ছিল না। এজন্য চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করতে হয়েছে। এরকম নানা জটিলতায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় অর্থনীতির লাইফলাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এটি দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ১৯২ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়ক ২ লেন থেকে ৪ লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য ১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ২০০৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। পরে ২ হাজার ১৬৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।

কিছুদিন পরই ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৩৮২ কোটি ১৭ লাখ টাকা করে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন করা হয়। এরপর কিছু ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৪১০ কোটি টাকা করে বিশেষ সংশোধন করা হয়। এতে কাজ না হওয়ায় ফের ব্যয় বাড়িয়ে ৩ হাজার ১৯০ কোটি ২৯ লাখ টাকা করে দ্বিতীয় সংশোধন করা হয়।

এরপর আবারও ব্যয় ও মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পটি তৃতীয় সংশোধন করা হয়। এ পর্যায়ে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮১৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং মেয়াদ ধরা হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সর্বশেষ ব্যয় না বাড়িয়ে সময় বাড়ানো হয় ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। এ পর্যায় পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছিল ৩ হাজার ৪৩৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।

আইএমইডির খসড়া প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি চলাকালে বাস্তবায়নকারী সংস্থার কর্মকর্তা ও নির্মাণকারীরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করায় নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। রাস্তা টেকসই ও যুগোপযোগী হয়নি।

সড়কের বড় দারোগারহাট এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, ২০১৭ সালের ১ নভেম্বর থেকে ভারবহন সীমা পুনঃনির্ধারণ করে ৬ চাকা দুই এক্সেল ট্রাকের জন্য ২২ টন, ১০ চাকা তিন এক্সেল ট্রাকের জন্য ৩০ টন ও ১৪ চাকা চার এক্সেল ট্রাকের জন্য সর্বোচ্চ ভারবহনসীমা ৪৪ টন নির্ধারণ করা হয়, যা সড়কের ডিজাইন প্রণয়নের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন পর্যায়ে ১২ জন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। কোনো কেনো প্রকল্প পরিচালক মাত্র কয়েক মাসের জন্য নিয়োজিত ছিলেন। ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ফলে বাস্তবায়নে ধীরগতি ও প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়।

প্রকল্পের দুর্বল দিক সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে, সড়কের পাশে কম গতির গাড়ি চলাচলের জন্য সার্ভিস লেনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রকল্প এলাকায় বাজারের দুই পাশে গুরুত্বপূর্ণ অংশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।

পর্যাপ্ত আন্ডারপাস বা ওভারপাস না থাকায় এক পাশের জনগণ অন্য পাশে যাতায়াতে বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। সড়কে কম গতির যানবাহন চলাচলের সুযোগ নেই, ফলে অল্প দূরত্বে যাতায়াতের সমস্যা হচ্ছে। ওভার লোড নিয়ন্ত্রণ না করায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সড়কটি চার লেন হওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহন সুবিধাসহ নানা সুযোগের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×