ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের বাজেট বিশ্লেষণ

খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংক উত্তরণে দিকনির্দেশনা নেই

  হামিদ বিশ্বাস ১৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণ

বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ ও শৃঙ্খলার অভাবে ব্যাংক খাত নিয়ে সরকারের যে দুশ্চিন্তা, নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তা থেকে মুক্তির কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা দিকনির্দেশনা নেই বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক।

তাদের মতে, ভাসা ভাসা কিছু বক্তব্য দেয়া হয়েছে কিন্তু কখন কিভাবে খেলাপি ঋণ থেকে উত্তরণ এবং ব্যাংক খাত সংস্কার করা হবে তা পরিষ্কার করা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ব্যাংকের এত খারাপ অবস্থাকে বাজেটে মোটেও গুরুত্ব দেয়নি সরকার।

ব্যাংকিং খাত সংস্কার করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তা কবে কখন কিভাবে করবে সে বিষয়টি পরিষ্কার নয়। ব্যাংক কমিশনের কথা উল্লেখ করলেও তার স্পষ্ট ধারণা বাজেটে প্রকাশ পায়নি। বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কিন্তু কিভাবে নেবে, কারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, তার কি কোনো সংজ্ঞা আছে? এসবই অস্পষ্ট। যারা বারবার খেলাপি, দীর্ঘদিন টাকা পরিশোধ করছেন না, সামর্থ্য থাকার পরও ব্যাংকের টাকা শোধ দেন না; একজন ঋণখেলাপির বিলাসী এবং আয়েশি জীবনযাপন, তার অন্য সব কাজ ঠিকমতো চলছে কিন্তু ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে তিনি অপারগ, ধরা দেন না। এসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসেবে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। হাইকোর্টে কয়েকটি আলাদা বেঞ্চ বসিয়ে দ্রুত বিচার কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তা না হলে খেলাপি ঋণ কমবে না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বাজেটে ব্যাংকিং খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছুই নেই। যা কিছু বলা হয়েছে সবই ভাসা ভাসা। এসব দিয়ে ব্যাংকিং খাত ঠিক করা যাবে না। খেলাপি ঋণ আদায় করতে হলে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এটি বহুবার বলা হয়েছে। স্থগিতাদেশ বন্ধ করতে হবে। দ্রুত বিচার কার্য সম্পাদন করতে হবে। তা না হলে বক্তব্য আর ঘোষণা দিয়ে খেলাপি ঋণ বন্ধ হবে না।

দেশের অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক ইতিবাচক ধারায় থাকলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতে সংস্কার, ব্যাংক খাতে সুশাসন, পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ কমানোর মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অর্থমন্ত্রী কী পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন সেটাই ছিল বাজেটের আগে অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের আগ্রহের মূল বিষয়।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ বিষয়ে তার লিখিত বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘যেসব ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন পরিশোধ না করার জন্য (ইচ্ছাকৃত খেলাপি) সেই সব ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ... ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা সুদৃঢ় করার জন্য একটি ব্যাংক কমিশন প্রতিষ্ঠার কথা আমরা দীর্ঘদিন ?শুনে আসছি। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’

ব্যাংক খাতের সংকটের একটি ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ব্যাংক খাতের গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় এ পর্যন্ত কোনো সংস্কার হয়নি। ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে সেই চক্র থেকে ঋণগ্রহীতার বেরিয়ে আসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ... আমরা এবার কার্যকর ইনসলভেন্সি আইন ও দেউলিয়া আইনের হাত ধরে ঋণগ্রহীতাদের এক্সিটের ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ পাশাপাশি আর্থিক খাতের সংস্কারে পর্যায়ক্রমে ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ বাড়ানো, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা এবং বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করার পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনার কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ কমানোর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। খেলাপি থেকে বের হওয়ার যে রাস্তা ঠিক করা হয়েছে তা-ই বেঠিক। রাস্তাটি ওয়ান ওয়ে হলে ভালো হতো। এখন হল টু ওয়ে। একদিক দিয়ে বের হয়ে অন্যদিক দিয়ে ঢুকবে। কারণ একজন ঋণখেলাপি ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে নিয়মিত গ্রাহক হয়ে আবার ঋণ নেবে। এতে বহুগুণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাংক।

একটি ব্যাংকের এমডি যুগান্তরকে বলেন, ‘একজন ঋণখেলাপি আমাকে ২ টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে আবার ১০০ টাকা ঋণ নিয়ে যাবে। কারণ তখন সে নিয়মিত গ্রাহক আমি তাকে ঋণ নিতে বাধা দিতে পারব না।’

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশ্লেষক বলেন, ব্যাংক কমিশন হয় তো সমস্যার সমাধান করতে পারবে, তবে বাজেটে এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়নি। দেশের ব্যাংক খাত একটা বড় সমস্যা; সে বিষয়টি বাজেটে এসেছে, তবে আরও স্পষ্টভাবে সেটা আসতে পারত। তারা আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের ওপর কিছু সাধারণ কথাবার্তা আছে, তবে বিস্তারিত কিছু নেই। দুর্দশায় থাকা ব্যাংক খাত নিয়ে যতটা মনোযোগ দেয়া উচিত ছিল, বাজেটে তা দেয়া হয়নি। ব্যাংক খাতের খারাপ অবস্থার কোনো স্বীকৃতি বাজেট বক্তৃতায় ছিল না। ব্যাংক নিয়ে যা আছে তা খুবই সামান্য।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×