সিআইডির হাতে বিপুল সম্পদের প্রমাণ

টাকার বস্তা নিয়ে ঘুরছে দুই চোরাকারবারি

সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসার আড়ালে কাপড় পাচারের হোতা দুই ভাই অপু-দীপু, চার্জশিট থেকে নাম কাটাতে ঘুষের প্রস্তাব নিয়ে চলছে দৌড়ঝাঁপ * ১৬৪ ধারার জবানবন্দি : ‘দীপু চাকলাদার কোনো পণ্যের সঠিকভাবে শুল্ক দিত না। কোনোটার অর্ধেক, কোনোটা না দিয়েই অন্যভাবে বের করে ফেলত। তারা অল্পদিনেই অনেক অর্থের মালিক হয়েছে।’

  তোহুর আহমদ ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অপরাধ

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত দুই প্রভাবশালী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। শুল্ক ফাঁকি ও বন্ড পণ্যের চোরাকারবারের মাধ্যমে মাত্র ১০ বছরে অঢেল অর্থ-সম্পদ উপার্জন করতে সক্ষম হন তারা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সার্ভার হ্যাক করে পণ্য পাচার মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এই দুই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের পাহাড়সম সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে। সূত্র জানায়, দীপু ও অপু চাকলাদারের নামে শুল্ক ফাঁকি ও চোরাকারবারে জড়িত থাকার একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ১৬ জানুয়ারি মিজানুর রহমান দীপুকে গ্রেফতার করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। এরপর অধিকতর তদন্তের জন্য ২৩ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত মামলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সিআইডির তদন্তে যখন চোরাকারবারিদের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করে, তখনই অজ্ঞাত কারণে তড়িঘড়ি করে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। এমনকি মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে রীতিমতো টাকার বস্তা নিয়ে মাঠে নেমেছে চোরাকারবারিরা। চাঞ্চল্যকর এমন তথ্য জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির একজন কর্মকর্তা। তিনি জানান, প্রভাবশালী মহলের নানামুখী তদবিরে ব্যর্থ হয়ে চোরকারবারী দুই ভাই এখন টাকা নিয়ে ঘোরাফেরা করছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আগে যিনি তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন তার কাছে একাধিক মামলার তদন্ত রয়েছে। তদন্ত-জটের কারণে তিনি নিজেই চিঠি দিয়ে এ মামলার তদন্ত থেকে অব্যাহতি নেন। কিন্তু এখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কিছু মামলা কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলাটির তদন্তভার পুনরায় তাকেই দেয়া হবে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, কোনো তদবিরে কাজ হবে না। মামলা তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

সিআইডির তদন্তে তাদের দুই ভাইয়ের নামে অন্তত চারশ’ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে আছে- রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জে ৫টি বাণিজ্যিক ভবন। যেগুলো বর্তমানে মার্কেট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে আছে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগরে ২০ কাঠা জমির ওপর ৮ তলাবিশিষ্ট চাকলাদার টাওয়ার এবং তার সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি ৮ তলা ভবন। নগরমহল নদীধারা রোডে এ কে টাওয়ার, নগরমহল বেড়িবাঁধ সংলগ্ন আগানগরে ৭ তলা গ্রিন টাওয়ার।

সিআইডি বলছে, প্রতিটি ৭/৮ তলাবিশিষ্ট মার্কেট ভবনগুলোর জমিসহ মূল্য কমপক্ষে দেড়শ’ কোটি টাকা। এ ছাড়া ইসলামপুর গুলশান আরা সিটিতে রয়েছে চারটি দোকান ও একটি অফিস। যার প্রতিটির মূল্য অন্তত ১ কোটি টাকা করে। এ ছাড়া একই এলাকায় চায়না মার্কেটে আছে ৫টি দোকান ও একটি অফিস। এমভি মিজান নামে সমুদ্রগামী পণ্য পরিবহনকারী জাহাজের ব্যবসাও আছে তাদের। শিপিং লাইনে নিজস্ব ৪/৫টি সমুদ্রগামী জাহাজও আছে। ইত্তেফাক মোড়ে ১০ কাঠার বাণিজ্যিক প্লটের কাগজপত্র পেয়েছে সিআইডি। ৪/এ হেয়ার স্ট্রিটের ওয়ারী কমপ্লেক্স নামের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে ৩/সি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন দিপু। ওই ভবনে তার বড় ভাই অপুর নামে আরও একটিসহ মোট ৪টি বিশালাকার ফ্ল্যাট রয়েছে। অপু-দিপুর নামে কয়েকটি ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের সন্ধান পাওয়ার পর তাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।

সিআইডি বলছে, তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার ডহরী গ্রামে। সেখানেও বিশাল জায়গার অভিজাত অট্টালিকা নির্মাণাধীন। পুরোটাই মার্বেল পাথরে মোড়ানো বাড়িটির টাইলস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফিটিংস বিদেশ থেকে বিশেষভাবে আমদানি করা। অপু-দিপুর নামে ডহরী গ্রামের আশপাশে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমিও রয়েছে।

দ্রুত সময়ে কোটিপতি বনে যাওয়া এই দুই ভাইয়ের রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালেও রয়েছে তাদের কূটকৌশলের রাজনীতি। কেননা, বড় ভাই হাবিবুর রহমান অপু চাকলাদার বিএনপি নেতা। তিনি বর্তমানে লৌহজং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। অপরদিকে ছোট ভাই মিজানুর রহমান ওরফে দীপু চাকলাদার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতা। এলাকাবাসী বলছেন, অবৈধ সম্পদ জায়েজ করতে তারা দুই প্রধান দল হাতে রেখেছেন। আগে ব্যবহার করেছেন বিএনপিকে, এখন করছেন আওয়ামী লীগকে। তারা জানান, এই দুই ভাই বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক হলেও এক সময় তাদের বাবা ফজলুর রহমান পুরান ঢাকার ইসলামপুরে সামান্য মুদি দোকানি ছিলেন।

সিআইডি বলছে, অপুর মালিকানাধীন মেসার্স চাকলাদার সার্ভিস ও দিপুর মালিকানাধীন এমআর ট্রেডিংয়ের সঙ্গে কাস্টমস কমিশনারদের সখ্য ছিল। একাধিক কাস্টমস কমিশনার অপু-দিপু সিন্ডিকেটের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের কমিশন নিতেন। এদের মধ্যে নুরুজ্জামান নামের জনৈক কাস্টমস কমিশনার অন্যতম। মূলত কমিশনারদের সঙ্গে হট লিংকের কারণে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে অপু-দিপুর মালিকানাধীন দুই প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। এ ছাড়া সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের আড়ালে বন্ড কাপড়ের অবৈধ চোরাকারবার থেকে তারা বিপুল সম্পদ উপার্জন করতে সক্ষম হন। তারা যেসব আমদানিকারকের নামে পণ্য আমদানি করেন তার বেশিরভাগই ভুয়া।

তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর এ সংক্রান্ত মামলায় আরও চারজনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। এরা হলেন : চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মী সোহরাব হোসেন ওরফে রিপন, ডেসপাচ শাখার কর্মচারী সিরাজুল ইসলাম, এআইআর শাখার উচ্চমান সহকারী মাসুম ও মফিজুল ইসলাম লিটন নামের এক আমদানিকারক। গ্রেফতারকৃত চারজনের মধ্যে মফিজুল ইসলাম লিটন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এতে তিনি অপু-দিপুর চোরাকারবার ও শুল্ক ফাঁকি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন।

তিনি বলেন, ‘দিপুর বড় ভাই হাবিবুর রহমান অপু চাকলাদার ইসলামপুরে কাপড়ের ব্যবসা করেন। তিনি চায়না থেকে ইম্পোর্ট করতেন এবং দীপু চাকলাদার সে পণ্য ছাড়িয়ে দিতেন। অল্পদিনের মধ্যে দীপু চাকলাদার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভালো একটা লাইন পেয়ে যান এবং অনেক কম রেটে পণ্য ছাড়ায়ে দিতেন। তার এমন কাজ প্রচার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামপুরের কাপড় ইম্পোর্টারসহ ঢাকার অধিকাংশ ইম্পোর্টার দীপু চাকলাদারের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস করাতে থাকেন। দীপু চাকলাদার নিজেও চায়না ও ভারত থেকে কাপড় ইম্পোর্ট করতেন চাকলাদার ফেব্রিক্স নামে। তারা তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করতেন। দীপু চাকলাদার ঢাকায় কাজ করতেন। চট্টগ্রাম বন্দরের সব কাজ তার শ্যালক রাকিব নিয়ন্ত্রণ করতেন। যদি কখনও বড় সমস্যা হতো সঙ্গে সঙ্গে দীপু বিমানে চট্টগ্রাম চলে যেতেন। দীপু চাকলাদার কোনো পণ্যের সঠিকভাবে শুল্ক দিতেন না। কোনোটার অর্ধেক, কোনোটা না দিয়েই অন্যভাবে বের করে ফেলতেন। তারা অল্পদিনেই অনেক অর্থের মালিক হয়েছেন।’

জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম, মোংলা পানগাঁও আইসিডি থেকে প্রায় ১২ হাজার কনটেইনার পণ্য সার্ভার হ্যাকের মাধ্যমে খালাস করে নেয় চোরাকারবারিরা। এ চক্রের পঁচিশ সদস্যকে চিহ্নিত করে সিআইডি। এদের মধ্যে আছেন পাঁচ আমদানিকারক, আট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও বারো কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী। এদের মধ্যে প্রধান সন্দেহভাজন মিজানুর রহমান ওরফে দীপু চাকলাদার গ্রেফতার হলেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে আনতে পারেনি সিআইডি।

কারা ফটকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিন সময় পাওয়া গেলেও জিজ্ঞাসাবাদের আগেই তিনি জামিনে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। এমনকি মামলা তদন্তের সময় সিআইডির কাছে নানা প্রভাবশালী মহল থেকে তদবির আসতে শুরু করে।

প্রভাবশালীদের কেউ কেউ মামলাটি তদন্ত না করেই মূল আসামি মিজানুর রহমান দিপুকে খালাস দেয়ার পক্ষে জোরালো সুপারিশ করেন। কিন্তু সব তদবির উপেক্ষা করে তদন্ত এগিয়ে যেতে থাকলে একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর থেকেই মূলত মামলাটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘আলোচিত এ ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দার দায়েরকৃত মামলাটি এখন সিআইডি তদন্ত করছে। আমরা চাই সঠিকভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত শেষ হোক। যাতে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায় সে জন্য আমরা তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপরও নজর রাখছি।’

মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত পর্যায়ে কোনো মামলার বিষয়ে কথা বলা সমীচীন নয়। তবে আমরা মনে করি, এ মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ এই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের কারণে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হওয়া দরকার।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্টরা জানান, জামিনে বেরিয়ে মিজানুর রহমান ওরফে দীপু চাকলাদার এখন পলাতক। তার বড় ভাই বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান ওরফে অপু চাকলাদারের মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×