শুনানিতে হাইকোর্টের প্রশ্ন

প্রাণের পণ্যে বিস্তর ভেজাল মানুষ যাবে কোথায়

অব্যাহতি পেলেন নিরাপদ খাদ্যের চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক * ২ মাসের মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে হটলাইন চালুর নির্দেশ * পণ্যের মান পরীক্ষায় লেনদেনের তথ্য পেলে সরাসরি জেলে

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাণের গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাইসহ ৫২টি মানহীন পণ্য বাজার থেকে সরাতে ভূমিকা না রাখায় নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেলেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক। শর্ত ও সময় সাপেক্ষে অবমাননার অভিযোগ থেকে মাহফুজুল হককে অব্যাহতি দেন আদালত। এ সময় শুনানিতে প্রাণের নাম উল্লেখ করে আদালত বলেন, মানুষ চোখ বন্ধ করে প্রাণের পণ্য কেনে। তাদের পণ্যেও বিস্তর ভেজাল। মানুষ তাহলে যাবে কোথায়? হাইকোর্ট ঢাকাসহ সারা দেশে নমুনা সংগ্রহ করে খাদ্যপণ্যের মান পরীক্ষা এবং পুনঃপরীক্ষার জন্য বিএসটিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া ভোক্তাদের জরুরি সেবা দিতে ২ মাসের মধ্যে একটি হটলাইন চালু করতে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরকে নির্দেশ দেন। নতুন এ হটলাইন চালুর আগে ভোক্তা অধিকার সংক্ষরণ অধিদফতরের- ০১৭৭৭৭৫৩৬৬৮, প্রধানমন্ত্রীর দফতরের- ৩৩৩ এবং জাতীয় হটলাইন- ৯৯৯ এ নম্বরগুলো ভোক্তাদের জন্য ছুটির দিনসহ ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে বলেছেন আদালত।

রোববার একটি রিট মামলার শুনানিতে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ অসন্তোষ প্রকাশ করে শুনানিতে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মান পরীক্ষার সময় ডিমান্ড নিয়ে আলোচনা হয়। টেস্ট-রিটেস্টের আগে লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে আদালত হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এ লেনদেনে যতবড় কর্মকর্তাই জড়িত থাকুক না কেন দুদকে না পাঠিয়ে সরাসরি জেলে পাঠিয়ে দেব। আদালত বলেন, আমরা চাই ভেজাল ও মানহীন পণ্য যাতে বাজারজাত না করতে পারে সেজন্য সরকারি সংস্থাগুলো আইনানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। যদি তারা পদক্ষেপ নিত তাহলে আদালতের আদেশ দেয়ার দরকার ছিল না। আমরা বলে আসছি এসব কাজ সরকারের মাধ্যমে হোক। সরকারই ক্রেডিট নিক। আমাদের দরকার কাজটি হওয়ার। প্রধানমন্ত্রীও সম্প্রতি সংসদে ভেজাল খাদ্য নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।

বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় প্রাণের গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাইসহ ৫২টি মানহীন পণ্য অবিলম্বে বাজার থেকে সরাতে ও জব্দে হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশ বাস্তবায়নে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম ‘আইওয়াশ’ বলে অভিহিত করেন হাইকোর্ট। পরে ২৩ মে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের প্রতি আদালত অবমাননার রুল জারি করে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে রোববার সশরীরে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। সে মোতাবেক সকালে আদালতে হাজির হন চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক। তার পক্ষে ব্যারিস্টার কামাল উল আলম এবং এএম আমিন উদ্দিন শুনানিতে অংশ নেন। কামাল-উল আলম বলেন, আমাদের জনবল সীমিত। এরপরও বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে কিছু পণ্য বাজার থেকে জব্দ করেছি। আদেশ বাস্তবায়ন করেছি। আদালত বলেন, যখন বাস্তবায়ন করার দরকার তখন করেননি। আর যিনি হাজির হয়েছেন তাকে শাস্তি দেয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আদালত বলেন, টেস্ট রিপোর্ট দেখে মনে হচ্ছে বাজারে কোনো পণ্যই পিওর নেই। অথচ সরকারি সংস্থাগুলো আইন প্রয়োগ করছে না। পরে আদালত নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন মঞ্জুর করে শর্ত ও সময় সাপেক্ষে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।

শর্তে বলা হয়, শুধু ৫২ পণ্য নয়, সব ভেজাল পণ্যের ক্ষেত্রে সারা দেশে বছরজুড়ে কার্যক্রম চলমান থাকবে। ভবিষ্যতে আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করা যাবে না। এসব ভেজাল পণ্যের ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তার হালনাগাদ তথ্য সময়ে সময়ে আদালতে জানাতে হবে।

আদালত বলেন, যেখানে ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযান চালানোর ক্ষমতা আছে। এমনকি টিকিটের মূল্য বা আইনজীবী যদি মক্কেলের কাছ থেকে বেশি ফিস নেয় সেটা দেখারও সুযোগ রয়েছে এ সংস্থার। এ সংস্থার উচিত এখন থেকে উপজেলা পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করার। বিএসটিআইয়ের উদ্দেশে আদালত বলেন, কোম্পানিগুলার দেয়া নমুনার ভিত্তিতে ল্যাবে পুনরায় পরীক্ষা করে ৫২ পণ্যের মধ্যে ২৬টি মানোত্তীর্ণ করেছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো মান ঠিক না রেখে পণ্য বাজারে ছাড়তে পারে। সেজন্য বাজার থেকে দফায় দফায় নমুনা সংগ্রহ করে পণ্য ল্যাবে পরীক্ষা করতে হবে।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান। বিএসটিআইয়ের পক্ষে আইনজীবী সরকার এমআর হাসান। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষে আইনজীবী কামরুজ্জামান ও সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মাসুম আরেফিন এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান শুনানিতে অংশ নেন। এদিকে খোলা বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৪০৬ পণ্যের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় বাকি ৯৩টি পণ্যের মান পরীক্ষায় ২২টি ব্র্যান্ডের পণ্যকে ‘নিুমানের বলে রিপোর্ট দাখিল করেন বিএসটিআইয়ের আইনজীবী সরকার এমআর হাসান।

২২টি ব্র্যান্ডের ‘নিু মানের পণ্য হল, হাসেম ফুডসের কুলসন ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই এবং এসএ সল্টের মুসকান ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ, প্রাণ ডেইরির প্রাণ প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের ঘি, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের রাঁধুনী ব্র্যান্ডের ধনিয়া গুঁড়া ও জিরার গুঁড়া, চট্টগ্রামের যমুনা কেমিক্যাল ওয়ার্কসের এ-৭ ব্র্যান্ডের ঘি, চট্টগ্রামের কুইন কাউ ফুড প্রডাক্টসের গ্রিন মাউন্টেন ব্র্যান্ডের বাটার অয়েল, চট্টগ্রামের কনফিডেন্স সল্টের কনফিডেন্স ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ, ঝালকাঠির জেকে ফুড প্রডাক্টের মদিনা ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই, চাঁদপুরের বিসমিল্লাহ সল্ট ফ্যাক্টরির উট ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ এবং চাঁদপুরের জনতা সল্ট মিলসের নজরুল ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ। এসব পণ্যের লাইসেন্স স্থগিত করেছে বিএসটিআই।

তবে থ্রি স্টার ফ্লাওয়ার মিলের থ্রি স্টার ব্র্যান্ডের হলুদের গুঁড়া এবং এগ্রো অর্গানিকের খুশবু ব্র্যান্ডের ঘি নিুমানের হওয়ায় কোম্পানি দুটির লাইসেন্স বাতিল করেছে বিএসটিআই। আরও ৮টি প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইয়ের কোনো লাইসেন্স ছাড়াই পণ্য বাজারজাত করছিল। তাদের নাম প্রকাশ না করে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়োমিত মামলা করা হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়। শুনানি শেষে আদালত তিন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি জানিয়ে ১৯ আগস্ট প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। সেদিন পরবর্তী আদেশের জন্য দিন রেখেছেন আদালত। রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, চেয়ারম্যানকে বেশ কিছু শর্ত দিয়ে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। উনি ভবিষ্যতে আদালতের কোনো স্পেসিফিক অর্ডার ভায়োলেশন করবেন না, এখন থেকে নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করবেন। ওনার লোকবল সংকট থাকলে অন্যান্য এজেন্সির সহায়তা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করবেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×