সংসদে বাজেট আলোচনা

আ’লীগ ও বিএনপির এমপিদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সংসদ রিপোর্টার

বাজেটের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। বিএনপির এমপিদের দাবি, বর্তমান সংসদের কেউ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নন। নির্বাচনে ৩০০ আসন লুট করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, নির্বাচনকে বিতর্কিত করার অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৌশলী ও উদারনীতির কারণে তাদের সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে।

রোববার জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সময় উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, ডা. রুস্তম আলী ফরাজী, গণফোরামের মোকাব্বির খান এবং বিএনপির হারুনুর রশীদ, মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদ বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আজ সরকারের রাজনৈতিক হয়রানির শিকার। তাকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। উচ্চ ও নিু আদালত কোনোটাই স্বাধীন নয়। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে কত লাখ টন চাল, গম ও ডাল আমদানি করা হয়েছে তার হিসাব আমরা জানতে চাই। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এমন দাবি ঠিক নয়। তিনি বলেন, দেশে সুশাসন ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদ নেতাকে আহ্বান জানাচ্ছি। আশা করি, সংসদ নেতা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। জাতীয় নেতাদের সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে একটি আবহাওয়া তৈরি করবেন, সুবাতাস বয়ে আনবেন বলে আশা রাখি।

বক্তৃতার শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে জাতীয় ট্র্যাজেডি আখ্যায়িত করে হারুনুর রশীদ বলেন, সংসদ নেতা আপনি ১৫ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে বেদনার। আর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিএনপি দেয়নি; দিয়েছে আওয়ামী লীগেরই একটি অংশ। খন্দকার মোশতাকের সময় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সম্পর্কে হারুনুর রশীদ বলেন, জিয়াউর রহমান যে প্রক্রিয়াতেই ক্ষমতায় আসুক না কেন ক্ষমতায় আসার পর তিনি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এনেছিলেন। কিন্তু এখন সেই গণতন্ত্র অনুপস্থিত। বরাদ্দ অর্থের চেয়ে বেশি খরচ করায় নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, নির্বাচন কমিশন কি কোনো বৈধতা অর্জন করতে পেরেছে? এ নির্বাচন কমিশন অযোগ্য ব্যর্থ। কাজেই তারা যে টাকা খরচ করেছে সেটা সম্পূর্ণ অপচয় হয়েছে। এ জন্য তাদের পদত্যাগ করা উচিত। আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংরক্ষিত সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক এবং সংসদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করায় সংসদ কক্ষ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নির্ধারিত ১০ মিনিটের বক্তৃতায় তিনি তিন দফা বাধার সম্মুখীন হন। তিনি বলেন, এ সংসদের কেউ বলতে পারবেন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তার এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি দলের সদস্যরা হইহই করেন। একপর্যায়ে রুমিনকে থামিয়ে ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, আপনি বাজেটের বাইরে এমন কোনো কথা বলবেন না, যাতে সংসদ উত্তপ্ত হয়।

ব্যারিস্টার রুমিন আরও বলেন, এ সংসদে আসার আগে সংসদ নেতা বলেছিলেন আমাদের কথা বলতে দেবেন। কিন্তু আমার প্রথম বক্তৃতার দুই মিনিটের এক মিনিটও শান্তিমতো কথা বলতে পারিনি। একই ঘটনা আজও। তিনি বলেন, আমরা কথা বলতে পারছি না। আমি আমার দলের কথা বলব, তারা তাদের দলের কথা বলবে। কিন্তু আমি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো সংসদ যদি উত্তেজিত হয়ে যায় তাহলে আমি কীভাবে কথা বলব। ১০ মিনিটের বক্তৃতায় কয়েক সেকেন্ড শুধু সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত ৭৬ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে। সরকারের সক্ষমতা দিন দিন কমছে। নির্বাচন কমিশনে ব্যয় বাড়ানোয় সমালোচনা করে ব্যারিস্টার রুমিন বলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। কী নির্বাচন তারা করেছেন? আমার একটা কথায় পুরো সংসদ উত্তপ্ত। কলামের পর কলাম লেখা হয়। এ সংসদে যারা আছেন তারা আল্লাহকে হাজির নাজির করে বলুক, তারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন? তারা নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুক, সবাই উত্তর পেয়ে যাবেন। তাকে উদ্দেশ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, আপনি বাজেটের বাইরে ও সংসদীয় ভাষার বাইরে যে কথাগুলো বলেছেন তার সব কথা সংসদীয় প্রসিডিউর থেকে এক্সপাঞ্জ করা হল। এ কথা বলার পর বিএনপির সবাই অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। অবশ্য পরে তারা আবার অধিবেশনে ফেরেন।

বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে বিএনপি শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। সারা দেশে ভয়ংকর নাশকতা চালিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় বিএনপি নেতারা নানা হুমকি দিয়েছেন। বিএনপি নেত্রী দুর্নীতি করেছেন, আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। সেখানে সরকারের কী অপরাধ? বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণ থেকে আপনারা (বিএনপি) প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপির অনেকে এখনও জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলতে চান। কিন্তু কট্টোর বিএনপি-জামায়াত যাদের ঘাড়ে এখনও পাকিস্তানের ভূত চেপে বসে আছে তারাও যদি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েন তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন স্বাধীনতার ঘোষণাসহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডে রয়েছে একটিমাত্র নাম- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার দীর্ঘ আন্দোলন ও ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার আগে কেউই জিয়াউর রহমানের নামটি পর্যন্ত জানত না। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, বাংলাদেশের যেদিকেই তাকাই চারিদিকে শুধু উন্নয়ন ও অগ্রগতি। দেশের প্রতিটি সেক্টরে এ উন্নয়নের কথা সারা বিশ্ব স্বীকার করেছে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সৎ, কর্মঠ ও পরিশ্রমী পাঁচ প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শেখ হাসিনা অন্যতম। সরকারের পরিকল্পনা তৃণমূলে শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। তিনি বলেন, ১০ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দেয়া বাজেট গোটা দেশের চিত্রকেই পাল্টে দিয়েছে। মানুষের ঘরে ঘরে এখন বিদ্যুতের আলো। জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজ বিএনপি বিশ্বাস করে না বলেই তারা সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হয়নি। বিএনপির মুখে সমালোচনা মানায় না। কারণ তাদের সময় দেশে কোনো উন্নয়নই হয়নি।

বিএনপি নেতার বক্তব্যের জবাবে পীর ফজলুর রহমান বলেন, এ সংসদ অবৈধ হলে তারা (বিএনপি) আসেন কীভাবে? সংসদে থাকা আপনারা সবাই তো অবৈধ। সংসদ কখনও অবৈধ হতে পারে না, ব্যর্থতা থাকলে সেটা বিএনপির। সংসদ বৈধ বলেই তারা শপথ নিয়েছেন, কথা বলছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানই ইনডেমনিটি দিয়েছিলেন। কেননা বঙ্গবন্ধু হত্যার বেনিফিশিয়ারি একমাত্র বিএনপি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের ওপর গ্রেনেড হামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়াকে গ্রেনেড হামলা করে হত্যা, অগ্নিসন্ত্রাস, পুড়িয়ে মানুষ হত্যার কথা কি বিএনপি নেতারা ভুলে গেছেন? আগে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে পরে কথা বলুন।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, বিএনপির এক নেতা নিজেকে ইমানদার দাবি করেছেন। যদি তাই হয় তবে শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু করছেন, মেট্রোরেল করছেন, বড় মহাসড়কগুলো ৪ লেনে উন্নীত হচ্ছে- এসব কথা সংসদে বলুন, সত্যকে সত্য বলুন। বিনা ভোটে সংসদে এসে সংসদকে অবৈধ বলা ঠিক হয়নি। আমরা সবাই নির্বাচন করে জনগণের ভোট নিয়ে এসেছি।

গণফোরামের মোকাব্বির খান বলেন, সাধারণ মানুষ নয় কয়েকটি স্বার্থান্বেষী ও ব্যবসায়ী মহলের দিকে তাকিয়ে বাজেট করা হয়েছে। সরকারের নানা পর্যায়ে দুর্নীতি হচ্ছে। তাই সরকারের ব্যয় সঠিক ও নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে উচ্চমূল্যে চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার ওপর ক্ষতি হচ্ছে। স্মার্ট বাজেটের নামে গরিবকে আরও গরিব, ধনীকে আরও ধনী করার সুযোগ দেয়া হয়েছে।