১৫ হাজার কোটি টাকার সম্পূরক বাজেট পাস

ইসির অতিরিক্ত ব্যয় আড়াই হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সংসদ রিপোর্টার

সংসদ ভবন। ফাইল ছবি

জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় সদস্যদের তুমুল বিরোধিতা সত্ত্বেও চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাস হয়েছে। সোমবার জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল-২০১৯’ পাসের মাধ্যমে এই সম্পূরক বাজেট পাস হয়।

এ বাজেট পাসের মধ্য দিয়ে সংসদ ৩৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ১৬৬ কোটি ১৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয় করার অনুমতি দেয়া হল। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের অর্থ অনুমোদনের জন্য ৫৮টি মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করা হয়। এসব দাবির মধ্যে ৪টি দাবির ওপর আনীত ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়। এগুলো হচ্ছে- জননিরাপত্তা বিভাগ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বাকি মঞ্জুরি দাবিগুলো সরাসরি ভোটে প্রদান করা হয়। অবশ্য সব ছাঁটাই প্রস্তাবই কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

এরপর অর্থমন্ত্রীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল-২০১৯’ উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সংসদে বিল উত্থাপনের ঘটনা এটাই প্রথম। সম্পূরক বাজেটের আওতায় ৩৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সর্বাধিক দুই হাজার ৪৪৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়কে বরাদ্দের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর পরই রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক হাজার ৬০৪ কোটি ৬৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।

এ ছাড়া এক হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ পাওয়া অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে- স্থানীয় সরকার বিভাগ খাতে এক হাজার ৫৪২ কোটি ৮৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগ এক হাজার ২৭৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক হাজার ১৮২ কোটি ৯৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া সম্পূরক বাজেটে সবচেয়ে কম ৮৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন পেয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে পারেনি তাদের হ্রাসকৃত বরাদ্দের জন্য সংসদের অনুমতির কোনো প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে শুধু তাদের বরাদ্দই সংসদের অনুমতির প্রয়োজন হয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে এই সম্পূরক বাজেট পাস হয়। চলতি অর্থবছরের জন্য চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পাস করা হলেও বছর শেষে কাটছাঁটের পর এই বাজেট দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকায়। এদিকে সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের ওপর মোট ৫৮টি দাবির ওপর ২১৭টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনা হয়। ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, মো. ফখরুল ইমাম, লিয়াকত হোসেন খোকা, পীর ফজলুর রহমান, ডা. রুস্তম আলী ফরাজী ও রওশন আরা মান্নান এবং বিএনপির মো. হারুনুর রশীদ ও গণফোরামের মোকাব্বির খান। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমালোচনার পাশাপাশি সম্পূরক বাজেট বরাদ্দ না দেয়ার দাবি জানান।

জননিরাপত্তা খাত : জননিরাপত্তা বিভাগে ৬৭৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বলেন, মন্ত্রী ১৪টি চলমান প্রকল্প ও ১৪টি নতুন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ চেয়েছেন। জননিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ দিতে হবে। কিন্তু এখনও ধর্ষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন চলছে। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় আছে। আরও খরচ করে হলেও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, জঙ্গি-সন্ত্রাস ও মাদক দমনসহ নানা ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি-সন্ত্রাসের দেশ হিসেবে আমরা পরিচিত হচ্ছিলাম। সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের কারণে। তিনি আরও বলেন, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। হত্যা-ধর্ষণসহ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের তারা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ কাজটি আরও ভালোভাবে করতে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন।

আবাসন খাত : আবাসন সংকট নিরসনে যথাযথ পদক্ষেপ নেই উল্লেখ করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ১৮২ কোটি ৯৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দে আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় সদস্যরা। তারা বলেন, মন্ত্রণালয়টি দুর্নীতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। রূপপুরে বালিশ কিনে এ মন্ত্রণালয় তার রূপ প্রকাশ করেছে। এখানে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিলে তা দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হবে। তারা বলেন, ঢাকা শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়েছে। আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে।

জবাবে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এখানে পারমাণবিক কেন্দ্রে বালিশ কেনা নিয়ে কথা উঠেছে। কিন্তু যিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন তার কিছু পরিচয় পেয়েছি। তিনি বুয়েটে ছাত্রদল করতেন এবং নির্বাচিত ভিপিও ছিলেন। তাকে ইতিমধ্যে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ওই বালিশটি কি বালিশ? তুলা, ঝুট, সিনথেটিক না অন্যকিছুর বালিশ। সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তারপরও আমি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, পঁচাত্তরের পর থেকে দুর্নীতি শুরু হয়েছে। যা এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আমি এই দুর্নীতি নির্মূলে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

স্থানীয় সরকার খাত : স্থানীয় সরকার বিভাগের এক হাজার ৫৪২ কোটি ৮৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের বিরোধিতা করে ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপনকারী এমপিরা বলেন, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয় এটা। কিন্তু উন্নয়নে সমতা নেই। কাজের মান ভালো হয় না। প্রকল্প কর্মকর্তারা দুর্নীতি জড়িয়ে পড়েন। এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। তারা আরও বলেন, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে শত শত আওয়ামী লীগের নেতা মারা গেছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের আগে স্থানীয় সরকারগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে হবে।

জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, এটা একটি উন্নয়নমুখী প্রতিষ্ঠান। এ বিভাগের কাজ দেশব্যাপী অবকাঠামো উন্নয়ন। তাই এ মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দ বেশি হলেও অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। কোনো প্রকল্পে যে অনিয়ম নেই, তা নয়। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন। তাদের স্থানীয় উন্নয়নে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সবার প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তাই দেশের জনগণ ও জনগণের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

প্রবাসী খাত : প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সবচেয়ে কম ৮৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা বরাদ্দ চাইলে এর বিরোধিতা করেছেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। তারা বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে দেশের উন্নয়ন হয়। কিন্তু প্রবাসীরা যখন দেশে ফেরে তখন এয়ারপোর্টে নানা হয়রানির স্বীকার হতে হয়। প্রবাসীদের লাশ দেশে আনা নিয়েও নানা জটিলতায় পড়তে হয়। অনেককে বিদেশে কর্মস্থলে সংকটে পড়তে হয়। প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তারা প্রবাসীদের বিনিয়োগের জন্য উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার দাবি জানান।

জবাবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, ইতিমধ্যে সরকার প্রবাসীদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের বিনিয়োগের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা অনেক সময় সমস্যায় পড়লেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানতে পারেন না। এ বিষয়ে সচেতনতার উদ্যোগ নিয়েছি। এসব কাজের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ মোটেও অযৌক্তিক নয়। তাই আপত্তি প্রত্যাহার করে সম্পূরক বরাদ্দের প্রস্তাব পাসের আহ্বান জানান তিনি।