ঋণখেলাপির দায়ে মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যান জেলে

৩১ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেড় হাজার কোটি টাকা * ৮৫০ কোটি টাকা নেয়া হয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে

  দেলোয়ার হুসেন ২১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণখেলাপির দায়ে মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যান জেলে

অবশেষে ঋণখেলাপিদের জেলে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। খেলাপির দায়ে বুধবার রাতে চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যান হেফাজুতুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইউনিয়ন ক্যাপিটালের মামলায় নগরীর আগ্রাবাদ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হলে বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠান।

সিএমপির সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ঋণখেলাপি ও চেক প্রতারণার মামলায় হেফাজুতুর রহমানকে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট মহিউদ্দিন মুরাদের আদালতে হাজির করা হয়। তার পক্ষে জামিন আবেদন জানানো হলেও শুনানি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যান হেফাজুতুর রহমানসহ তার পরিবারের আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি পরোয়ানা রয়েছে। উল্লেখ, বাজেটোত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর্থিক খাতের সংস্কারের বিষয়ে বলেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। জনগণের আমানত নিয়ে ফেরত দেবে না, এটা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে আলোচিত একজন ঋণখেলাপিকে আইনের আওতায় এনে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হল। প্রভাবশালী ও আলোচিত এক ঋণখেলাপিকে জেলে পাঠানোর নজির দেশে এই প্রথম। জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সঠিক সময়ে এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে পরিস্থিতি আজ এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ে পদক্ষেপ নেয়া হলে ব্যাংকিং খাত নাজুক অবস্থায় পড়ত না। এরপরও যেহেতু বিচার বিভাগের মাধ্যমে তিনি জেলে গেছেন, এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

সূত্র জানায়, মোস্তফা গ্রুপের ৩১ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মোট ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে ফান্ডেড (নগদ) ১ হাজার ৪১৩ কোটি এবং নন-ফান্ডেড (এলসি ও ব্যাংক গ্যারান্টি) ১৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আবার মোট ঋণের খেলাপি ৪৩৫ কোটি টাকা এবং অবলোপন করা হয়েছে ২০০ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের মধ্যে ৪০৭ কোটি টাকাই কুঋণ। এগুলোর ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। অন্যদিকে ৬০৪ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে উচ্চ আদালতের স্থগিত আদেশ রয়েছে। এ টাকা পরিশোধের সময় সীমা শেষ হলেও স্থগিত থাকার কারণে সেগুলো খেলাপি দেখানো যাচ্ছে না। এ ছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেয়া হয়েছে ৮৫০ কোটি টাকা। এ ঋণের বেশিরভাগই খেলাপি। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর কাছে পর্যাপ্ত জামানত নেই। ঋণের টাকা ব্যবসায় না লাগিয়ে অন্য কাজে লাগানো হয়েছে। যে কারণে বেশিরভাগ ঋণই আদায় হচ্ছে না।

জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ যুগান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ঋণখেলাপিরা দুষ্ট ঋণগ্রহীতা। ইচ্ছা করেই টাকা দিচ্ছে না। যদিও তাদের অনেক সম্পত্তি আছে। চট্টগ্রামে মাইলের পর মাইল জায়গা-জমির মালিক মোস্তফা গ্রুপ। কিন্তু ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এখন আইনি সহায়তা পেলে সম্পত্তি জব্দ করে টাকা আদায় করতে পারব। তবে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার ঋণখেলাপিদের নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত। কারণ চট্টগ্রামের ঋণখেলাপিদের বহু জায়গা-জমি আছে। কিন্তু ঢাকায় এমন অনেক ঋণখেলাপি আছে, যাদের কিছুই নেই, পুরোপরি অস্তিত্বহীন।’ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, কে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আর কে নয়, এটা আগে শনাক্ত করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে কোনোভাবে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।

জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড ১৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে ২০১৪ সালে মোস্তফা গ্রুপের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় আদালত থেকে মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যান হেফাজুতুর রহমানসহ কয়েকজনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এর ভিত্তিতে চট্টগ্রামের ডবল মুরিং থানা পুলিশ বুধবার রাতে আগ্রাবাদের মোস্তফা গ্রুপের প্রধান কার্যালয় থেকে তাকে গ্রেফতার করে। ২০ জুন সকালে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি আলোচিত ঋণখেলাপি গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে নূরজাহান গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, ইমাম গ্রুপ, ইলিয়াস ব্রাদার্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের ঋণ বিশেষ বিবেচনায় নবায়ন করা হলেও পরে আবার তারা খেলাপি হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×