মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি

তৃণমূল আ’লীগ নেতৃত্বে প্রবীণেই আস্থা

২৩ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিও বহাল * তৃণমূল সম্মেলন সম্পন্ন করেই জাতীয় সম্মেলন

  রেজাউল করিম প্লাবন ২৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

এমপি-মন্ত্রী পদে নবীনদের ওপর আস্থা রাখলেও তৃণমূলে দলীয় কমিটিতে প্রবীণদেরই অগ্রাধিকার দিতে চায় আওয়ামী লীগ। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৭১-র স্বাধীনতা সংগ্রাম ও এর পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর দেয়া কমিটির নেতাদের নাম খোদ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও বাদ দিতে চান না।

জেলা-উপজেলায় দীর্ঘদিন থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির দায়িত্বশীল পদগুলোতে এবারও প্রবীণরাই থাকছেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।

এসব নেতারা আরও জানান, দল ক্ষমতায় থাকায় অনেক জেলা-উপজেলায় কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। এমপি-মন্ত্রীরাও এই কোন্দলে জড়িত। নেতৃত্ব নিয়ে মারামারি, খুনোখুনির মতো ঘটনাও ঘটছে।

নেতৃত্বের দাবিদার অধিকাংশ নবীন নেতার মূল টার্গেট দল কিংবা দলের আদর্শ নয়, প্রভাব-প্রতিপত্তি। দলের মধ্যে এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অনেক ক্ষেত্রে ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ে। বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

নবীন নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্ট এসব দ্বন্দ্বের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যেই ত্যাগী ও দলের প্রতি নিবেদিত প্রবীণ নেতাদের ওপর আস্থা রাখছে আওয়ামী লীগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, তৃণমূলে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি হয়। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণরা নেতৃত্বে থাকেন। এবারও সম্মেলনের মাধ্যমে নবীন-প্রবীণ সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠিত হবে। যোগ্যতার আলোকেই প্রবীণরা তাদের নেতৃত্ব ধরে রাখবেন। নবীনরাও নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধিকাংশ তৃণমূল কমিটি। অনেক জেলা-উপজেলায় সম্মেলন নেই দীর্ঘদিন থেকে। ফলে এসব এলাকায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। এসব কমিটির অধিকাংশের নেতৃত্বে প্রবীণরা।

দলীয় নিষ্ক্রিয়তার কারণে পদবঞ্চিত নেতাদের মধ্যে প্রবীণদের ওপর ক্ষোভ আর হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। কোণঠাসা অনেক নেতা কেন্দ্রে সম্মেলনের জন্য দাবি জানিয়েছেন। ক্ষুব্ধ মনোভাব ব্যক্ত করেছেন খোদ কমিটিরও অনেকে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংকটাপন্ন জেলা-উপজেলাগুলোতে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি করার ঘোষণা দিয়েছে। ইতিমধ্যে তৃণমূলকে ঢেলে সাজাতে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮টি বিভাগীয় টিম গঠন করেছেন।

তৃণমূল কমিটি গঠনের নিমিত্তে অনেক জেলায় বর্ধিত সভা সম্পন্ন করে এসেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

জাতীয় সম্মেলনের আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বাতিল ও সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

সম্প্রতি তিনি যুগান্তরকে বলেন, যেসব জেলা-উপজেলায় কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, সেসব স্থানে কমিটি গঠনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের ৮টি টিম সফর করছে। এসব টিমের কাজই হবে সম্মেলন করে নতুন কমিটি গঠন করা। নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা।

জানতে চাইলে রংপুর বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সফরের কাজ শুরু হয়ে গেছে। যেসব জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সেসব কমিটি গঠনের নিমিত্তে সম্মেলন করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। আর এটা সাংগঠনিক সফরের মধ্যেই হবে। কোনো সময়ক্ষেপণ হবে না।

তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ২৩ বছর থেকে কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নুল আবেদীন। ১৯৯৬ সালের ২ আগস্ট সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল দেবিদ্বারে। সেই সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন একেএম মনিরুজ্জামান।

৭২ বছর বয়সী জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্ব নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বাস না থাকলেও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ এই কমিটিতে হাত দিতে চায় না। নতুনদের নানা অভিযোগের পরও দীর্ঘ ২৩ বছরে কোনো সম্মেলন করতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে জয়নুল আবেদীন মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই দায়িত্বে আছি। দলীয় সভাপতি (শেখ হাসিনা) আমাকে সম্মান করে এই পদে রেখেছেন। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৭১-র মুক্তিযুদ্ধ ও এর পরবর্তী আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে তার পরিবার বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সঙ্গেই থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলেও জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানান, দীর্ঘদিন থেকে সম্মেলন না হওয়ার পেছনে কিছু কারণ তো আছেই। অনেক প্রবীণ নেতা বাদ পড়ার আশঙ্কায় দলীয় সভাপতির কাছে এসে দীর্ঘ সংগ্রামময় ইতিহাসের কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন উল্লেখ করেন।

কমিটি থেকে বিদায় মানে ‘শেষ বয়সে অপমান’ নিয়ে বেঁচে থাকা বলে কান্নাকাটিও করে মায়াজালে আচ্ছন্ন করেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এসব কমিটি পুনর্গঠন করা হয়নি। তবে এবার সম্মেলন করে নবীন-প্রবীণ সমন্বয় করে কমিটি দেয়া হবে।

কমিটির মেয়াদ ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও সম্মেলন হচ্ছে না ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগে। ১৯৯৬ সালের ২ আগস্ট এখানে সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সেই সম্মেলনে মো. আমির হোসেন সভাপতি ও দুলাল উদ্দিন আকন্দকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি কমিটি করা হয়। কমিটির কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় হওয়ায় গত দুই বছর আগে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।

২০০৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয় ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর, ফুলবাড়িয়া, ভালুকা, ঈশ্বরগঞ্জ, ফুলপুর উপজেলায়। মেয়াদোত্তীর্ণের ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এসব উপজেলায় সম্মেলন হয়নি।

কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটির মেয়াদ ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও হচ্ছে না সম্মেলন। এখানে ২০১২ সালে সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৬ সাল থেকে আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই চলছে কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলা আওয়ামী লীগ। একই অবস্থা বরুড়া উপজেলারও।

মুরাদনগর উপজেলার সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল ২০১৩ সালে। একই বছর সম্মেলন হয়েছিল তিতাস ও হোমনা উপজেলায়। মেঘনা উপজেলায় সম্মেলন হয়েছিল ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর। সম্মেলনের তারিখ অনুযায়ী ইতিমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে দাউদকান্তি ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার।

লালমনিরহাট জেলা কমিটি গঠন হয় ২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর। কমিটির মেয়াদ তিন বছর পার হলেও সম্মেলনের কথা মুখে আনছেন না কেউ। সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় ৫ বছর আগে। ২০১১ সালে গঠিত এই দুই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৪ সালে।

৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সম্মেলনের নামগন্ধ নেই চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ কমিটির। অনেক আগের সম্মেলনের ৭১ সদস্যের সর্বশেষ কমিটি হয় ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে কমিটির সভাপতি বিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী মারা গেছেন। এখন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে দিয়ে চলছে কমিটির কার্যক্রম। একই অবস্থা চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ কমিটিতে।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছিল ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে। ২০১৩ সালের প্রথম দিকে ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান জানান, ২০১৪ সালে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছিল তিন বছরের জন্য। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও এখনও ওই কমিটিই বহাল আছে।

২০১৪ সালের ৬ ডিসেম্বর রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের ২ সদস্যের কমিটি হয় সম্মেলনের মাধ্যমে। কমিটির মেয়াদ শেষের দিকে পূর্ণাঙ্গ কমিটির হলেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে কমিটির কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে ২০১৭ সালে। একইভাবে দুই বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। যশোর জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। জেলার ৮ উপজেলা কমিটির কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ নয়।

একই অবস্থা দেশের বেশির ভাগ জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটির। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে জোড়াতালি দিয়েই চালানো হচ্ছে সাংগঠনিক কার্যক্রম। তবে প্রবীণদের যথাযথ মর্যাদা ঠিক রেখে তৃণমূল কমিটি গঠন করা হবে বলে জানান দলটির শীর্ষ নেতারা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×