গার্মেন্ট পণ্য চুরিতে শক্তিশালী সিন্ডিকেট

চুরিতে জড়িত প্রভাবশালীদের নাম পেয়েছে পুলিশ * সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সজিব

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আহমদুল হাসান আসিক

ঢাকা, সাভার ও আশুলিয়া থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার পথে গার্মেন্ট পণ্য চুরিতে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের খোঁজ পেয়েছে পুলিশ।

সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সরকারি মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজের ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাদিকুল ইসলাম সজিব। তিনি রূপগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহরিয়ার পান্না সোহেল ওরফে ভিপি সোহেলের ভাগ্নে পরিচয় দেন।

গার্মেন্ট পণ্য চুরির একটি মামলায় গত ১৬ মে রূপগঞ্জে ভিপি সোহেলের নুহা পল্লী থেকে সজিবকে গ্রেফতার করে চট্টগ্রাম বন্দর থানা পুলিশ। এরপর রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকার বায়ো ফার্টিলাইজার সার কারখানার ভেতর থেকে চুরি যাওয়া মালামালও উদ্ধার করা হয়।

সজিবকে জিজ্ঞাসাবাদে চোর সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত অনেক প্রভাবশালীর নামসহ বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য রিপন ও স্বপন এখনও পলাতক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গার্মেন্ট পণ্য চুরির মামলা ও সাধারণ চুরির মামলা একই ধারায় হয়। এ কারণে গার্মেন্ট পণ্য চোরচক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হলেও দ্রুত জামিন পেয়ে যায়। জামিনে বের হয়ে তারা আবারও একই কাজে লিপ্ত হয়।

পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলেও চোরচক্রের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ কারণে চোরচক্রসহ যারাই এর সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

জিজ্ঞাসাবাদে সজিব পুলিশকে জানিয়েছে, এ সিন্ডিকেটে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানের চালক ও হেলপার সরাসরি জড়িত। ঢাকা, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন গার্মেন্ট পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার পথে রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান থেকে মালামাল চুরি করে চক্রটি।

তারা প্রথমে রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকার বায়ো ফার্টিলাইজার সার কারখানার ভেতর পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান নিয়ে যায়। সেখানেই প্যাকেট খুলে মালামাল সরিয়ে ফেলে।

পুলিশ জানায়, গত ১০ মে চট্টগ্রাম বন্দরে নেয়ার পথে এই সিন্ডিকেট আশুলিয়ার একটি কারখানার প্রায় ৩০ লাখ টাকার গার্মেন্ট পণ্য চুরি করে। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দর থানায় ট্রাকের চালক সুমন ও হেলপার নিজাম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করে গার্মেন্ট পণ্য বিদেশে পাঠানোর কাজে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান শাহরিয়ার অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক কায়সানুর রহমান।

মামলার তদন্তে নেমে ভিপি সোহেলের ঘনিষ্ঠ সজিবের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে অভিযান চালিয়ে সজিবকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানের সময় চক্রের সদস্য রিপন ও স্বপন পালিয়ে যায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম বন্দর থানার এসআই রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সজিব জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, ‘মামা’ ভিপি সোহেলের শেল্টারে তিনি দীর্ঘদিন এ কাজ করছেন। তিনি আরও কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহরিয়ার পান্না সোহেল ওরফে ভিপি সোহেল যুগান্তরকে বলেন, সজিবকে গ্রেফতারের পর তার সঙ্গে আমি কথা বলেছি। সে বলেছে, এ ঘটনায় সে জড়িত নয়। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে রিপন ও স্বপন জড়িত।

চুরির কৌশল : ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ জানায়, গার্মেন্ট পণ্য পরিবহনের সঙ্গে অসাধু কিছু চালক ও হেলপারের সঙ্গে যোগসাজশ করে চোরচক্র। কারখানা থেকে পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানোর সময় চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের সহায়তায় পথেই চুরি করে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশেষ পদ্ধতিতে প্যাকেট খুলে কিছু পণ্য সরিয়ে নেয়। পরে আবার প্যাকেট সিলগালা করে আগের মতো করে রাখে। ফলে বিদেশে যাওয়ার পর ক্রেতারা পণ্য কম পাচ্ছেন।

এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে অনেক বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এতে ক্রেতারা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করছে। এতে করে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

সম্প্রতি মেসার্স লেনি অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য কাভার্ড ভ্যানসহ চুরি করে একটি চক্র। সেই অভিযোগসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগের পর তদন্ত শুরু করে ডিবি পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ।

এ বিষয়ে ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার সোলায়মান মিয়া যুগান্তরকে বলেন, গার্মেন্ট পণ্য চুরির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী অনেকের নাম আমরা পেয়েছি। তাদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।