নতুন সরকারের প্রথম অর্থবছর শুরু কাল

রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ বাড়ানোই মূল চ্যালেঞ্জ

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা * বাড়বে জ্বালানি তেলের মূল্য * ইতিবাচক হতে পারে রেমিটেন্স প্রবাহ

  মিজান চৌধুরী ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজস্ব

বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণ ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোসহ বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে শুরু হচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম অর্থবছর (২০১৯-২০)।

এক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ার পরিকল্পনায় আঘাত আসতে পারে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ওপর। এর বাইরে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আগামী বছরে ১৬ শতাংশ বেশি আদায় করতে হবে। পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতে রফতানিতে নেতিবাচক ধারা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

কারণ চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের ওপর। আর বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে নতুন অর্থবছরে। এর প্রভাবে উস্কে দিতে পারে মূল্যস্ফীতিকে। তবে রেমিটেন্সের প্রবাহ ইতিবাচক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ এবং সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সরকারের অর্থনৈতিক কো-অডিনেশন কাউন্সিল সভায় আগামী অর্থবছর নিয়ে উল্লিখিত পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, তা সব সময় উচ্চাভিলাষী থাকে। মূলত আদায় বাড়াতে মাঠপর্যায়ে চাপ রাখতে এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পরে সেটি সংশোধন করে কমিয়ে আনা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রাজস্ব আদায়ের যে প্রক্ষেপণ থাকে, তা এতটাই উচ্চাভিলাষী যে দুই দফা সংশোধন করতে হয়। তাই আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও বিনিয়োগ বাড়ানো হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

আগামী সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে নতুন অর্থবছর। এই সরকারের ক্ষমতা নেয়ার পর এটি প্রথম অর্থবছর। অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করেই কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। যেসব বিষয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে ও অর্থনীতির সূচক ইতিবাচক আছে, সেগুলো হল-

বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণ : আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা প্রতি বছরই রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বছর শেষে আদায় কম হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ বেশি। তবে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর, নতুন করে এক কোটি মানুষকে করজালের আওতায় আনাসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এনবিআর মনে করছে সরকারের এসব উদ্যোগের কারণে রাজস্ব আদায় কমবে না। এছাড়া নতুন বছর থেকে সব স্থলবন্দর ও নৌবন্দরে পণ্য পরীক্ষার জন্য স্ক্যানার স্থাপন করা হচ্ছে। এতে রোধ করা হবে রাজস্ব ফাঁকি।

কমতে পারে বেসরকারি বিনিয়োগ : ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণের সুযোগ কমে আসবে। যা এ খাতকে বাধাগ্রস্ত করবে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সরকার ২০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। ওই ৫ বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগ এসেছে ৭ বিলিয়ন ডলার।

রফতানিতে নেতিবাচকের শঙ্কা : বাংলাদেশের পণ্য রফতানির প্রধান দু’বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে সন্তোষজনক রয়েছে। তবে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি কমবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহিবল (আইএমএফ)। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের রফতানি খাতে। এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ সেল থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ের বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে চীন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানি কমছে। এরই প্রেক্ষাপটে পোশাকসহ শ্রমঘন পণ্যের মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ আসছে তা কাজে লাগাতে পারলে সুবিধাও বয়ে আনবে। যে কারণে রফতানি প্রবৃদ্ধি আগামী তিন বছরে একই অবস্থানে প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০১৯-২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১২ শতাংশ।

জ্বালানি মূল্য বাড়বে : আগামী ২০২০ সালে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে বিশ্বব্যাংক বলেছিল ২০১৯ সালে অপরিশোধিত জ্বালানির তেলের ব্যারলপ্রতি মূল্য দাঁড়াবে ৭৪ মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালের মার্চে এসে দাঁড়ায় ৬৪ ডলার এবং জুনে এসে মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৬ ডলার। আগামী বছরে এর দাম বাড়লে বাংলাদেশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মূল্যস্ফীতি হতে পারে : অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিগত দু’বছর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য স্থিতি ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে এসে কৃষিপণ্যের মূল্য বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, খাদ্যপণ্যে বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং শিল্প পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তবে উন্নত দেশের মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একদিকে পণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৯-২০২২ পর্যন্ত এই তিন বছরের মূল্যস্ফীতি গড়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাসে বলা হয়, দেশের ভেতর খাদ্য উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। এতে কম হবে মূল্যস্ফীতি।

বাড়তে পারে রেমিটেন্স প্রবাহ : তিনটি কারণে নতুন অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়বে- এমন ধারণা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক কো-অডিনেশন কাউন্সিল বৈঠকে আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয়, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক টানাপোড়েনে প্রভাব পড়বে রফতানি আয়ে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বাড়বে।

উভয় খাতের এ পরিবর্তনে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে বৈধভাবে রেমিটেন্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রণোদনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এতে বৈধপথেও রেমিটেন্স প্রভাব বাড়বে। সব দিক বিবেচনা করে আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৩ শতাংশ। যা চলতি অর্থবছরে ছিল ১২ শতাংশ।

এছাড়া প্রধান দুই বৈদেশিক মুদ্রার মধ্যে ইউরোর বিপরীতে টাকা কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন ডলারে বিপরীতে টাকার সামান্য অবচিতি হয়েছে। যা প্রবাসী আয়ের জন্য ইতিবাচক ভূমিক রাখবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×