এডিপি বাস্তবায়নে ১৯ বাধা

  হামিদ-উজ-জামান ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়ন গুরুত্ব দিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো দেশ পরিচালনা করছে বর্তমান সরকার। আগামী অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশব্যাপী সেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে।

এই এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা বেশি।

কিন্তু এসব উন্নয়ন কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে প্রায় ১৯ ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হবে বলে শঙ্কা খোদ সরকারের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি)। এসব বাধার অধিকাংশই বিগত বছরগুলোতেও ছিল। তবে এগুলো দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হলে উন্নয়ন কর্মসূচি নির্বিঘ্নভাবে বাস্তবায়ন হবে। এতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পুরনো বাধাগুলোই নতুন করে আসবে। আমরা সেগুলো মোকাবেলায় উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বিশেষ করে প্রধান বাধা অর্থ ছাড়ের বিষয়টি ইতোমধ্যেই আমরা খালাস করে দিয়েছি।

এখন অর্থ ছাড় দেরি হয়েছে এই দোহাই কেউ দিতে পারবে না। কেননা প্রথম ছয় মাস প্রকল্প পরিচালকরাই বরাদ্দ তুলতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হবে না। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকায় জুলাই মাসে কাগজ-কলমের যেসব কাজ রয়েছে সেগুলো করা হবে। সেই সঙ্গে পুরো অর্থবছরজুড়েই প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে গতি বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এডিপির বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে, তবে প্রস্তুতি দুর্বল। এখন যেটা করতে হবে, সেটি হচ্ছে চলমান গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বেশি নজর দিতে হবে। সেসব প্রকল্প কেন এগোচ্ছে না, তার কারণ খুঁজে সমাধান করতে হবে। এক কথায় মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

সম্প্রতি প্রকাশিত আইএমইডির সর্বশেষ এক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও বাস্তবায়ন-পরবর্তী পর্যায়ে ১৯ ধরনের বাধা বা চ্যালেঞ্জ মোকবেলা করতে হয়। কিন্তু অদ্যাবধি এসব সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রকল্প প্রণয়ন পর্যায়ে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- প্রকল্প গ্রহণে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা না করে এবং ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করা হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে কাজের পরিধি বেড়ে যায়। এতে ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

এ ছাড়া প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে মার্কেট অ্যানালাইসিস (বাজার জরিপ) না করা, বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিবেচনা না করেই প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্পের লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্কে পরিমাণগত ইউনিট বা সংখ্যা যথাযথভাবে প্রণয়ন না করা, বাস্তবায়নযোগ্য ওয়ার্ক প্ল্যান ও প্রকিউরমেন্ট প্ল্যান তৈরি না করা এবং প্রকল্পের দলিল তৈরির সময় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে মেয়াদ নির্ধারণ না করা।

প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে যেসব বাধা রয়েছে সেগুলো হল- ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদলি বা একজন প্রকল্প পরিচালক একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর ও কার্যকর করতে এবং দরপত্র মূল্যায়নের সময় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সম্মতি পেতে অহেতুক বিলম্ব এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি শিফটিং নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া। এছাড়া রাস্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেখা যায় রাস্তার দু’দিকে প্রয়োজনীয় সোল্ডার রাখা হয় না। রাস্তার দু’পাশে যেখানে পুকুর বা খাল বিল থাকে সেখানে প্যালাসাইডিং ওয়াল দেয়া হয় না। ফলে রাস্তার পেভমেন্ট স্বল্পতম সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। বারবার মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দরপত্রের রেট শিডিউল পরিবর্তন হয়ে যায় এবং প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। নির্মাণ কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ নিবিড় মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। কোনো কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থার অধীন প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় সরাসরি ক্রয় মেথড ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। ফলে ক্রয়ের ক্ষেত্রে অবাধ প্রতিযোগিতার অভাব এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্টিয়ারিং কমিটি ও পিইসি কমিটির সভা যথাসময়ে হয় না।

প্রকল্প বাস্তবায়ন পরবর্তীতে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো হল- প্র্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার তিন মাসের মধ্যে সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) আইএমইডিতে পাঠানোর নির্দেশ মানা হয় না। প্রকল্প সমাপ্তের পরে যথেষ্ট পরিমাণ দক্ষ জনবল নিয়োগ না দেয়ায় প্রায়ই বিদেশি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সেবা ক্রয় চুক্তি করতে হয়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমাপ্ত প্রকল্পের আওতায় সৃষ্ট অবকাঠামো এবং সংগৃহীত যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না।

বাস্তবায়নের পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় জনবলের সংস্থান না থাকায় অথবা নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় প্রকল্প টেকসই হয় না। এ ছাড়া প্রকল্পের যানবাহনসমূহ প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সরকারি বিধি মোতাবেক পরিবহন পুলে জমা দেয়া হয় না। নতুন নতুন প্রকল্পে পুনরায় যানবাহন ক্রয় করা হয়, ফলে সরকারি অর্থের অপচয় হয়। আইএমইডির সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ বলেন, এগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। অর্থবছরের শুরু থেকেই আমরা সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেব। মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে বৈঠক অব্যাহত থাকবে। খুব ধীরগতির প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ডেকে এনে বৈঠক করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত