বিলম্বিত হতে পারে ঘোষণা

যোগ্যতার পাশাপাশি বিশেষ বিবেচনায় নতুন এমপিও

সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদের কাছে দৌড়ঝাঁপ * ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারে, বিশেষ বিবেচনায় আড়াইশ’

  মুসতাক আহমদ ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এমপিও

শর্তপূরণ সাপেক্ষে প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কথা রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি ‘বিশেষ বিবেচনায়ও’ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির চিন্তাভাবনা চলছে।

তবে এ শ্রেণীতে কত প্রতিষ্ঠান এমপিও পাবে সেটি চূড়ান্ত হয়নি। কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তালিকা তৈরির কাজ করছেন। তালিকা চূড়ান্ত হলে তা অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হবে। সব মিলে ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান এবার এমপিওভুক্ত হতে পারে বলে এরই মধ্যে সংসদে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

যোগ্যতার বাইরে এমপিও দেয়ার খবরে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কাছে ভিড় করছেন অনেক শিক্ষক-কর্মচারী। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক ও অন্য প্রভাবশালী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের কাছেও ধর্ণা ধরছেন কেউ কেউ। এ চাপের কারণে শেষপর্যন্ত শর্ত পূরণ করা প্রতিষ্ঠানের অনেকটি বাদ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের শঙ্কা, তেমনটি হলে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী বঞ্চিত বা প্রতারিত হবেন।

জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি যুগান্তরকে বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কাজ চলছে। জুলাই মাসের মধ্যে কাজটি শেষ হবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, বিশেষ বিবেচনায় কিছু প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দেয়া হবে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আছেন কিংবা ২০ কিলোমিটারে একমাত্র যে নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সেটি শর্তপূরণ না করলেও এমপিও পেতে পারে।

কেননা সেই এলাকার পাসের হার আর শহর এমনকি গ্রামের পাসের হারও সমান হবে না। এমন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা না হলে শিক্ষক-কর্মচারীরা নিরুৎসাহিত হয়ে যাবেন। মন্ত্রী বলেন, আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে চিঠি পাচ্ছি। সংসদ সদস্যরাও ডিও দিচ্ছেন। তবে নিয়মের মধ্যে থেকে যতটুকু সম্ভব সুবিচার করা হবে।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সব কাজ প্রায় গুছানো হয়ে গেছে। কাজ পুরোপুরি শেষ হলে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হবে। প্রায় একই কথা বলেছেন কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ।

তিনি বলেন, এমপিওর তালিকা এখনও ফাইনাল (চূড়ান্ত) পর্যায়ে আসেনি। আমরা এখন প্রতিষ্ঠানের নাম যাচাই-বাছাই করছি। আশা করছি জুলাই মাসের মধ্যেই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করা হবে। তবে যেদিনই ঘোষণা করা হোক না কেন, ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকরের সিদ্ধান্ত আছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে হাওর-বাঁওড়, পাহাড়ি এলাকা, চরাঞ্চল এবং দুর্গম এলাকা ও নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ বিবেচনা পাবে। এছাড়া যোগ্যতা অনুসারে যেসব উপজেলার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তালিকায় ঠাঁই পায়নি, সেসব উপজেলা থেকে বিশেষ বিবেচনায় এমপিওভুক্ত করা হবে। তবে এক্ষেত্রে ওই সব উপজেলায় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে। এ তথ্য জানার পরই মূলত এমপিওপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। তাদের অনুরোধে অনেক সংসদ সদস্য এমপিও চেয়ে আধা-সরকারিপত্র (ডিও) পাঠাচ্ছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। তাতে উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিও দেয়ার পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরছেন তারা। এর মধ্যে আছে এমপিওভুক্তির নির্ধারিত শর্তপূরণ করতে না পারার বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার কথা।

নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির লক্ষ্যে গত বছরের আগস্টে আবেদন নেয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী এমপিওভুক্তির চার শর্ত হচ্ছে- প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় পাসের হার। প্রতিটি মানদণ্ডের জন্য ২৫ নম্বর রাখা হয়। প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ করতে গিয়ে দেখা যায়, অনেক উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠানও ফিটলিস্টে স্থান পায়নি। আবার একই উপজেলা থেকে ৮-১০টি প্রতিষ্ঠানও জায়গা পেয়েছে।

২০১০ সালে এমপিওভুক্তির কাজ করতে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিপাকে পড়তে হয়েছিল। ব্যাপক বিতর্কের মুখে তালিকা পর্যালোচনা করতে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন উপদেষ্টা অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তার তৈরি তালিকা নিয়েও পরে বিতর্ক তৈরি হয়। উভয় ক্ষেত্রেই স্থানীয় সংসদ সদস্যরা ভূমিকা রাখেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সেই অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সংসদ সদস্যদের খুশি রাখতে এবার আগেভাগেই প্রত্যেক সংসদ সদস্যের কাছে বিশেষ বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা চাওয়া হয়।

সংসদ সদস্যদের সেই তালিকা নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কর্মকর্তারা। নামপ্রকাশ না করে একাধিক কর্মকর্তা জানান, ফিটলিস্টে ৫-৭টি করে প্রতিষ্ঠান থাকার পরও বিশেষ বিবেচনায় আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য ডিও লেটার দিয়েছেন বেশ কয়েকজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নরসিংদীর এক সংসদ সদস্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় এমপিওভুক্ত করতে ডিও লেটার দিয়েছেন। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ বিবেচনায় নেয়ার পক্ষে তিনি যুক্তি দিয়েছেন- প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষায় বিশেষ করে নারী শিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক সংসদ সদস্য এক প্রতিষ্ঠানের নামে ডিও দিয়ে উল্লেখ করেন, প্রতিষ্ঠানটি হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চল নিয়ে গড়া বন্যাপ্রবণ ও পশ্চাৎপদ এলাকায়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে।

এমপিওর তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম সংবলিত সার-সংক্ষেপ আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ। এর মধ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ দুই ভাগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তুলে ধরেছে। সে অনুযায়ী এমপিওর জন্য সবধরনের (৪টি) শর্ত পূরণ করা মাদ্রাসা ৪৯৪টি।

যদি স্বীকৃতির মেয়াদ বিবেচনা না করা হয় তাহলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৫১টি। অপরদিকে সব শর্ত বিবেচনায় নিলে এমপিওর জন্য বিবেচনায় আসা কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৩৬টি। স্বীকৃতির মেয়াদের শর্ত শিথিল করলে এই সংখ্যা ৪৪৫টি। সার-সংক্ষেপে ৮ ধরনের মাদ্রাসা এবং ৬ ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগও আলাদাভাবে এমপিওভুক্তির তালিকা তৈরি করছে।

এতে নিু মাধ্যমিক স্কুল ৬১৫টি, মাধ্যমিক স্কুল ৭৯৮টি, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ৯১টি ও ডিগ্রি কলেজ ৪৪টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ তালিকায় আরও আছে দাখিল মাদ্রাসা ৩৬২টি, আলিম মাদ্রাসা ১২২টি, ফাজিল মাদ্রাসা ৩৮টি এবং কামিল ২৯টি। সবমিলে ২ হাজার ৭৬২টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির যোগ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত আছে। সর্বশেষ ২০১০ সালের জুনে ১ হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটি বাদ না গেলে আরও অন্তত আড়াইশ’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ বিবেচনায় তালিকাভুক্ত করা হবে। গত আগস্টে বিজ্ঞপ্তি দিলে ৯ হাজার ৬১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আবেদন করেছিল। এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে লাগবে ৪ হাজার ৩৯০ কোটি ১২ লাখ ৫ হাজার টাকা।

তবে যদি যোগ্য বিবেচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিও দেয়া হয় তাহলে লাগবে ১ হাজার ২০৭ কোটি ৬৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। যদি স্বীকৃতির মেয়াদ বিবেচনা না করে এমপিও দেয়া হয় তাহলে লাগবে ১ হাজার ২১০ কোটি ৩৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। শর্ত শিথিল করে আরও দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান এমপিও দেয়ার চিন্তা থাকায় মন্ত্রণালয় থেকে মোট ১ হাজার ২শ’ ৪৭ কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তার কথা অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৩০ ৩৩ ২১
বিশ্ব ১৬,০৪,৫৩৫ ৩,৫৬,৬৬০ ৯৫,৭৩৪
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত