চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস ও ডেলিভারিতে বিলম্ব

হুমকিতে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য * সংশ্লিষ্ট সব অফিস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম বন্দর। ফাইল ছবি

কলম্বো থেকে আসা কনটেইনারবাহী ফিডার জাহাজ ‘দেলোয়ার ট্রেডার্স’ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে ২৫ জুন। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ এই জাহাজের বার্থিং শিডিউল (জেটিতে ভেড়ার তারিখ) দিয়েছে আজ ২ জুলাই।

অর্থাৎ বন্দরে আসার পর জাহাজটির জেটিতে ভিড়তে সময় লাগছে ৭ দিন। অথচ স্বাভাবিক অবস্থায় বার্থিং শিডিউল পেতে ২ থেকে ৩ দিনের বেশি সময় লাগার কথা নয়।

কেবল এই একটি জাহাজই নয়, বন্দরে আসা পণ্যবাহী জাহাজকে এভাবে সর্বনিম্ন ৩ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১৩ দিন অবস্থান করতে হচ্ছে বার্থিং শিডিউল পেতে এবং পণ্য খালাস করে ফিরে যেতে। এ কারণে স্বাভাবিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সচল রাখতে চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে।

কিন্তু সেই নির্দেশনা শতভাগ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যে কারণে জাহাজের বার্থিং পাওয়া, পণ্যের শুল্কায়ন, খালাস ও ডেলিভারিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটছে, যার চরম খেসারত দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

এদিকে এ ধরনের বিলম্বের কারণে সময় মতো আমদানি পণ্য হাতে না পেয়ে মিল-কারখানায় শিল্পোৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রফতানি আদেশ কার্যকর করতে না পারায় পোশাক শিল্পও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

অনেক সময় জাহাজীকরণ (শিপমেন্ট) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারায় রফতানি পণ্য না নিয়েও ফিরে যায় জাহাজ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাব, ঈদের ছুটিতে টানা প্রায় ১১ দিন চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস ও ডেলিভারি বন্ধ থাকা, বন্দর চ্যানেলে একটি জাহাজ দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে জাহাজের গড় অবস্থান সময় সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বেড়েছে।

বিভিন্ন ইয়ার্ডে কনটেইনারের স্তূপ জমে গেছে। জাহাজ বার্থিং পেলেও স্থান সংকুলান ও ইকুইপমেন্টের অভাবে জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস যেমন দ্রুত করা যাচ্ছে না, তেমনি দ্রুত সময়ে ডেলিভারিও দেয়া যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম কাস্টমসও আমদানি পণ্য চালানের শুল্কায়নের ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত বিলম্ব করছে। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বন্দরের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ৩০ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৫৭টি জাহাজ অবস্থান করছিল। এর মধ্যে ১৪টি কনটেইনারবাহী ফিডার জাহাজ। এছাড়া ১৬টি জাহাজ অবস্থান করছিল বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে। এসব জাহাজ থেকে পণ্য খালাস চলছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৪৯ হাজার টিইইউএস (টোয়েন্টি ফিট ইকুইভেলেন্ট ইউনিটস)। ৩০ জুন চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ছিল ৪৪ হাজার ৩১৫ টিইইউএস। আমদানি কনটেইনারের ধারণক্ষমতা ৩৬ হাজার টিইইউএস। সেখানে ৩০ জুন পর্যন্ত আমদানি কনটেইনার ছিল ৩০ হাজার টিইইউএস। অর্থাৎ বন্দর ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।

বন্দর সূত্র জানায়, ইয়ার্ডে কনটেইনার রাখার পর সেগুলো ট্রেইলরে ওঠানো-নামানো বা ইকুইপমেন্ট (কনটেইনার লোড-আনলোড কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি) মুভমেন্টের জন্য ৩০ শতাংশ জায়গা খালি থাকতে হয়।

তা না হলে কনটেইনার খালাস ও ডেলিভারিতে বিঘ্ন ঘটে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের চাপ থাকায় ডেলিভারি ও খালাসেও বিঘ্ন ঘটছে। যার কারণে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা সময়মতো তার পণ্য ডেলিভারি নিতে পারছেন না।

সূত্র আরও জানায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানি পণ্যবাহী জাহাজের অবস্থান সময় ক্রমাগতভাবেই বেড়েছে। এই তিন বছরে আগের তুলনায় আমদানি ও সমুদ্রগামী জাহাজের আগমন বৃদ্ধির কারণে একেকটি জাহাজকে বার্থিং শিডিউল পেতে এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হতো।

বন্দরে ইকুইপমেন্ট সমস্যাও এর অন্যতম কারণ ছিল। এক বছরে বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংসহ বিভন্ন কাজের জন্য নতুন নতুন বেশকিছু ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। হ্যান্ডলিং বৃদ্ধির কারণে বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থান সময়ও কমে আসে।

কোনো কোনো জাহাজ বহির্নোঙরে পৌঁছার পরদিন জেটিতে বার্থিং পাওয়ার নজিরও সৃষ্টি হয়। এতে ব্যবসায়ীরাও মোটামুটি সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু এক মাস ধরে আবার জাহাজের অবস্থান সময় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) প্রথম সহসভাপতি এমএ সালাম যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার পর একেকটি জাহাজকে বার্থিং শিডিউল পাওয়া ও পণ্য খালাস করে ফিরে যেতে সর্বনিম্ন ৩ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১৩ দিন সময় লাগছে।

এ অবস্থানকালটা বিশেষ করে পোশাক শিল্প মালিকদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহাজ বার্থিং শিডিউল না পাওয়ায় সময়মতো তারা তৈরি পোশাকের কাঁচামাল যেমন ডেলিভারি নিতে পারছেন না, তেমনি শিডিউল অনুযায়ী পণ্য পৌঁছাতে পারছেন না বিদেশি বায়ারের কাছে।

বিশেষ করে চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে আসে পোশাক শিল্পের সিংগহভাগ কাঁচামাল। চুক্তি অনুযায়ী কাঁচামাল বা পণ্য চালান গ্রহণের পর ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে বায়ারের কাছে পণ্যটি পৌঁছাতে হয়।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, জাহাজের বার্থিং শিডিউল পেতে বিলম্বের কারণে ১০ থেকে ১৫ দিন ‘লিড টাইম’ হারাতে হচ্ছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যটি হাতে না পাওয়ায় তৈরি পোশাকটি নির্দিষ্ট সময়ে বায়ার বা ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ কারণে বায়াররা বাংলাদেশে নতুন করে রফতানি আদেশ দিতে সাত-পাঁচ ভাবে।

এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, পোশাক শিল্পের কাঁচামালের শুল্কায়নে কাস্টমসের অহেতুক বিলম্ব, চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমস এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সব শাখা ২৪ ঘণ্টা খোলা না থাকাও আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আরেকটি কারণ।

তিনি বলেন, ‘বন্দরের অভ্যন্তরে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের লোকজন বিভিন্ন শিফটে ২৪ ঘণ্টা কাজ করলেও ব্যাংক, শিপিং লাইনের অফিসগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে না। আবার অফডকগুলোয়ও ২৪ ঘণ্টা থাকেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত কাস্টমস কর্মকর্তারা।

সিএন্ডএফ এজেন্টরাও ২৪ ঘণ্টা কাজ করেন না। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের গুরুত্ব বুঝতে পেরে বন্দর-কাস্টমস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে নির্দেশনা দেন এক বছর আগে। পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে ২৪ ঘণ্টাই কাজ চলে। কেবল বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম।’

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) এনামুল করিম মে মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানের পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছেন, ‘এই মাসে জাহাজের গড় অবস্থানকাল ছিল ২ দশমিক ৬৮ দিন।

তবে ঈদের টানা ছুটিতে পণ্য ডেলিভারি না হওয়া, ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকাসহ বিভিন্ন কারণে বহির্নোঙরে জাহাজের অবস্থান সময় কিছুটা বেড়েছে। তবে বন্দর জেটিতে ধারণক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে কনটেইনার। পণ্য খালাস ও ডেলিভারি স্বাভাবিক রয়েছে।’

গার্মেন্ট পণ্যের শুল্কায়নে কাস্টমসের অহেতুক বিলম্ব এবং এ কারণে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নতুন কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, ‘শুল্কায়নে অহেতুক বিলম্ব করা হয়- এমন অভিযোগ সত্য নয়।

দেখতে হবে প্রতিদিন কী পরিমাণ পণ্যচালান খালাস হচ্ছে। এর মধ্যে কতটি চালানের শতভাগ কায়িক পরীক্ষা বা শুল্কায়নে বিলম্ব হচ্ছে এর পার্সেন্টস। যেসব চালান সন্দেহজনক, কেবল সেসব চালানের ক্ষেত্রেই শতভাগ কায়িক পরীক্ষা বা ল্যাব টেস্টের বিষয়টি আসছে।

বিজিএমইএ নেতাদের উচিত যে কোনো সমস্যা নিয়ে কাস্টমসের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো। তবেই সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করা যাবে। দিনে দিনে সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।’