হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ

বিশ্বে জঙ্গিবাদ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে

  যুগান্তর রিপোর্ট ০২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার তিন বছর পূর্তিতে সোমবার শ্রদ্ধা ভালোবাসায় স্মরণ করা হয় নিহতদের। সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত গুলশান-২ নম্বর সেকশনের ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর হলি আর্টিজান বেকারির এ ভবনটি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য খুলে দেয়া হয়। ভবনের সামনেই স্থাপন করা হয় স্মরণ বেদি। সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান দেশি-বিদেশি নাগরিক, দূতাবাস প্রতিনিধি, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সর্বস্তরের মানুষ। এদিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- জঙ্গিবাদ বৈশ্বিক সমস্যা, বিশ্বে জঙ্গিবাদ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে।

সকাল ৭টার পর শ্রদ্ধা জানাতে হলি আর্টিজানে আসেন জাপান দূতাবাসের প্রতিনিধিরা। সকাল ৯টার পর আসে ইতালি দূতাবাসের প্রতিনিধি দল। তবে তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। বিদেশি কূটনীতিকদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সকাল ১০টায় সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় হলি আর্টিজানের স্মরণ বেদি। এ সময় হলি আর্টিজান বেকারি ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর বলেন, জঙ্গিবাদ বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। হলি আর্টিজান হামলার পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে সক্ষম হয়েছি। সারা বিশ্বেই জঙ্গি হামলা হচ্ছে। শুধু ২০১৮ সালেই ইউরোপজুড়ে ১২৯টি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ থেকে বোঝা যায়, জঙ্গিরা বৈশ্বিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়নি। সকাল সোয়া ১০টায় নিহতদের শ্রদ্ধা জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি বলেন, হলি আর্টিজানে নৃশংস জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ ২২ জন নিহত হয়। এ হামলার সঙ্গে নব্য জেএমবির যারা জড়িত ছিল তারা সবাই নিহত হয়েছে। অনেকে অভিযানে নিহত হয়েছে। কেউ জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছে। এ হামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ হবে বলে আশা করছি। হলি আর্টিজান হামলার মতো এমন ঘটনা যেন না ঘটে, সে লক্ষ্যে পুলিশ ও সিটিটিসি ইউনিট কাজ করছে। সকাল ১০টার কিছুটা আগে হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল। সেলিমা রহমান বলেন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার কারণেই জঙ্গিরা এ ধরনের ভয়াবহ হামলার সুযোগ পায়। জঙ্গিবাদ কোনো দল বা ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটা দেশের সব মানুষের সমস্যা। তাই সবাইকে সমন্বিতভাবে এর মোকাবেলা করতে হবে। এ সময় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন ও বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয়, অল্প কিছু মানুষ অসুবিধা করছে : অনেক বিদেশি নাগরিক হলি আর্টিজানে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। তবে কিছু মানুষ অসুবিধা সৃষ্টি করছে। তেমনি একজন ইতালিয়ান নাগরিক ফাদার রিকার্ডো তোবানিল্লি। তিনি বাংলাদেশে ছিন্নমূল মানুষকে নিয়ে কাজ করেন। শ্রদ্ধা জানানোর পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয় হলেও অল্প কিছু মানুষ অসুবিধা সৃষ্টি করছে। এ জন্য বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে। তবে ভয়ের কারণ নেই। আমরা নিরাপদেই আছি।

তিনি বলেন, হলি আর্টিজানে নিহত ৯ ইতালিয়ান নাগরিকের মধ্যে ছয়জনই আমার পরিচিত। তিনি জানান, ঘটনার দু’দিন আগেও নিহত ক্রিস্টিয়ানার সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ভাবতেই পারেননি দু’দিন পরেই তার এমন মৃত্যু হবে।

বাংলাদেশে ৪৬ বছর ধরে বসবাস করছেন আরেক ইতালিয়ান নাগরিক ফাদার আতিলিও। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনার পর সবাই সচেতন হয়েছে। এ ঘটনায় সবাই শিক্ষা পেয়েছে, সচেতন হয়েছে। আমি ৪৬ বছর ধরে আছি। ভয় কিংবা বিপদ কোনোটাই বোধ করি না।

কাঁদছিলেন রেস্তোরাঁকর্মী শাওনের মা : বেলা ১১টার দিকে হলি আর্টিজান বেকারিতে আসেন এ হামলায় নিহত জাকির হোসেন শাওনের মা মাসুদা বেগম। দুই হাতে ছেলের ছবি নিয়ে তিনি বিলাপ করছিলেন। জাকির হলি আর্টিজান বেকারির পাচকের সহকারী ছিলেন। জাকিরের মা বলেন, আমার ছেলে হত্যার বিচার আমি পেলাম না। আমার ছেলেটাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্যাতন কইরা মারছে। ওরে জঙ্গি মনে করছিল। কিন্তু দু’বছর পর ঠিকই প্রমাণ হইছে ও জঙ্গি ছিল না। এখন আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না। মালিক (হলি আর্টিজান বেকারির মালিক) মাসে মাসে পাঁচ হাজার করে টাকা দেয়। ওতে কোনোরকমে চলি। আমাগো দেখনের কেউ নাই।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাসুদা বেগম বলেন, আমরা গরিব, সাধারণ মানুষ। বেঁচে থাকতে চাইছিলাম। আমার সব শেষ হয়ে গেল। ছেলের আয়ে চলত আমাদের সংসার। আমার ছেলে নিরপরাধ ছিল। এখানে (হলি আর্টিজান) আসছিল চাকরি করতে। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। নইলে আমগোরে মাইরালান। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাদের ঠেকাতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। রাতভর উৎকণ্ঠার পর ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে সংকটের অবসান হয়। হামলায় অংশ নেয়া নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি ওই অভিযানে নিহত হয়।

রবিউলের আত্মত্যাগ পুলিশ বিভাগকে গৌরবান্বিত করেছে : মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় নিহত ঢাকা মহানগরের গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিমকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেছেন তার পরিবার ও স্বজনরা। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রাম বাজার থেকে সোমবার বেলা ১১টায় শোক র‌্যালি বের হয়ে কাটিগ্রাম কবরস্থান মাঠে গিয়ে শেষ হয়। রবিউলের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

২০১১ সালে বাড়ির অদূরে বাসাই গ্রামে মায়ের দান করা ২৯ শতক জমিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল বিকনিং লাইট অর্গানাইজেশন অব ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড সোসাইটি (ব্লুমস) প্রতিষ্ঠা করেন রবিউল। দুপুরে স্কুল প্রাঙ্গণে স্মরণসভার আয়োজন করে ব্লুমস। এতে স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি জিআর শওকতের সভাপতিত্বে ও রবিউলের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামসের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দীন আহমেদ, সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হানিফ সরকার, স্থানীয় আটিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নূর আলম সরকার, কৃষ্ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান বিপ্লব হোসেন ও বিদ্যালয়ের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম।

স্মৃতিচারণ করেন রবিউলের সহপাঠী জিয়াউর রহমান, শামসুল আলম ও জিল্লুর রহমান।

সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। জঙ্গি প্রতিরোধেও পুলিশের ইতিহাস গৌরবময়। পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল করিম জঙ্গি প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার এ আত্মত্যাগ পুলিশ বিভাগকে গৌরবান্বিত করেছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×