গ্যাসের বাড়তি দাম কার্যকর

তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে দেশীয় শিল্প

  যুগান্তর রিপোর্ট ০২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্রাতিরিক্ত হারে গ্যাসের দাম বাড়ানোয় দেশের শিল্প খাত তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। এখন গ্যাস কিনতে বাড়তি খরচ হবে। এতে শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। বাড়তি দামে উৎপাদিত পণ্য রফতানি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এমনিতেই বিদেশে পণ্যের উৎপাদন খরচের তুলনায় দেশে খরচ বেশি। ফলে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে দেশি পণ্য অসম প্রতিযোগিতার মুখে আছে। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই অসম প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।

বাড়তি সময় না দিয়ে রোববার ঘোষণার পর সোমবার থেকে গ্যাসের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এর প্রভাবে ওইদিন থেকেই পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে এখন যেসব পণ্য রফতানি করবে সেগুলোর দাম বাড়ানো সম্ভব হবে না প্রতিযোগিতার কারণে। এতে উদ্যোক্তারা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বেন।

এ ছাড়া দেশের বাজারে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়াতে হবে। তখন আমদানি পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা করতে হবে।

উদ্যোক্তারা বলেছেন, বিভিন্ন শিল্পপণ্য উৎপাদনে গ্যাসের অবদান গড়ে ৮-১২ শতাংশ। এর মধ্যে তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড়, সিরামিক, অ্যালুমিনিয়াম, রড, স্টিল, জাহাজ ভাঙাসহ বেশিরভাগ বড় শিল্পেই গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। ফলে ওইসব শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আশঙ্কা করছে, গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫-১০ শতাংশ খরচ বাড়বে। বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে শিল্পোৎপাদনে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমলে বিপাকে পড়বে রফতানিমুখী শিল্প খাত। গড়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, আমরা আশঙ্কা করছি পণ্যমূল্য বাড়বে। একই সঙ্গে ভ্যাটের চাপ ও গ্যাসের বাড়তি দামের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের পশ্চাৎপদ শিল্প যেমন টেক্সটাইল, স্পিনিং মিলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে রফতানি খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে বিভিন্ন শিল্প খাতে গড়ে ১ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব পড়বে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ খাতে। কেননা এ খাতেই সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহৃত হয়। মোট গ্যাসের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতেই ব্যবহৃত হয় ৪১ শতাংশ। যে কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে সরকারকে বিদ্যুতের দামও বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, তৈরি পোশাক খাতে ১-২ শতাংশ প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া টেক্সটাইল খাতে ৮ থেকে ১২ শতাংশ খরচ বাড়তে পারে। এ ছাড়া সব শিল্প খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেখতে হবে আমরা কতটা সক্ষমতা অর্জন করতে পারি। বাংলাদেশে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানো উচিত ছিল। শিল্প খাতে এর প্রভাব অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত ছিল।

অর্থনীতিবিদ ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, আমরা যেহেতু বিনিয়োগ ও রফতানি বাড়াতে চাই সে জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। এবার বাড়ানো হয়েছে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর আগেরবার বাড়ানো হয়েছিল ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে এবার একটু বেশিই বাড়ানো হয়েছে। অবশ্যই এর নেগেটিভ প্রভাব শিল্প খাতে পড়বে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অদক্ষতা দূর করা গেলে গ্যাসের ব্যবস্থাপনায় যে অপচয় হচ্ছে তা রোধ করা সম্ভব হতো। তখন লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারা সহজ হতো। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব রফতানিমুখী শিল্পে অবশ্যই পড়বে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার সিএনজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৩ টাকা। সোমবার পর্যন্ত প্রতি ঘনমিটারের দাম ছিল ৩৮ টাকা। সে হিসাবে দাম বেড়েছে প্রতি ঘনমিটারে ৫ টাকা। এর প্রভাবে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে পণ্য পরিবহনে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হোটেল ও রেস্টুরেন্টের জন্য প্রতি ঘনমিটার ২৩ টাকা। আগে ছিল ১৭ টাকা। ফলে বেড়েছে ৬ টাকা। এর প্রভাবে হোটেল রেস্টুরেন্টে খাবার খরচ বাড়বে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ঘনমিটার ১৭ টাকা ৪ পয়সা। এটা অপরিবর্তিত রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য খাতে বাড়ানোর কারণে এসব খাতের খরচও বাড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ২ টাকা ৯৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে একপর্যায়ে সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াতেও বাধ্য হবে। তখন এর পাশাপাশি অন্য সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে।

ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা করা হয়েছে। প্রতি ঘনমিটারে দাম বেড়েছে ৪ টাকা ৮৭ পয়সা। ফলে এ খাতেও খরচ বাড়বে।

সার কারখানায় ব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য প্রতি ঘনমিটার ২ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ৭ টাকা ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৭৩ পয়সা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে ৩ টাকা ৪৯ পয়সা। শিল্প খাতে গ্যাসের দাম এত বেশি বাড়ায় পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। দেশের ভেতরে সরবরাহ করা পণ্য থেকে শুরু করে রফতানি পণ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে এ খাতে তিনভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রথমত, এ খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে সরাসরি এ খাতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, সব শিল্পই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। এর কারণেও দাম বাড়বে। তৃতীয়ত, পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়ার কারণে এর প্রভাব পড়বে পণ্য পরিবহনে।

গ্যাসের দাম চা-বাগানের জন্য ৬ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। এর প্রভাবে চায়ের উৎপাদন খরচও বাড়বে।

বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, রফতানি খাত এমনিতেই তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এর মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে বহুমুখী চাপ পড়বে এ খাতে। তিনি গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে যে ক্ষতি হয় তা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাহলে গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে ঘাটতি সমন্বয় করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কার্যক্রম থমকে যাবে।

বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মনসুর আহমেদ বলেন, নিট রফতানি খাত কঠিন সময় পার করছে। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের মূল্য হ্রাস ও ইউরোর দরপতনের কারণে নিট খাত ধুঁকছে। এখন গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে সুতার দাম বাড়লে নিট খাতের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে ব্যবসা করা কঠিন থেকে কঠিনতর অবস্থায় যাবে।

রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাসের এত দাম বৃদ্ধি ‘চরম শিল্পায়নবিরোধী সিদ্ধান্ত’। তিতাসের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে অবৈধ সংযোগ নিয়ে বছরের পর বছর বিল না দিয়ে অনেকে ব্যবসা করছেন। আর তিতাস সেটি বন্ধ না করে সৎ ব্যবসায়ীদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। তিতাসে যে লুটপাট হচ্ছে, সে ছিদ্র বন্ধ করতে পারলে গ্যাসের দাম আরও কম বাড়ানো যেত।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সচিব মনসুর আহমেদ বলেন, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ছিল ৯ টাকা ৬২ পয়সা, এটি ৪৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে বাজেটে টেক্সটাইল শিল্পকে যে সুবিধা দেয়া হয়েছে, শিল্প তার সুফল পাবে না। কারণ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এক কেজি সুতা উৎপাদনে যেখানে বিদ্যুৎ খরচ ৯ টাকা ৩০ পয়সা লাগত, সেখানে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ৬০ শতাংশ ব্যয় বাড়বে। অর্থাৎ এক কেজি সুতার উৎপাদনে বিদ্যুৎ খরচ বাড়বে প্রায় ৮ টাকা। এমনিতে উদ্যোক্তারা লোকসানে দেশীয় সুতা বিক্রি করছেন, তার ওপর নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে অনেক মিল বন্ধ হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×