রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ

অধ্যক্ষ সিরাজ অনেক ছাত্রীর ইজ্জত নষ্ট করেছে

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় বৃহস্পতিবার সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফার সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়েছে।

মোস্তফা আদালতকে বলেছেন, আগেও অধ্যক্ষ সিরাজ অনেক ছাত্রীর ইজ্জত নষ্ট করেছেন। আমি নিজে তার সাক্ষী। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে মোস্তাফার সাক্ষ্যগ্রহণ চলে।

আগের দিন বিকালে তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো সাক্ষ্যগ্রহণ চলে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন। এদিকে রাফিকে যৌন হয়রানির চার্জশিট গ্রহণ করে বৃহস্পতিবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইন মামলার সব নথিপত্র নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, মাদ্রাসার অফিস সহকারী মোস্তফা আদালতকে জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ সিরাজ ইতিপূর্বে অনেক ছাত্রীর ইজ্জত নষ্ট করেছেন।

রাফির ঘটনার কয়েক মাস পূর্বে মোস্তফা মাদ্রাসার জরুরি কাজে অফিস কক্ষে প্রবেশ করে দেখতে পান অধ্যক্ষ সিরাজ এক ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরে আছেন। তিনি এ দৃশ্য দেখে দ্রুত অফিস কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে অধ্যক্ষ সিরাজ তার দেখা এ ঘটনা কাউকে জানালে তাকে পুলিশ দিয়ে চুরির মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন।

সাক্ষ্য দেয়ার সময় মোস্তফা বলেছেন, অধ্যক্ষ সিরাজের কুকীর্তি দেখে ফেলায় তিনি আমাকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিয়েছিলেন। আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘পাথরের সঙ্গে কপাল ঠুকলে মাথা ফাটবে, নাকি পাথর?’ আমি বলেছিলাম মাথাই ফাটবে।’ তখন উনার অনেক ক্ষমতা ছিল, তাই তখন প্রতিবাদ করতে পারিনি।

শাহজাহান সাজু বলেন, রোববার রাফি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কেরোসিন বিক্রেতা সোনাগাজীর ভূঞা বাজারের জসিম উদ্দিন, সোনাগাজীর কাপড় ব্যবসায়ী বোরকা বিক্রেতা লোকমান হোসেন ও বোরকা সরবরাহকারী দোকন কর্মচারী হেলাল উদ্দিনের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।

পরে মোস্তফাকে জেরা করেন ১৬ আসামির পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু ও কামরুল হাসানসহ প্রায় ২০ জন আইনজীবী। তারা বলেন, মোস্তফা যেসব সাক্ষ্য আদালতে দিয়েছেন তার কোনোটাই সঠিক নয়। মোস্তফার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার মালামাল চুরিসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা বিভিন্ন সময়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায় তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর আগে বেলা ১১টায় কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রাফি হত্যা মামলার সব আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

২৭ জুন মামলার বাদী ও প্রথম সাক্ষী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। পরে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা, শেষ হয় ৩০ জুন। সোম ও মঙ্গলবার রাফির বান্ধবী নিশাত সুলতানা ও সহপাঠী নাসরিন সুলতানা ফূর্তির সাক্ষগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়। বুধবার পিয়ন নুরুল আলমের জেরা শেষ হয়। ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাফির মৃত্যু হয়।

পরে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফেনীর পরিদর্শক শাহ আলম আদালতে ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন। আসামিরা হলেন- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আবদুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আবদুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।

রাফির শ্লীলতাহানির মামলাটিও ট্রাইব্যুনালে : রাফিকে শ্লীলতাহানির মামলার চার্জশিট গ্রহণ করে সেটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম বলেছন, বৃহস্পতিবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইন মামলার সব নথিপত্র নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদের আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ৯ জুলাই ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে মামলার বিচার কাজ শুরু হবে।

বুধবার বিকালে জাকির হোসেনের আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়। বৃহস্পতিবার চার্জশিটের ওপর শুনানি হয়। তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, ‘অধ্যক্ষ সিরাজ নুসরাতকে যৌন হয়রানির কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।’