তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা

জাহালমকে শনাক্তে দুদকের ভুল ছিল

ভুলের দায় আইও তদারককারী ও মহাপরিচালক এড়াতে পারেন না * শুনানি আগামী মঙ্গলবার

  যুগান্তর রিপোর্ট ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাহালমকে শনাক্তে দুদকের ভুল ছিল
ফাইল ছবি

দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা নিজেদের ভুলে ঋণ জালিয়াতির ৩৩ মামলায় পাটকল শ্রমিক জাহালমকে আবু সালেক রূপে চিহ্নিত করেন।

এ ভুলের দায় আইও, তদারককারী কিংবা সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক এড়াতে পারেন না। আদালতের নির্দেশে গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুল পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করেছেন ব্র্যাক ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া অ্যাকাউন্টের ভুয়া ব্যক্তিকে পরিচয়দানকারীরাও এ জন্য দায়ী।

বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি আদালতে দাখিলের পর বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ শুনানির জন্য মঙ্গলবার দিন ঠিক করেছেন।

১৭ এপ্রিল জাহালম-কাণ্ডে কে বা কারা দায়ী তা দেখার জন্য এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে প্রতিবেদন চান আদালত। সে অনুসারে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক (লিগ্যাল) ও তদন্ত কমিটির প্রধান আবুল হাসনাত মো. আবদুল ওয়াদুদের দেয়া এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার আদালতে দাখিল করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একটি মামলার পরিবর্তে ৩৩টি মামলা এবং মামলার ঘটনাস্থল পরিবর্তন করে ফেলা এগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন জড়িত ছিল।

অভিযোগটির অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা বা তদারককারী কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট পরিচালক কেউই বিষয়টি নিয়ে লিগ্যাল অনুবিভাগে আইনগত মতামত গ্রহণ করেননি।

লিগ্যাল অনুবিভাগের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে কিংবা তাদের মত নেয়া হলে এ ভুলটি এড়ানো সম্ভব হতো। এ ভুলের দায় আইও, তদারককারী কিংবা সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক এড়াতে পারেন না।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি (তদন্তকারী কর্মকর্তা) কোনো আসামির ঠিকানা যাচাই করেননি। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে অনুসন্ধান রিপোর্ট দাখিল করেন। ফলে ভুয়া নাম-ঠিকানা সংবলিত ব্যক্তিকেও আসামিভুক্ত করা হয়। সরেজমিন অনুসন্ধান করলে আবু সালেকের ভুয়া ঠিকানার বিষয় বের হয়ে আসত। অনুসন্ধানকালে তদারককারী মুহাম্মদ আশরাফ আলী ফারুকের কোনো অবদান দেখা যায় না।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ডেস্ক অফিসার কিংবা মহাপরিচালকও তাদের নোটে এ বিষয়ে কিছু বলেননি। তারা যত্নশীল হলে অনুসন্ধান পর্যায়েই মামলাগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতি উদ্ঘাটন করা সম্ভব হতো।

এতে উল্লেখ করা হয়, এ মামলায় অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। কিন্তু তাদের কাউকে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযুক্ত করা হয়নি। তাদের চার্জশিটভুক্ত করা উচিত ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়- আইওগণ (তদন্ত কর্মকর্তারা) সঠিকভাবে মামলার তদন্ত করেননি। প্রত্যেকই এক অপরের ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রত্যেকই আশায় ছিল অন্যরা তদন্ত অগ্রগতি করলে তারা সেটি কপি করবে এবং সেটাই তারা করেছে। এর মধ্যে শুধু ব্যতিক্রম সেলিনা আখতার মণি। শুধু সে-ই আবু সালেককে শনাক্ত করা বা খুঁজে বের করার জন্য তৎপর ছিল। কিন্তু সেও কাজটি নিজে না করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের দিয়ে সেটি করাতে চেয়েছিল।

সে যদি নিজেই আবু সালেককে খোঁজার জন্য টাঙ্গাইল যেত তবে হয়তো এ ভুলটি হতো না। সেলিনা আক্তার মণির চাপে পড়ে ফয়সাল কায়েস যে ব্যক্তিকে আবু সালেক হিসেবে হাজির করল তাকেই সকল আইও আবু সালেক হিসেবে মেনে নিল। এখানে তদারককারীর কোন কার্যকর ভূমিকাই দেখা যাচ্ছে না।

এতে আরও বলা হয়, মামলাগুলোতে ১২ জন তদন্ত কর্মকর্তার মধ্যে কেউই জাহালমের বাড়ি পরিদর্শন করেননি। করলে জাহালমের বাড়ির দৈন্য দশা দেখলে তদন্ত কর্মকর্তাদের মনে অবশ্যই সন্দেহ দেখা দিত।

প্রতিবেদনের বিষয়ে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, প্রতিবেদন দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, সমন্বয়হীনতার কারণেই এমনটা হয়েছে। জাহালম তিন বছর জেল খেটেছেন, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

এখন এর জন্য কে কতটুকু দায়ী তা আদালত নির্ধারণ করবেন। জাহালমের আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত বলেন, দুদক স্বচ্ছভাবেই তদন্তটা করেছে বলে আমি মনে করি।

প্রকৃত দোষীদের বের করে আনার জন্য তদন্তে সঠিক প্রয়াস ছিল বলেই মনে হয়েছে। ভবিষ্যতে দুদক যাতে এমন ভুল আর না করে তার জন্য সুপারিশও আছে প্রতিবেদনে। সেই সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন হলে এমনটা আর ঘটবে না বলে আমি মনে করি। যেখানে দুদক নিজেই নিজেদের দায় স্বীকার করে নিয়েছে। আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। জাহালমের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান।

সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেক নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক।

কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলে সালেকের বদলে তিন বছর ধরে কারাগারে কাটাতে হয় টাঙ্গাইলের জাহালমকে। চলতি বছরের জানুয়ারির শেষদিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত আদালতের নজরে আনলে দুদকের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

কারাগারে থাকা ভুল আসামি জাহালমকে কেন অব্যাহতি দেয়া হবে না এবং তাকে মুক্তি দিতে কেন ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত একটি রুলও জারি করা হয়। এরপর দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দুঃখ প্রকাশ করে ভুলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আদালতের আদেশে গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জাহালম।

পাটকল শ্রমিক জাহালমের তিন বছর কারাগারে আটক থাকার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি করে দুদক। তবে হাইকোর্টে দুদকের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের ওপর দায় চাপিয়ে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা অভিযোগপত্র দিয়েছিলেন।

কিন্তু দুদকের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে ৩৩টি মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর), অভিযোগপত্রসহ (সিএস) যাবতীয় নথি তলব করেন হাইকোর্ট। সেদিন দুদকের কার্যক্রমে উষ্মা প্রকাশ করে আদালত বলেন, ইঁদুর ধরতে না পারলে সেই বিড়ালের প্রয়োজন নেই।

পরে আরেক আদেশে গত ১৭ এপ্রিল আসামি না হয়েও জাহালমের কারাভোগের জন্য কে বা কারা দায়ী, তা দেখতে দুদকের কাছে প্রতিবেদন চান হাইকোর্ট। সে প্রতিবেদনই বৃহস্পতিবার দাখিল করা হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : ভুল আসামি জাহালম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×