ভারতে বিলিয়ন ডলার রফতানির রেকর্ড

  যুগান্তর ডেস্ক ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডলার
ডলার

এই প্রথমবারের মতো ভারতে বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানির পরিমাণ ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।

ভারত সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারত ১০৪ কোটি ডলারেরও (প্রায় ৮ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা) বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করা হলেও ভারতের বিশেষত গার্মেন্ট শিল্প এ প্রবণতায় খুবই উদ্বিগ্ন।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আছে প্রায় ৬৭টি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসিভুক্ত)। এর মধ্যে অ্যাঙ্গোলা বা মোজাম্বিক ছাড়া কোনো দেশ কখনও বার্ষিক রফতানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারেনি।

বাংলাদেশ সেই তালিকায় ঢুকে পড়েছে মূলত তৈরি পোশাক রফতানিতে ভর করেই, গত অর্থবছরে যার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ।

এ অবস্থায় উদ্বিগ্ন ভারতীয় গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। যদিও দিল্লির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকরিয়ের’-এর (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশনস) অধ্যাপক অর্পিতা মুখার্জি বলছেন, শুধু শুল্কে ছাড় পাওয়াটাই বাংলাদেশের একমাত্র সুবিধা নয়।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, গার্মেন্ট খাতে ভারত কিন্তু আর বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জায়গাতে নেই। থ্রিডি প্রিন্টারে ডিজাইনিং থেকে শুরু করে নানা প্রযুক্তিতে তারা (বাংলাদেশ) ওখানে প্রচুর বিনিয়োগও করেছে, তার সুফলও পাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে ধনী দেশ হয়েও আপনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন, আর বলবেন বাংলাদেশের রফতানি কিভাবে বাড়ছে- তা তো হয় না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের শ্রমশক্তিও আর সস্তা থাকছে না। বাংলাদেশ এসিইজেড বা বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের ফায়দা তুলছে, ওদিকে আমাদের এসিইজেডকে যুক্তরাষ্ট্র চ্যালেঞ্জ করে বসে আছে! সুতরাং আমাদের কোনো পলিসিই ঠিকঠাক নেই। ফলে দোষটা তো পলিসির।

অপরদিকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ও অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান প্রেমাল উদানি বিবিসিকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতে তৈরি পোশাক রফতানি এখন খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে- বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে। কিন্তু আমাদের মূল অভিযোগ হল, সার্টিফিকেট অব অরিজেনের নিয়ম-কানুন বাংলাদেশ মানছে না! মানে চীন বা অন্য কোনো জায়গা থেকে ফেব্রিক কিনে নিজের দেশে সেলাই করে সেটাই তারা ভারতে শুল্কমুক্ত রফতানি করছে। আমাদের বক্তব্য হল, বাংলাদেশকে শুল্ক ছাড় দেয়ার নামে আমরা তো চীনা পণ্যকে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকতে দিতে পারি না।

প্রেমাল উদানির অ্যাপারেল সংস্থা ‘কেটি কর্পোরেশন’র মূল কারখানা তামিলনাড়ুর তিরুপুরে। ওই শহরকে ঘিরে প্রচুর গার্মেন্ট কারখানা আছে, এ শিল্প মালিকদের সংগঠনও খুব শক্তিশালী। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পোশাকের সরাসরি প্রতিযোগিতা এ শিল্পাঞ্চলে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গেই।

তবে দিল্লির থিংক ট্যাংক রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমের অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে মনে করেন, ভারতের গার্মেন্ট শিল্পে শক্তিশালী দক্ষিণ ভারতীয় লবি চাইলেও বাংলাদেশি পণ্যে নতুন করে শুল্ক বসানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ভারতে আন-ব্র্যান্ডেড গার্মেন্টের মূল হাবটাই এ তিরুপুর। কিন্তু তারা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। এখন তিরুপুর লবি বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির সুবিধা বন্ধ করতে চাইলেও সেটা করা যাবে না। সেক্ষেত্রে ওরা (বাংলাদেশ) আমাদের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব আরবিট্রেশনেও টেনে নিয়ে যেতে পারে।

তার ভাষায়, ভারতীয়রা যেটা করতে পারেন তা হল নিজেদের প্রডাক্টে আরও ভ্যালু অ্যাডিশন করে সেটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা, কম্পিটিটিভিনেস বাড়াতে পারেন কিংবা প্রডাকশনের খরচ কমাতে পারেন। পাশাপাশি নতুন একটা ট্রেন্ড শুরু হয়েছে, বেশ কিছু ভারতীয় টেক্সটাইল সংস্থা আফ্রিকাতে গিয়েও কারখানা গড়ছেন। আফ্রিকাতে ওয়েজ আরব্রিটেজের (কম পারিশ্রমিক) সুবিধা নিয়ে উৎপাদন করে সেটাই আবার ভারতে রফতানি করছেন।

একইভাবে ভারতের কোম্পানি অরবিন্দ মিলস বাংলাদেশে গিয়ে কারখানা নির্মাণ করে ওখান থেকে ব্যবসা করছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এগুলোই এখন ভারতীয় শিল্পপতিদের জন্য একমাত্র রাস্তা বলে মনে করছেন তিনি।

অধ্যাপক অর্পিতা মুখার্জিও তার সঙ্গে একমত, শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির সুবিধা ভারত নানা কারণে প্রত্যাহার করতে পারবে না।

তিনি বলেন, শুল্ক বাড়িয়ে আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ করা গেলেও স্থায়ীভাবে যায় না। বিদেশি মোবাইল ফোনে বিপুল শুল্ক বসিয়েও ভারতে কিন্তু মোবাইল ফোনের বিক্রি কমানো যায়নি। আসলে সমস্যাটা আমাদের নিজস্ব- আমাদের ইন্ডাস্ট্রি খুব খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এখন কি বাংলাদেশের ওপর শুল্ক বসিয়ে আর চীনকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আমাদের সমস্যার সমাধান হবে? এছাড়া বাংলাদেশ আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত নিজেকে নেতার ভূমিকায় দেখতে চায়, এ অবস্থায় সত্যিই কি তারা বাংলাদেশকে শুল্কের আওতায় আনতে পারবে?

অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রফতানি, বিশেষ করে গার্মেন্ট, আরও বাড়বে এটা ধরে নিয়েই ভারতীয় ব্যবসায়ীদের নিজেদের স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আর সেখানে সম্ভবত ভারত সরকারের বিশেষ কিছু করণীয়ও নেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×