রাফি হত্যা: ফেনীর এডিএম এনামুলের ভূমিকা তদন্তের নির্দেশ

  যুগান্তর ডেস্ক ১৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নুসরাত জাহান রাফি
নুসরাত জাহান রাফি। ফাইল ছবি

মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানি ও হত্যার ঘটনায় ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকে এনামুল করিমের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

৩০ দিনের মধ্যে সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান এনামুল করিমের বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্ট দিতে জনপ্রশাসন ও শিক্ষা সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে রাফি হত্যা মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে সোমবার সাক্ষ্য দিয়েছেন মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোসাইন।

তিনি আদালতকে বলেছেন, অধ্যক্ষ সিরাজ ছিলেন প্রতিশোধপরায়ণ। তার কাছে সব শিক্ষক জিম্মি ছিলেন। তার অফিসে তিনি বহিরাগতদের নিয়ে আড্ডা বসাতেন। তাতে যোগ দিতেন পরিচালনা কমিটির সদস্যরাও।

আজ রাফির সহপাঠী তানজিনা বেগম সাথী, বিবি জাহেদা বেগম তামান্না ও পরীক্ষার হলরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক ফারুক সাক্ষ্য দেবেন। খবর যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার, ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধির।

হাইকোর্টে সোমবার রিট আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ সোমবার রুলসহ এ আদেশ দেন।

শুনানিতে আদালত বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ না থাকে তাহলে কোথায় নিরাপত্তা পাবে? নুসরাতের কথোপকথন ভিডিও করে ফেসবুকে ভাইরাল প্রসঙ্গে আদালত বলেন, একজন পুলিশ অফিসারের আচরণ এমন হতে পারে না।

রিটকারী আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ আদালতে নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার। নুসরাতকে যৌন হয়রানি ও হত্যার ঘটনায় ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে এনামুল করিমের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন, শিক্ষা ও স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, ফেনীর ডিসি, এসপি ও সোনাগাজী থানার ওসিকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। পরে আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের ঘটনায় এনামুল করিমের ভূমিকা ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তার নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ৪ সপ্তাহের রুল জারি করেছেন।

গত ২১ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে ‘এডিএম এনামুলের ভূমিকা, পুলিশের তদন্তের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন মন্ত্রণালয়ের’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে রিটটি করা হয়। বলা হয়, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এনামুল করিমের ভূমিকা নিয়ে পুলিশ সদর দফতর যে তদন্ত করেছিল, তার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব মল্লিকা খাতুনের স্বাক্ষরে এক চিঠিতে এ ব্যাপারে পুলিশের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, পুলিশ সদর দফতরের গঠিত তদন্ত কমিটি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যাপারে তদন্ত করেছে কি-না, করে থাকলে কোন এখতিয়ার বলে করেছে, তা স্পষ্ট করতে হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নুসরাত হত্যার পর পুলিশ সদর দফতরের একজন ডিআইজিকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করেছিল পুলিশ সদর দফতর।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ফেনীর এসপি, সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি, দুই এসআইয়ের দায়িত্বে অবহেলা এবং গাফিলতির তথ্য উঠে আসে। সেখানে চারজনের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশও করা হয়।

এছাড়া ফেনীর তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি এনামুল কবিরের দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হলেও তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ এপ্রিল নুসরাত ও তার মা অধ্যক্ষ সিরাজের বিচার চাইতে গভর্নিং বডির সভাপতি এনামুল করিমের অফিসে গিয়েছিলেন। তিনি ঘটনাটি নুসরাতকে চেপে যেতে বলেন। এনামুল তাদের বলেন, এখন কেন এসেছেন। আপনারা তো মামলা করে ফেলেছেন।

মামলার আগে এলে দেখতাম, কী করা যায়। নুসরাতকে তিনি বলেন, প্রিন্সিপাল খারাপ, সবাই জানে। তুমি তার কাছে গেছ কেন। যখন গেছ, তখন হজম করতে পারলে না কেন? তোমার বাবাকে মাদ্রাসায় বসানোর জন্য এ রকম নাটক সাজিয়েছ’।

অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার পর এই এনামুল করিমকে প্রধান করেই তদন্ত কমিটি করে জেলা প্রশাসন।

রাফি হত্যা মামলায় আরও ৩ জনের সাক্ষ্য : ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধিরা জানান, রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় সোমবার সাক্ষ্য দিয়েছেন ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোসাইন, সোনাগাজী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইয়াছিন ও অ্যাম্বুলেন্স চালক নুরুল করিম।

এর মধ্যে হোসাইন আদালতকে বলেছেন, আমরা অধ্যক্ষ সিরাজের বিভিন্ন অপকর্ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে তিনি নানা উপায়ে প্রতিশোধ নিতেন। তার নানা অপকর্মের কথা শুনলেও প্রতিবাদের সাহস পেতাম না। তিনি প্রতিদিন বহিরাগত একটি গ্রুপকে মাদ্রাসা তহবিলের টাকায় খাওয়াতেন।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসে অবস্থান করতেন। বহিরাগতদের নিয়ে আড্ডা বসাতেন। তাতে যোগ দিতেন পরিচালনা কমিটির কয়েক সদস্যও। ১৬ জন আসামির উপস্থিতিতে চলে সাক্ষ্যগ্রহণ। আজ রাফির সহপাঠী তানজিনা বেগম সাথী, বিবি জাহেদা বেগম তামান্না ও পরীক্ষার হলরুমের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ফারুকের সাক্ষ্য নেয়া হবে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এম. শাহজাহান সাজু বলেন, এ পর্যন্ত ১৮ জনের সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়েছে। মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছাড়াও পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইয়াছিন আদালতকে জানান, অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেফতার হওয়ার পর এরকম নৃশংস ঘটনা যে সে ঘটাতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল আমাদের।

তাছাড়া যৌন হয়রানির পর রাফির মা শিরিন আমাকে নিয়ে মাদ্রাসায় যান। রাফির মা অধ্যক্ষ সিরাজের কাছে তার মেয়েকে যৌন হয়রানির কারণ জানতে চাওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই পুলিশ নিয়ে কমিটির সভাপতি রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলম হাজির হন।

অ্যাম্বুলেন্স চালক নুরুল করিম আদালতে বলেন, অগ্নিদগ্ধ রাফিকে আমরাই ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই। আমার ১৬ বছরের চাকরি জীবনে অনেক রোগী বহন করেছি। তবে নুসরাতের মতো এই রকম আগুনে পড়া রোগী বহন করিনি।

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×