কুমিল্লায় আদালত কক্ষে আসামি খুন

খুনের সিদ্ধান্ত আগের, সুযোগ খুঁজছিল হাসান

খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে ঘাতক হাসানের জবানবন্দি * এজলাসে খুনের ঘটনায় গাফিলতি খতিয়ে দেখা হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী * তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশ, আদালত চত্বরে আতঙ্ক কাটেনি

  আবুল খায়ের, কুমিল্লা ব্যুরো ১৭ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুনের সিদ্ধান্ত আগের, সুযোগ খুঁজছিল হাসান
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার অতিরিক্ত ৩য় দায়রা জজ আদালত কক্ষে রোববারের খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন হাজী আবদুল করিম হত্যা মামলার আসামি মো. হাসান। সোমবার তাকে কুমিল্লা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জালাল উদ্দিনের আদালতে হাজির করা হলে তিনি সব স্বীকার করেন।

হাসান বলেন, ওই মামলা নিয়েই ফারুকের সঙ্গে আমার বিরোধ ছিল। এরই জেরে তাকে খুনের সিদ্ধান্ত নেই। তিনি বলেন, নিরুপায় হয়েই হত্যার জন্য আদালত কক্ষকে বেছে নেই। জবানবন্দি দেয়ার পর হাসানকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এদিকে কুমিল্লায় আদালত চত্বরে আতঙ্ক কাটেনি। বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের চোখে-মুখে ছিল উদ্বেগ- আতঙ্ক। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, কুমিল্লার আদালতে নিরাপত্তার দিক থেকে কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজলাস কক্ষে এমন ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। কীভাবে এজলাস কক্ষে একজন মানুষ ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করতে পারে, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বাঙ্গরা থানার এএসআই ফিরোজ আহাম্মেদ ঘাতক হাসানকে একমাত্র আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখার ইন্সপেক্টর প্রদীপ মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, হাসান আদালতে বলেছেন, ২০১৩ সালে হাজী করিম হত্যা মামলার মূল হোতা মো. ফারুক ও তার বাবা। কিন্তু ওরা আমাদের তিন ভাইকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আমরা ৩ ভাই মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিলেও ফারুকের বাবা শুরু থেকেই পলাতক। ফারুক ঢাকায় থাকে, সেও নিয়মিত হাজিরা দেয় না। ফলে বিচার কাজ বিলম্বিত হচ্ছিল। এ নিয়ে কয়েক দফা ওর সঙ্গে আমার ঝগড়াও হয়। শেষ পর্যন্ত দু’দিন আগে ফারুকের সঙ্গে আমার ফোনে বাকবিতণ্ডা হয়। এর পরই ওকে খুনের সিদ্ধান্ত নেই। রোববার আদালতে আসার আগে লাকসাম বাজার থেকে ছুরি ক্রয় করি। আদালতের মূল ফটকে তার অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু ফারুক বিষয়টি বুঝতে পেরে অন্য গেট দিয়ে আদালত কক্ষে ঢুকে পড়ে। পরে আদালত কক্ষে গিয়ে ওকে খুন করি।

সূত্র জানায়, ফারুকের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার খবর পেয়ে হাসান আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তিনি আদালতের বারান্দায় ছুটে গিয়ে ফারুককে খুঁজতে থাকেন। বিচারক এজলাসে ওঠার পর ফারুক দ্রুত কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়।

হাসান পকেটে ছুরি নিয়ে আদালত কক্ষে ঢুকে বিচারকের সামনেই ফারুককে মারধর শুরু করেন। প্রাণ রক্ষায় ফারুক দ্রুত বিচারকের খাস কামরায় প্রবেশ করে। দুর্ধর্ষ হাসানও সেখানে ছুটে গিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করে।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয় কুমিল্লার আদালত প্রাঙ্গণ। কিন্তু এতেও শঙ্কা কাটেনি বিচারপ্রার্থী এবং আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টদের। এ সময় এজলাসের সামনে পুলিশ থাকলেও নিরস্ত্র থাকায় তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি বলে দাবি কোর্ট পরিদর্শক সুব্রত ব্যানার্জির।

কুমিল্লা বারের সাবেক সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ আবদুল্লাহ পিন্টু বলেছেন, আদালতের বিচারিক এজলাসে এমন হত্যাকাণ্ড বিরল, আমরা শঙ্কায় আছি। তিনি আদালতের নিরাপত্তায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি জানান। অ্যাডভোকেট ফাহমিদা জেবিন বলেন, আদালতের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই দুর্বল, পুলিশ সদস্যদের তেমন তৎপরতা দেখা যায় না।

আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বয়স্ক পুলিশ সদস্যদের দেয়া থাকে। সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি মো. আলমগীর খান বলেন, আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি অপরাধীদের ভয়ভীতি কমে গেছে, এ জন্যই এ ধরনের জঘন্য ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, অপরাধের দ্রুত বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে।

দীর্ঘ ৬ বছর কুমিল্লার কোর্ট পরিদর্শকের দায়িত্বে নিয়োজিত সুব্রত ব্যানার্জি বলেন, স্বল্পসংখ্যক পুলিশ দিয়ে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন, তাছাড়া পুলিশ আদালতের অভ্যন্তরে নিরস্ত্র অবস্থায় দায়িত্ব পালন করে থাকে।

এ ব্যাপারে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। শঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবীসহ সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

এদিকে বিজিবি সদস্যদের বীরত্ব ও কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মঙ্গলবার বিজিবি সদর দফতরে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কুমিল্লায় বিচারালয়ে নিরাপত্তায় কোনো গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আদালতে কেমন নিরাপত্তা দেয়া হবে, এটি আদালত ঠিক করে পুলিশকে নির্দেশ দেন। আদালতের চাহিদা মতোই পুলিশ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

তবে এমন ঘটনার পর আদালতকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য আমরা নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। খুব দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।

এর আগে পিলখানাস্থ বিজিবি সদর দফতরের বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে বিজিবি সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ ও কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদক, রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদক-সেবা এবং রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক-সেবা ২০১৮ প্রদান করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বিচারকদের নিরাপত্তা চেয়ে রিট : যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার জানান, আদালত অঙ্গন ও বিচারকদের যথাযথ নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশনা চেয়ে মঙ্গলবার হাইকোর্টে রিট করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান।

কুমিল্লায় আদালত কক্ষে খুনের পর রিটটি করা হয়। আজ বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটের শুনানি হবে। অ্যাডভোকেট ইশরাত বলেন, আদালত কক্ষে খুনের ঘটনায় সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি উদ্বিগ্ন। এ কারণে আমি সমগ্র আদালত অঙ্গন ও বিচারকদের নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশনা চেয়ে রিট করেছি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×