রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা

ওসি মোয়াজ্জেমের বিচার শুরু

রাফির আলিমের ফল কাঁদাল সহপাঠীদের * ‘অধ্যক্ষের টার্গেট ছিল কম মেধাবী, দরিদ্র ও সুন্দরী মেয়েরা’

  যুগান্তর রিপোর্ট, ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি ১৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোয়াজ্জেম

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ৩১ জুলাই সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।

বুধবার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন আসামির অব্যাহতি ও জামিন আবেদন নাকচ করে এ আদেশ দেন। এ অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হল।

আলিম পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে বুধবার। এর দুটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছিলেন মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। প্রকাশিত ফলে দেখা গেছে, কোরআন মাজিদ, হাদিস ও উসুলে হাদিস পরীক্ষায় রাফি ‘এ’ গ্রেড পেয়েছেন। তার এ ফল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সহপাঠী ও স্বজনরা।

রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় আরও ৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার দুপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে সোনাগাজী মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা খুজিস্তা খানম, অফিস সহকারী বেবী রানী দাস, রাফির সহপাঠী আকলিমা আক্তার ও মো. কাওসারের সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়।

রাফিকে যৌন হয়রানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের দিন পিছিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে চার্জ গঠনের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত চার্জ গঠনের নতুন দিন ধার্য করেন।

সকালে কাশিমপুর কারাগার থেকে মোয়াজ্জেমকে এনে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। দুপুর ২টার দিকে সাইবার ট্রাইব্যুনালে তাকে হাজির করার পর মামলার চার্জ শুনানি শুরু হয়। শুরুতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মদ ও আবু সাঈদ সাগর অব্যাহতির আবেদন করেন।

শুনানিতে তারা বলেন, মামলাটি করেছেন ব্যারিস্টার সুমন। কিন্তু তিনি নুসরাতের পরিবারের কেউ নন। তিনি মামলা করতে পারেন না। আর মামলার আগে আদালতের অনুমতি নিতে হয়। তিনি তা নেননি। আর নুসরাতের পরিবার মামলা করতে না পারলে অন্য কাউকে ক্ষমতা দিয়ে মামলা করাতে পারতেন। কিন্তু তা তো করা হয়নি।

আর আসামি তার মোবাইল ফোন সেটে করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেননি। জোর করেও তিনি ভিডিও করেননি। তিনি টয়লেটে গেলে এক সাংবাদিক তার মোবাইল ফোন সেট থেকে সেটি ছেড়ে (প্রচার) দিয়েছেন।

ওসি মোয়াজ্জেম যখন তা বুঝতে পেরেছেন, তার কিছুক্ষণ পরই তিনি তথ্য চুরির অভিযোগে সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার মতো কোনো আলামতও নেই। এ অবস্থায় তার অব্যাহতির প্রার্থনা করছি। একই সঙ্গে তার জামিন আবেদনও করা হয়।

অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি নজরুল ইসলাম (শামীম) অভিযোগ গঠনের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, একটা প্রমাণই মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের জন্য যথেষ্ট। তা হল- তিনি ভিডিওটি করেছেন। আসামিপক্ষও বলছে না যে তিনি ভিডিও করেননি। আর ওসি ভিডিও করার সময় নুসরাতকে স্পষ্টভাবে বলেছেন, তুমি যা বলেছ তা রেকর্ড হচ্ছে। আর অন্য একজন তার মোবাইল ফোন সেট থেকে ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছেন- এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি ভিডিও করেছেন, আর এটি গোপনীয়। এটির গোপনীয়তা রক্ষা করার দায়িত্বও তার।

তিনি বলেন, মানবতার কারণেই ব্যারিস্টার সুমন মামলাটি করেছেন। আর পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষমতা সব পরিবারের থাকে না। মামলা করার আগে তিনি আদালতে আবেদন করেছেন। মামলা করার অধিকার তার না থাকলে আদালত সেটি বাতিল করে দিতেন। তিনি আরও বলেন, কারও মান-সম্মান নিয়ে খেলা করা গর্হিত কাজ। মোয়াজ্জেমের কর্মকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মান হানি হয়েছে। যেখানে ধর্ষিতার নাম প্রকাশে বাধা-নিষেধ রয়েছে। সেখানে ভিকটিমের কোথায় কোথায় হাত দেয়া হয়েছে তাও প্রচার করা হয়েছে। মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হোক এবং তার জামিন নামঞ্জুর করা হোক।

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালতের আদেশে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি মোয়াজ্জেমকে তার বিরুদ্ধে চার্জ পড়ে শোনান। তিনি বলেন, আপনার (মোয়াজ্জেম) বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় চার্জ গঠন করা হয়েছে। আপনি দোষী না নির্দোষ?

জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, আমি নির্দোষ এবং আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছি। এরপর আদালত চার্জ গঠনের আদেশ দিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন। একই সঙ্গে জামিন আবেদনও নাকচ করা হয়। ১৬ জুন হাইকোর্ট এলাকা থেকে তিনি গ্রেফতার হন।

শিক্ষিকাসহ ৪ জনের সাক্ষ্য : মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হাফেজ আহম্মদ ও বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, শিক্ষিকা খুজিস্তা খানম আদালতকে বলেন, আমি ১৯৯৯ সালে প্রভাষক হিসেবে মাদ্রাসায় যোগদান করি। আর ২০০০ সালে সিরাজ উদ্দৌলা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

যোগদানের পর থেকেই অধ্যক্ষ ছাত্রীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ শুরু করেন। ছাত্রীদের শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন। ছাত্রীরা এসব অভিযোগ আমাকে জানাত। আমি অধ্যক্ষকে ছাত্রীদের সঙ্গে পিতার মতো আচরণ করতে বললে তিনি আমাকে অপমানমূলক কথা বলেন।

বিষয়টি সহকর্মীদের জানালে অধ্যক্ষ আমার ওপর ক্ষিপ্ত হন। এ কারণে তিনি আমাকে বিভিন্ন অজুহাতে হেনস্তা করতেন। অধ্যক্ষ মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহ, উপবৃত্তি প্রদান, পরীক্ষার ফি ফ্রি, বেতন মওকুফ ইত্যাদির লোভ দেখিয়ে ছাত্রীদের কব্জা করতেন। তার টার্গেট ছিল অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী, দরিদ্র ও সুন্দরী মেয়ে।

অধ্যক্ষ সিরাজ অপকর্ম চালাতে তার অফিস কক্ষ শিক্ষক মিলনায়তনের পাশ থেকে সাইক্লোন শেল্টারের দোতলায় নিয়ে যান। পরে তিনি ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষটিও তার অফিস কক্ষের পাশে নিয়ে যান; যাতে ছাত্রীদের যখন-তখন তার অফিস কক্ষে ডাকতে পারেন।

ছাত্রীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তাদের কখনও একা অধ্যক্ষের কক্ষে না গিয়ে ২-৩ জন দলবদ্ধভাবে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। তিনি বলেন, রাফির গায়ে আগুন দেয়ার সংবাদ শুনে আমি পরীক্ষার হল থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। এ সময় পুলিশও ঘটনাস্থল ছুটে আসে।

বিকালে মাদ্রাসার অফিস সহকারী বেবী রানী দাস, রাফির সহপাঠী আকলিমা আক্তার ও কাওসার আদালতকে জানান, রাফির ওপর অধ্যক্ষ সিরাজের যৌন নিপীড়নের কথা আমরা রাফিসহ অনেকের মুখেই শুনেছি।

অধ্যক্ষের আচরণে রাফি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। রাফি বলছিল, অনেকেই অধ্যক্ষের অপকর্মের প্রতিবাদ করেনি। আমি জীবন দিয়ে হলেও তার অপকর্মের প্রতিবাদ করব। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীদের জেরা করেন।

দুই বিষয়ে ‘এ’ গ্রেড : মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মো. হুসাইন বলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে এবার আলিম পরীক্ষায় রাফিসহ ১৭৫ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এদের মধ্যে ১৫২ জন পাস করেছে।

নুসরাত জাহান রাফি মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল জানিয়ে মো. হুসাইন আরও বলেন, সব পরীক্ষা দিতে পারলে রাফি ভালো ফল করত। লেখাপড়ার প্রতি তার কতটা খেয়াল থাকলে এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরীক্ষায় অংশ নেয়।

পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাফির সহপাঠী ও স্বজনরা শোক ধরে রাখতে পারছেন না। মাদ্রাসায় পরীক্ষার ফলাফল জানতে আসা শিক্ষার্থীরা রাফির জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় উপস্থিত শিক্ষকদের চোখও ছলছল হয়ে উঠে। ফলাফল জানতে আসা রাফির সহপাঠী তামান্না, নিশাত সুলতানা, নাসরিন সুলতানা, সাইফুল ইসলাম ও জাহেদুল ইসলাম জানান, রাফিরও রেজাল্ট নিয়ে আনন্দে থাকার কথা ছিল।

কিন্তু নির্মমতার বলি হয়ে রাফি আজ তাদের মাঝে নেই। দুটি পরীক্ষায় সে ‘এ’ গ্রেড পেয়েছে। বাকি পরীক্ষা দিতে পারলে ভালো ফলাফল করত। এদিকে আলিম পরীক্ষার ফল প্রকাশের খবর পাওয়ার পর থেকে কান্না থামছে না রাফির স্বজনদের। মা শিরিনা আক্তারের বিলাপ থামতেই চায় না।

তিনি বলেন, আমার মেয়ে দুনিয়ার পরীক্ষায় পাস করতে না পারলেও আখেরাতের পরীক্ষায় পাস করবে। ৬ এপ্রিল রাফি পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে বোরকা পরিহিত কয়েকজন তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দেয়। রাজি না হলে রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। ১০ এপ্রিল ঢাকার একটি হাসপাতালে রাফি মারা যায়। এ ঘটনায় রাফির বড় ভাই মামলা করেন। তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফেনীর পরিদর্শক শাহ আলম আদালতে ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন।

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×