ডিসি সম্মেলনের ৪র্থ দিন

খাস জমি উদ্ধারে মিলবে পুরস্কার

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডিসি সম্মেলন

সরকারি (খাস) ভূমি উদ্ধার করতে পারলেই পুরস্কার পাবেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি)। যিনি যত বেশি ভূমি উদ্ধার করতে পারবেন, তিনি তত বেশি পুরস্কৃত হবেন।

পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সড়ক-মহাসড়কের পাশে পশুর হাট বসানোর অনুমতি না দিতে এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য ডিসিদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এছাড়া সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতেও বলা হয় জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের।

বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে ডিসি সম্মেলনের চতুর্থ দিনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৮টি কর্ম-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ডিসিদের উল্লিখিত নির্দেশনা দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের সভাপতিত্বে সকাল পৌনে ৯টা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ডিসি সম্মেলন চলে। সম্মেলনের চতুর্থ দিনে প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সড়ক পরিবহন, রেলপথ, মহিলা ও শিশু, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, ভূমি, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, ধর্ম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি এবং গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কর্ম-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

এসব অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, সেনাপ্রধান, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ভূমি মন্ত্রণালয় : যারা যত বেশি সরকারি ভূমি উদ্ধার করতে পারবেন, তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সরকারি ভূমি উদ্ধার আরও কীভাবে করা যায়, সে বিষয়ে তাদের বলেছি। যারা বেশি ভূমি উদ্ধার করতে পারবেন, তাদের পুরস্কৃত করা হবে। আমরা জনগণকে সেবা দিতে চাচ্ছি, কীভাবে জনগণের সেবা বাড়ানো যায় এবং ‘আউট অব দ্য বক্স’ কীভাবে চিন্তা করা যায়। গতানুগতিক সিস্টেমের কথা চিন্তা করলে হবে না, আউট অব দ্য বক্স চিন্তা করতে হবে। মানুষ কী চায়, সময়োপযোগী কাজ যাতে মানুষকে দেয়া যায়। অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা অনেক সময় হয়। প্রকৃত যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তাদের টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা হচ্ছে। উন্নয়ন কাজের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের যাতে কোনো ভোগান্তি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য পরামর্শ দেন ভূমিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ৭ এবং ৮ ধারা নোটিশের পর কেন মামলা-মোকদ্দমা হয়ে থাকে, মামলা মামলার গতিতে চলবে। সেটা দেখা যাবে। কিন্তু যখন ৭ এবং ৮ ধারা নোটিশ হয়ে যাবে, তখন যার ‘লেজিটিমেট ক্লেইম’ আছে সেটি যেন দিয়ে দেয়া হয়। এটা আমাদের ম্যানুয়ালে আইনে তাই বলা আছে। ওই অনুশাসনটাকে আমি আরও স্পষ্ট করে দিয়েছি। সাধারণ লোককে সাফার করার কোনো সুযোগ নেই। উপজেলা পর্যায়ে যেসব নতুন ভবন হয়েছে, সেখানে আমরা রেকর্ড রুমের ব্যবস্থা করেছি।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় : বন্যা পরিস্থিতিতে যে কোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে তিন বাহিনীই (সেনা, নৌ ও বিমান) প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। ডিসি সম্মেলনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কর্ম-অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

ডিসিদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সেনাপ্রধান বলেন, ‘নিজের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং কীভাবে আরও ভালো করা যায়, এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

বন্যার বিষয়ে ডিসিদের কিছু বলা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে আজিজ আহমেদ বলেন, ‘আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্স থেকে আমরা যে জিনিসটা সবাইকে জানিয়েছি, আমরা প্রস্তুত আছি। যদি এ ধরনের কিছু হয়, তখন যে কোনো সময় যে কোনো ধরনের সহযোগিতা চাইলে আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্স সবাই আমরা প্রস্তুত আছি।’

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় : কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য ডিসিদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোনোভাবে কৃষক যাতে বোরো উৎপাদনে নিরুৎসাহিত না হন, সেজন্য আগামী দিনে মিলার ও কৃষকের কাছ থেকে সমপরিমাণ ধান কেনা হবে। মিলারররা ধান ছাঁটাই করে চাল সরকারি গুদামে দেবে। এর জন্য যে বাড়তি খরচ হয়, সেটা সরকার দেবে।’

তিনি বলেন, শুরুতে কৃষকের কাছ থেকে দেড় লাখ টন ধান কেনার কথা থাকলেও সে সময় অর্ধেক পরিমাণ কেনা হয়। পরে আরও চার লাখ টন ধান কেনার কথা ছিল। সে সময় এক লাখ টন বোরো ধান কেনা হয়েছে। বাকি ধানও কেনা হবে, ধান কৃষকের গোলাতেই আছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় : গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘ইভটিজিং, দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজ করতে ডিসিদের বলা হয়েছে। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়- এমন অনাকাঙ্ক্ষিত যে কোনো হস্তক্ষেপ তারা এড়িয়ে চলবেন। যে কোনো সমস্যা হলে, কোনো অবৈধ প্রভাবের মুখোমুখি হলে তারা আমাদের জানাবেন। আমরা তাদের সহায়তা করব।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ডিসিরা তাদের কিছু আকাক্সক্ষার কথা বলেছেন যেমন- কোথাও বিল্ডিং নির্মাণ, কোথাও সার্কিট হাউস নির্মাণ আবার কেউ কেউ কাজের বিস্তৃতির কথা বলেছেন। সব বিষয় আমরা সংবেদনশীল ও সহানভূতির সঙ্গে গ্রহণ করেছি। যেসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব তা করার আশ্বস্ত করেছি।’

সড়ক পরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয় : আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রধান সড়ক ও মহাসড়কের পাশে পশুর হাট যেন বসতে না পারে, সেজন্য ডিসিদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, কিছু রাস্তা আছে এলজিআরডির; কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগুলো মহাসড়ক বিভাগে আনার দরকার বলে ডিসিদের সুপারিশ রয়েছে।

এগুলো আমাদের পরিকল্পনার মধ্যেও রয়েছে। ডিসিদের একটা মেসেজ দেয়ার চেষ্টা করেছি যে, সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা, ঈদকে কেন্দ্র করে মহাসড়কের পাশে অনেক সময় কোরবানি পশুর হাট বসে। এতে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। তাই রাস্তায় হাট যেন না বসে, সেজন্য ডিসিদের সহযোগিতা চেয়েছি। জেলাগুলোয় ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া সংক্রান্ত বোর্ডের নিয়মিত মিটিং করার জন্য বলেছি। এছাড়া উন্নয়নের জন্য মহাসড়ক নির্মাণ বা প্রশস্তকরণের সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের বিষয় থাকে। সেখানে তাদের (ডিসি) সহযোগিতা যেন অব্যাহত থাকে, সে বিষয়ে বলা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ : রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় ২৫ থেকে ৩১ জুলাই সারা দেশে মশক নিধন সপ্তাহ পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ডিসিদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মশার ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা চলছে। আমি ইচ্ছা করলে এমন কোনো ওষুধ পরিবেশে দিতে পারি না যেটা মশা মারতে গিয়ে মানুষের ক্ষতি হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে আমাদের ওষুধের অনুমতি নিতে হয়। তারা যেটার অনুমোদন দেয়, আমরা সেটা ব্যবহার করি।’

তিনি বলেন, ‘ডিসিদের বলা হয়েছে, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য তাদের আয় বাড়াতে হবে।’

স্বাস্থ্য, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় : জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তাররা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন কি না, সে বিষয়ে নজর রাখতে ডিসিদের নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, ‘ডিসিদের বলেছি আপনারা নিয়মিত জেলা, উপজেলা হাসপাতাল পরিদর্শন করবেন। ডাক্তারদের উপস্থিতি লক্ষ রাখবেন। রোগীরা যাতে ভালো সেবা পান- এ বিষয়ে পরামর্শ দেবেন।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের জন্য বিশেষ কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘ফার্মেসিগুলো প্রেসক্রিপশন ছাড়া যাতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না করে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। আমাদের ওষুধ পলিসিতেও এটা রয়েছে; কিন্তু এটা সবাই মানে না। গরুর খামার, পোলট্রি, মৎস্য খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয়। সেটা গরু, পোলট্রি ও মাছ হয়ে আবার মানুষের গায়েও চলে আসে। এ বিষয়গুলোয়ও ডিসিদের সতর্ক হতে বলেছি। বিভিন্ন স্থানে ওনারা গিয়ে এ বিষয়টি যেন নিয়ন্ত্রণ করেন।’

এ সময় মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, আগেও নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটত। কিন্তু সেগুলো তারা প্রকাশ করত না। কিন্তু বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নারীদের এতটা ক্ষমতাধর ও ভয়েস রেইজ করেছেন যে, তারা এগিয়ে আসছে এবং ঘটনাগুলো প্রকাশ করছে।

নারী নির্যাতন বৃদ্ধি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ইন্দিরা বলেন, যদি বলি বেড়েছে, তাহলে একটা কম্পেয়ার করে বলতে হয়। কিন্তু আমরা তুলনা করতে পারি না। কারণ আমাদের কাছে বেজলাইন ডাটা নেই। সরকারের কাছেও কেন ডাটা নেই- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো বলছি বেজলাইন ডাটা কোথাও নেই। এক্ষেত্রে দৃশ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে ডিসিদের কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছি।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রণালয় : ইন্টারনেট সুবিধা সবার জন্য অবারিত করতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দিতে কাজ করছি। ফাইবার অপটিক ক্যাবল নেটওয়ার্ক বসানোর জন্য আমাদের টিম বিভিন্ন জেলায় কাজ করতে যায়। যেহেতু বিষয়টি খুব সেনসেটিভ, তাই তাদের নিরাপত্তার প্রয়োজন। এজন্য যখন ওই টিম বিভিন্ন জেলায় যাবে, তখন তাদের নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা যেন পায়, সেজন্য ডিসিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×