বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা চূড়ান্ত

শীর্ষ খেলাপিদের ঋণ আদায়ে ব্যর্থদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের একজন ডিএমডির নেতৃত্বে হবে তদারকি সেল

  হামিদ বিশ্বাস ১৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শীর্ষ খেলাপিদের ঋণ আদায়ে ব্যর্থদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

শীর্ষ ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে বিশেষ নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিগগির এটি সার্কুলার আকারে ব্যাংকগুলোতে পাঠানো হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যাংককে ১০০ কোটি টাকার ওপরে খেলাপি ঋণ তদারকে একজন ডিএমডির নেতৃত্বে বিশেষ তদারকি সেল গঠন করতে হবে। আবার এ সেলের তদারকি করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এরপরও ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সুপারিশ করবে এ সংক্রান্ত গঠিত তদারকি সেল।

কর্মকর্তাদের অপরাধ অনুযায়ী পদোন্নতি না দেয়া, পদ অবনমন; এমনকি চাকরি থেকে ছাঁটাইয়েরও বিধান থাকছে নীতিমালায়।

জানতে চাইলে ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি ব্যাংকের ঋণ আদায়ে আলাদা বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তদারকির জন্য আলাদা সেল আছে। অনেক ব্যাংকের ডিএমডি এসব সেলের দায়িত্বে আছেন। এখন দেখা যাক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে কী নির্দেশনা দেয়।

পূবালী ব্যাংকের এমডি আবদুল হালিম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সেলের বিষয়টি নতুন নয়। এটা বিভিন্ন ব্যাংকে আগে থেকেই আছে। টাকা ফেরত চাইলে বড় খেলাপিরা আদালতে গিয়ে বসে থাকে। নীতিমালার সার্কুলার হাতে এলে বলা যাবে এটা কতটা কার্যকর হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্যাংকের এমডি যুগান্তরকে বলেন, এসব দিয়ে কিছুই হবে না। বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে। সামাজিকভাবে তাদের বর্জন করতে হবে। খেলাপিদের সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়তে দেয়া যাবে না। বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এককথায় দেশের সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে হবে। তা না হলে জীবনেও এসব টাকা ফেরত আসবে না।

জানা গেছে, দেশের শীর্ষ ১৭৭ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে কঠোর তদারকিতে আনা হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি। ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে, যার পরিমাণ ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে। যা শিগগির একটি সার্কুলার বা নির্দেশনা আকারে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠাবে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, কঠোর তদারকির মূল উদ্দেশ্য হল- দ্রুত খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে এ ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা। বছরের পর বছর আটকে থাকা খেলাপি ঋণ আদায়সহ প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি কঠোর ও গভীর অনুসন্ধানের জন্য ঋণ প্রদানকারী ব্যাংককে আলাদা সেল গঠন করার নির্দেশনা দেয়া হবে। আবার খেলাপি ঋণ তদারকিতে বিদ্যমান ব্যবস্থাও অব্যাহত থাকবে।

জানা গেছে, শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদাভাবে তদারকির জন্য গত মার্চে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ১০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে, সেগুলোর তদারকিতে আরও কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায়, সে বিষয়ে মতামত চেয়ে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে মতামত পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত নীতিমালা করল বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিগগির নীতিমালাটি সার্কুলার আকারে ব্যাংকগুলোতে পাঠানোর পর সব ব্যাংকের প্রতিনিধিরা শীর্ষ খেলাপি প্রতিষ্ঠান তদারকিতে নামবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন পাঠাবে।

নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে সরব আ হ ম মুস্তফা কামাল। শুরুর দিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগামীতে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না, বরং কমবে। তবে গত ডিসেম্বরের তুলনায় মার্চে খেলাপি ঋণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা হয়। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের ঘোষণা দেন তিনি।

অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ১৬ মে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মন্দমানে খেলাপি হওয়া ঋণ মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদহার ধার্য করা হয় ৯ শতাংশ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনার ওপর স্থগিতাদেশ দেন আদালত। পরে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়িয়েছে। সর্বশেষ আপিল বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী সে সুবিধা আগামী দু’মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। অর্থাৎ আগামী দু’মাস পর্যন্ত ঋণখেলাপিরা উল্লিখিত সুবিধা ভোগ করবেন। কিন্তু নতুন কোনো ঋণ পাবেন না।

ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ে নানামুখী আলোচনার মধ্যে ২২ জুন জাতীয় সংসদে শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা।

গত এপ্রিলভিত্তিক সিআইবির (ক্রেডিট ইনফর্মেশন ব্যুরো) প্রতিবেদনের আলোকে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, ১০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান ১৭৭টি। এ তালিকায় রয়েছে দেশের বহুল সমালোচিত হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ক্রিসেন্ট, এননটেক্স, এসএ গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।

গত মার্চ পর্যন্ত সাব স্ট্যান্ডার্ড ১০ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বাদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৬৮ কোটি টাকা। অবলোপন করা খেলাপি ঋণ ছিল ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। এসব খেলাপি ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রয়েছে শীর্ষ ১৭৭ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে।

সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোতে গঠিত আলাদা সেল থেকে শীর্ষ এসব ঋণখেলাপির বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থা, ঋণ আদায়ের আদৌ সম্ভাবনা রয়েছে কি না- এসব যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রকৃত সমস্যার কারণে খেলাপি হলে প্রয়োজনে ওই গ্রাহককে নতুন সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঋণ আদায়ের কোনো সম্ভাবনা না থাকলে খেলাপির সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে আদায়ের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিয়মিত তদারকির ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×