পাঁচ দিনের সম্মেলন শেষ

শুধু আশ্বাস নিয়েই ফিরলেন ডিসিরা

৩১ দফা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ

  উবায়দুল্লাহ বাদল ১৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডিসি সম্মেলন
ফাইল ছবি

বরাবরের মতো এবারও জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মিলেছে শুধু আশ্বাস। অথচ নিজেদের ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোসহ মাঠপর্যায়ের সমস্যা সমাধানে তারা ৩৩৩টি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন।

পাঁচ দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনে এসবের বেশির ভাগই আমলে নেয়া হয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফাসহ প্রায় ৩৫০ নির্দেশনা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে তারা পেয়েছেন। এতে তাদের দায়িত্ব বেড়েছে। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে কাক্সিক্ষত সাড়া না মেলায় অনেকের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক ডিসির সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিসি সম্মেলনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা (ডিসি ও ইউএনও) মাঠ প্রশাসনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। এসব সমস্যা ডিসি সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ মহলে তুলে ধরা হয়। মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো ডিসিরা সুপারিশ ও প্রস্তাব আকারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়ে থাকেন।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রস্তাবগুলো সম্মেলনের কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৫ সালের ডিসি সম্মেলনে প্রস্তাব ছিল ২৫৩টি, ২০১৬ সালে ৩৩৪টি, ২০১৭ সালে ৩৪৯টি এবং ২০১৮ সালে ছিল ৩৪৭টি। আর এ বছর ৩৩৩টি প্রস্তাব করা হয়। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা। সেখানে মাঠ প্রশাসনের নানা সমস্যার বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ২০১৬ সালে ১৯ দফা, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ২৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলতি বছর এ নির্দেশনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ দফায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ডিসি হতাশা ব্যক্ত করে প্রায় অভিন্ন সুরে যুগান্তরকে বলেন, আমরা অনেক আশা করে থাকি ডিসি সম্মেলনে মাঠ প্রশাসনের সমস্যাগুলো তুলে ধরব। আশা করি এগুলোর সমাধানও হবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। সমস্যা সমাধানের কথা বলা হলেও শুধু আশ্বাস মেলে। ডিসিদের ফৌজদারি কার্যবিধির আওতা বাড়ানো, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস পদ্ধতি চালু, ভূমি অফিসের নিরাপত্তা বাড়ানো, ঝুঁকিভাতা চালুসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে একই প্রস্তাব প্রতি বছর নানারূপে ঘুরেফিরে আসে।

জানা গেছে, এবারের সম্মেলনে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য স্বতন্ত্র ব্যাংক গঠন এবং একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, জ্বালানি খরচের সিলিং তুলে দেয়াসহ ঝুঁকিভাতা চালু করার প্রস্তাব করেছিলেন ডিসিরা। এছাড়া ডিসিদের অধীনে সার্বক্ষণিক একটি বিশেষায়িত পুলিশ ফোর্স গঠন, জেলায় কর্মরত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার এখতিয়ার ডিসিদের প্রদান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত করা, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সন্তানদের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) এসিআর ইউএনওদের হাতে দেয়া এবং ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেফতার হলে প্যানেল চেয়ারম্যানকে আর্থিক ক্ষমতা দেয়াসহ নানা প্রস্তাব করা হয়।

এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘মুক্ত আলোচনা’য় কিছু সুযোগ-সুবিধা ও মাঠ প্রশাসনের কিছু বাধা তুলে ধরে এর প্রতিকার চান ডিসিরা। তারা সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধির চাপের বিষয় ও আইনি সুরক্ষা চান।

এর জবাবে তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করাসহ মিলেছে প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা। সম্মেলনের বিভিন্ন কর্ম-অধিবেশনে মাঠপর্যায়ের এসব কর্মকর্তার ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত অধিকাংশ প্রস্তাব নাকচ হয়েছে বলে জানা গেছে।

২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হওয়ার আগে ডিসিদের বিচারিক ক্ষমতা ছিল। আগের ডিসি সম্মেলনগুলোতে ফৌজদারি অপরাধ আমলে নেয়াসহ বিচারিক ক্ষমতা চেয়ে আসছিলেন ডিসিরা। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনাতেও একাধিকবার উঠে এসেছে এ ইস্যু। কিন্তু ‘বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন’ বলে সান্ত্বনা দেয়া হয় ডিসিদের। এবারও ডিসিরা সেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বিষয়টি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা করতে গেলে আইন সংশোধন করতে হবে। তাই এটা হবে না।

ডিসি কার্যালয় ও সার্কিট হাউসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিসিদের অধীনে একটি বিশেষায়িত সার্বক্ষণিক পুলিশ ফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন কক্সবাজার, কুমিল্লা, বাগেরহাট ও চুয়াডাঙ্গার ডিসি। তাদের মতে, ডিসি কার্যালয়ে উন্নয়ন সমন্বয় সভা, আইনশৃঙ্খলা সভাসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ সভা প্রতিনিয়ত হয়। এ কারণে সেখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া দেশি-বিদেশি প্রতিনিধি দলও প্রায় ডিসিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য যান। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যে কোনো সময় ওই ফোর্স ব্যবহার করতে পারবেন। অনেক সময় মোবাইল কোর্টের জন্য পুলিশ চেয়েও পাওয়া যায় না।

ডিসিদের এ প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, বিশেষ পুলিশ ফোর্সের প্রয়োজন নেই। কারণ, পুলিশরা সব সময় ডিসিদের সহযোগিতা করেন। ডিসিদের নির্দেশনায় পুলিশ সব জায়গায় কাজ করছেন। এছাড়া বিজিবি, আনসারসহ আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সব সময় একসঙ্গে বসে কাজ করেন।

এবারের সম্মেলনে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য ‘জনপ্রশাসন ব্যাংক’ নামে আলাদা ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন নোয়াখালীর ডিসি। তিনি বলেন, এতে কর্মকর্তাদের আর্থিক কার‌্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা একটি ব্যাংক করা যায় কিনা সেটা তারা (ডিসি) প্রস্তাব দিয়েছেন। সেটা আমরা বিবেচনা করব। এ ধরনের অধিকাংশ প্রস্তাবে আশ্বাস মিলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বরিশাল বিভাগের একজন ডিসি যুগান্তরকে বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সুযোগ বহাল এবং প্রভাবমুক্ত স্থানীয় প্রশাসন আমাদের প্রধান চাওয়া ছিল। পাশাপাশি নিজেদের সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত কিছু দাবি-দাওয়াও ছিল। এগুলো তেমন আমলেই নেয়া হয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফাসহ কয়েক’শ নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। এতে আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়েছে।

হতাশা প্রকাশ করে চট্টগ্রাম বিভাগের একজন ডিসি বলেন, স্থানীয় কিছু দুষ্ট জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারের উন্নয়ন কাজে বাধার সৃষ্টি করে। অনেক সময় তারা আমাদের নামে মামলা-মোকাদ্দমা পর্যন্ত করে। এখন তাদের সঙ্গেই মিলেমিশে কাজ করতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×