চট্টগ্রামে সমাবেশে মির্জা ফখরুল

জনগণের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই

গণঅভুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে

  চট্টগ্রাম ব্যুরো ২১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফখরুল

বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে ফের জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলে জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সেজন্য আজ যখন বন্যা হচ্ছে, তখন তাদের কাউকেই জনগণের পাশে দেখা যাচ্ছে না। যারা ভোট ডাকাতি করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের মাধ্যমে জোর করে ক্ষমতায় বসে আছে, জনগণের কাছে তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই।

চট্টগ্রাম নগরীর নূর আহমদ সড়কে শনিবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আয়োজিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এখন নির্বাচন বাদ দিয়ে সরকারি ব্যবস্থায় হজ তত্ত্বাবধান করতে গেছেন। গত উপজেলা নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে যায়নি। নির্বাচনে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ভোট দিয়ে লাভ কী, সিল মেরে নিয়ে যায়। তাই নির্বাচনে জনগণের আস্থা নেই।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের এখন জনগণের কাছে যেতে হবে। থানায় থানায় গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে হবে। মানুষের ভোটের অধিকার, বাঁচার অধিকার, গণতন্ত্রের অধিকার ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম করতে হবে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে গণঐক্য সৃষ্টি ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের সরকার, জনগণের পার্লামেন্ট আমরা তৈরি করতে সক্ষম হব। দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী নন, তিনি সারা দেশের গণতন্ত্রকামী স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের নেত্রী। তিনি উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। ছিলেন গৃহবধূ। সেই গৃহবধূ থেকে তার ওপর যখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব এসেছে, তখন তিনি বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে গ্রামগঞ্জে ঘুরে বেড়িয়েছেন চারণ কবির মতো। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে গণতন্ত্রেরর জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারকে পরাজিত করে তিনি সফল হয়েছিলেন। জনগণের ভালোবাসা নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন। কিন্তু ১০-১২ বছর আগে আবার স্বৈরাচারী সরকার এসে এ দেশে একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। এর বিরুদ্ধেও খালেদা জিয়া রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সেজন্য আজ তাকে কারাভোগ করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৬ মাস খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দি। নির্জন একাকিত্বের মধ্যে রয়েছেন। যা কখনোই স্বাধীন দেশের নাগরিকের প্রাপ্য নয়। তার মামলাগুলো কোনো মামলাই নয়। মিথ্যাভাবে সাজানো। শুধু তাকে হয়রানি করার জন্য এসব মামলা দেয়া হয়েছে। ৩৪টি মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। তিনি এখন ঠিকমতো চলতে পারেন না, খেতে পারেন না। অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় আছেন। এই সরকার তার চিকিৎসার জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থা করছে না। তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, যখন দেশের মানুষ চাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হোক, তখন সেখানে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের মধ্যে ঢুকে খুন করা হচ্ছে। দিন-দুপুরে খুন করা হচ্ছে। মা-বোনদের নিরাপত্তা নেই। কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই। মানুষকে নির্যাতন নিপীড়ন করা হচ্ছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা মামলার কারণে বাড়িতে থাকতে পারছেন না। আওয়ামী লীগ জনগণকে ভয় পায় বলে এ অবস্থা সৃষ্টি করেছে। জনগণকে ভয় পায় বলেই ভোট ডাকাতি করে জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পরও তারা জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। রক্ষীবাহিনী গঠন করে মানুষ হত্যা করেছে। সংবিধান তছনছ করে দেয়া হয়েছিল। কায়েম করা হয়েছিল একদলীয় শাসনব্যবস্থা। এখনও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার বেআইনিভাবে করে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, বরকতউল্যাহ বুলু, মো. শাহজাহান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, আবদুল আউয়াল মিন্টু, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভুঁইয়া, জয়নাল আবদিন ফারুক, অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন, গোলাম আকবর খোন্দকার, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়–য়া, এসএম ফজলুল হক, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, জাফরুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ। সমাবেশ সঞ্চালনায় ছিলেন বিএনপি নেতা আবুল হাশেম বক্কর, কামরুল ইসলাম, ইয়াছিন চৌধুরী লিটন।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বেগম জিয়ার মুক্তির দাবি যার কাছে জানাব তিনি ও তার সরকার অবৈধ। তাই এই সরকারের পদত্যাগই নিশ্চিত করতে পারে খালেদার মুক্তি। আইনের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না। খালেদার মুক্তিতে যারা বাধা হবে, তাদের ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে।

ড. খন্দকার মোশাররফ বলেন, এটি গণতন্ত্র হত্যাকারী সরকার। এটি অস্বাভাবিক সরকার। এ সরকার গণতন্ত্রকে বারবার হত্যা করেছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা শতকরা ৮০ শতাংশ ভোট পাবে- এমন তথ্য পাওয়ায় ২৯ ডিসেম্বরই ভোট নিয়ে নিয়েছে।

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, সরকার বারবার চেষ্টা করেছে বিএনপিকে নিচ্ছিন্ন করে দিতে কিন্তু পারেনি, পারবেও না। সরকার নির্বাচনকে ভয় পায়। এ কারণে রাতের অন্ধকারে ব্যালট পেপার চুরি করে ভোট নেয়, সিল মারে। সরকার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে ভয় পায়। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রকে ভালোবাসে।

তিনি রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে বলেন, সরকারের ব্যর্থতার কারণে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হচ্ছে না। সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে এ অবস্থা দাঁড়িয়েছে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা জ্বলেপুড়ে খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছে। সরকার গণতন্ত্রের মা ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে একটি চুরির মামলায় জেলে বন্দি করে রেখেছে। এ দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনবে।

বিএনপির সমাবেশে মানুষের ঢল : নগরীর কাজীর দেউড়ির নাসিমন ভবন দলীয় কার্যালয়ের সামনে নুর আহমদ সড়কে এ সমাবেশ বিপুল জনসমাগম ঘটে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমাবেশস্থলে আসেন ৩টা ১৮ মিনিটে। এর আগেই সমাবেশ কানায় কানায় লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। দুপুর ১২টার পর থেকেই বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে আসতে থাকেন। নগরী ছাড়াও জেলার ১৪ থানা এবং ফেনী, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ বিভাগের অন্যান্য জেলার নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দেন। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণের নেতা-কর্মীরা বাসে করে সমাবেশস্থলে আসেন।

মূল মঞ্চ নগর বিএনপির মহানগর কার্যালয়ের সামনে হলেও জনসমাগম ছড়িয়ে যায় এনায়েত বাজার থেকে কাজীর দেউড়ি মোড় পর্যন্ত। অনেক নেতাকর্মী বেগম ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’ সম্বলিত ব্যানার পেস্টুন ও প্লাকার্ড বহন করতে দেখা যায়। এদিকে সমাবেশকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে সিএমপি। কাজির দেউড়ি এলাকায় বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়াও সাদা পোশাকধারী পুলিশও ছিল সমাবেশের আশপাশে।

সরকার এখন জনআতঙ্কে ভুগছে : এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছেন, বর্তমান ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার এখন জনআতঙ্কে ভুগছে।

মানবতাবিরোধী সব কর্মকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। জনসমাগম দেখলেই জনবিস্ফোরণের আশঙ্কায় শিউরে উঠছে তারা। ভোট ছাড়াই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জবরদখলকারী সরকার তাদের বেসামাল অবস্থাকে সন্ত্রাসী কায়দায় সামাল দেয়ার জন্যই বিএনপির নেতাকর্মীদের কারাগারে আটকে রাখার অপকৌশল গ্রহণ করেছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, সমাবেশে যোগদানের জন্য শুক্রবার ফেনী থেকে চট্টগ্রাম রওনা হওয়ার সময় ফেনী জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক গাজী হাবিব উল্লাহ মানিক, জেলা যুবদলের সভাপতি জাকির হোসেন জসিম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাইদুর রহমান জুয়েল, সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মামুন, দাগনভূঁইয়া উপজেলা যুবদলের সভাপতি হাসানুজ্জামান শাহাদাৎ, ফেনী পৌর যুবদলের সমন্বয়ক জাহিদ হোসেন বাবলু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি শরীফুল ইসলাম এবং ফেনী পৌর যুবদল নেতা কাজী সোহাগকে গ্রেফতার সেই অপকৌশলেরই অংশ।

গণতন্ত্রকে মুক্ত করেই ঘরে ফিরব- দুদু : বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, আন্দোলন শুরু হয়েছে। নেত্রীকে মুক্ত করে, গণতন্ত্রকে মুক্ত করে, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েই আমরা ঘরে ফিরব। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শনিবার প্রতীকী অনশনে তিনি এসব কথা বলেন। এই কর্মসূচির আয়োজন করে জিয়া পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি। দুদু বলেন, ইতিমধ্যে বিএনপি রাস্তায় নেমেছে। বরিশাল ও চট্টগ্রামে সমাবেশ করেছি। ২৫ তারিখে হবে খুলনায়। পর্যায়ক্রমে সব বিভাগে হবে। তারপরে সব জেলায় সমাবেশ করা হবে। কবির মুরাদের সভাপতিত্বে আবদুল্লাহ হিল মাসুদের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল কুদ্দুস, আয়োজক সংগঠনের মহাসচিব ড. মমতাজ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, কেএম রকিবুল ইসলাম রিপন প্রমুখ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×