বাড্ডায় গণপিটুনির শিকার

তুবা জানে না মা নেই

৫০০ জনকে আসামি করে মামলা * সিদ্ধিরগঞ্জে মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে জীবন গেল বাবার

  যুগান্তর রিপোর্ট ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার বাড্ডায় ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো তাসলিমা বেগম রেনুর (৪০) পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার। মেয়ের ভর্তির ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি হত্যার শিকার হন। শনিবার সকালে উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে রেনুকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকার লোকজন। এ ঘটনার পর ওইদিন রাতেই রেনুর ভাগিনা নাসির উদ্দিন হত্যা মামলা করেন। বাড্ডা থানায় করা মামলায় অজ্ঞাত ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদিকে রোববার রেনুর মহাখালীর বাড়িতে চলছিল শোকের মাতম। তার চার বছরের মেয়ে তাসলিম তুবা এখনও জানে না তার মা নেই। কেউ জিজ্ঞেস করলে শুধু বলে, ‘আম্মু নাই।’ এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার দুপুরে রেনুর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর গ্রামে তার লাশ দাফন করা হবে। স্বজনরা লাশ নিয়ে গেছেন। বাড্ডা থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মামলার এজাহারে বলা হয়েছে- বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে হঠাৎ রেনুর ওপর লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ সময় প্রচণ্ড গণপিটুনিতে তিনি প্রাণ হারান। স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, পথচারীসহ স্থানীয় অনেকে এ হত্যার সঙ্গে জড়িত। ওসি রফিকুল বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হবে। তিনি বলেন, স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ, বেকারত্ব ও এক সন্তান দূরে থাকায় রেনু হতাশাগ্রস্ত ছিলেন।

এদিকে এ ঘটনায় উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কয়েকজন অভিভাবককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। সংগ্রহ করা হয়েছে স্কুলে প্রবেশপথসহ আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ। এ ঘটনার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহরাব হোসেন বলেন, তদন্ত চলছে। ইতিমধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ আশপাশের লোকজনের জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। তবে কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। নাসির উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, চার বছরের মেয়ে তাসনিম তুবাকে স্কুলে ভর্তির খোঁজখবর নিতে রেনু ওই স্কুলে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এখনও রেনুর সন্তানরা জানে না তাদের মমতাময়ী মা নেই। তারা জানে না, ছেলেধরা গুজবে এ সমাজের মানুষরাই তাদের মাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। জানা গেছে, লেখাপড়া শেষ করে রেনু চাকরি করেছিলেন আড়ং, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানে, পড়িয়েছিলেন স্কুলেও। বিবাহ বিচ্ছেদের পর ঘরেই তার কাটছিল অধিকাংশ সময়। উচ্চশিক্ষিতা সংগ্রামী একজন নারীর ভাগ্যে এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছে না কেউ। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য গোটা সমাজকেই দায়ী করছে তার পরিবার। সবকিছু ছাপিয়ে দুই সন্তান তাহসিন আল মাহিদ (১১) ও তাসনিম তুবার (৪) ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই চিন্তিত।

যেখানে রেনু প্রাণ হারিয়েছেন সেই স্কুলের পাশের এক বাড়িতে এক সময় স্বামীর সঙ্গে থাকতেন তিনি। দুই বছর আগে স্বামী তসলিম হোসেনের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ছেলে মাহিদকে নিয়ে যান তসলিম হোসেন। নোয়াখালীর চাটখিলে এক ফুপুর কাছে মাহিদ থাকে। আর তুবাকে (৪) নিয়ে রেনু মহাখালী ওয়্যারলেস গেটে জিপি জ-৩৩/৩নং বাসায় ভাড়া থাকতেন।

গণপিটুনির ভিডিওতে দেখা যায়, বাড্ডার অল্প কয়েকজন যুবক রেনুকে মারছে। বাকিরা দেখছে, আবার কেউ কেউ কাছ থেকে তা মোবাইল ফোন সেটে ভিডিও করছে। ৮-১০ মিনিট লাঠিপেটার পর তার ওপর উপর্যুপরি লাথি দেয়া হয়। আধা ঘণ্টারও বেশি সময় গণপিটুনির পর শনিবার সকাল ১০টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তিনি মারা যান।

মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে জীবন গেল বাবার : সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজির আল-আমিন নগরে ছেলেধরা সন্দেহে এলাকাবাসীর গণপিটুনিতে নিহত যুবকের পরিচয় মিলেছে। যুবক সিরাজ একজন বাকপ্রতিবন্ধী। নিজের মেয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারান সিরাজ। একইদিন পাইনাদী নতুন মহল্লায় মানসিক প্রতিবন্ধী শারমিন বেগম ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে আহত হন। সিদ্ধিরগঞ্জের এ দুটি ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৩০০-৪০০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×