ঝুঁকিতে ১৩ জেলার ২২ স্থান

নামছে পানি ভাঙছে নদী

জনগণকে সুরক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ তৎপর-পানিসম্পদ উপমন্ত্রী * বিলীন হতে পারে ২ হাজার ৮৬০ হেক্টর এলাকা * ২৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা

  মুসতাক আহমদ ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির সঙ্গে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হারে ভাঙছে নদী। এতে সড়ক, দোকানপাট, বসতবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার এমনকি হাসপাতাল বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ যে, কোথাও উপজেলা সদর চিরতরে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানের ভুক্তভোগী মানুষের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। নদীভাঙনের পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করে থাকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)। সংস্থাটি ‘নদীভাঙন পূর্বাভাস-২০১৯’ নামে একটি গবেষণা করেছে। তাতে বলা হয়েছে, এ বছর কেবল দেশের প্রধান দুই নদী অববাহিকা ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মার ২২টি স্থান ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। দেশের ১৩ জেলায় এই স্থানগুলো অবস্থিত। জেলাগুলো হল- কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, রাজশাহী, পাবনা, ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব জেলার ২৮ হাজার ৬০০ মানুষ নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সংস্থাটি ২০০৭ সাল থেকে এভাবে পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। গত বছরও সংস্থাটি ২২ স্থানে ভাঙনের পূর্বাভাস দিয়েছিল। এর মধ্যে ১৯ স্থানই ভেঙেছে। পূর্বাভাসের ৮৬ শতাংশই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ৬৫০ এলাকা আছে নদীভাঙনপ্রবণ। এছাড়া ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে। এসবের মধ্যে ৬৫টি টার্গেট করে আমি সরেজমিন পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাজও শুরু করেছি। আজ (রোববার) ২৭তম স্পট পরিদর্শন শেষে ফিরছি।’ তিনি বলেন, নদীভাঙন রোধে আমরা মন্ত্রণালয়ের সবাই মাঠে আছি। শুক্রবার রাতে খবর পাই টাঙ্গাইলে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে। রাতেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসে সুরক্ষার কাজ শুরু করেন। আমি সকালে ছুটে আসি। এভাবে জনগণকে সুরক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ তৎপর আছি।

বর্তমানে দেশের ২৮টি জেলা বন্যাকবলিত। এগুলোর মধ্যে আছে- নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। এছাড়া আছে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার, শেরপুর ও নারায়ণগঞ্জ। এসব জেলার মধ্যে নীলফামারী ও লালমনিরহাট থেকে পানি অনেকটাই নেমে এসেছে। বাকি জেলাগুলোয় বন্যার পানি আছে। উল্লিখিত জেলাগুলো মূলত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং মেঘনা অববাহিকার ওপরের অংশভুক্ত এলাকা। ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি রাজবাড়ীতে পদ্মায় এসে মিলিত হয়। এরপর পদ্মার পানি চাঁদপুরে মেঘনার সঙ্গে মিলে মেঘনার নিুাংশ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যুগান্তর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যার কারণে বাড়তি পানি বন্যার শুরু থেকেই চাঁদপুর হয়ে নামছে বঙ্গোপসাগরের দিকে। চাঁদপুরের পরে মেঘনার অসংখ্য শাখা নদী আছে। ওইসব নদী দিয়ে পানি নামার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ভাঙনপ্রবণ বিভিন্ন এলাকার মধ্যে বরিশালের সন্ধ্যা, সুগন্ধা আর আড়িয়াল খা নদীর কারণে বাবুগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক ভাঙন চলছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে হিজলা-মুলাদী এলাকা। পায়রা, লোহালিয়া, তেঁতুলিয়া নদীর কারণেও পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকা ভাঙছে। বিশেষ করে লোহালিয়া নদীর কারণে দুমকি উপজেলার চর গরবদীতে ভয়াবহ ভাঙন চলছে।

সিইজিআইএসের পূর্বাভাস অবশ্য গঙ্গা-পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকা অঞ্চল নিয়ে। সংস্থাটি বলছে, চলতি বছরে শুধু পদ্মা, যমুনা ও গঙ্গা নদীতেই প্রায় ২ হাজার ৮৬০ হেক্টর এলাকা বিলীন হয়ে যেতে পারে নদীভাঙনের কারণে। যার প্রায় ৫০০ হেক্টর বসতি এলাকা। যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মার যে ২২টি স্থান ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে, তার মধ্যে ১৪টি যমুনা নদীর দুই তীর। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলায় ২৫৪, জামালপুরে ১৬, গাইবান্ধায় ১৬৫, বগুড়ায় ১০৬, সিরাজগঞ্জে ১৯৪, টাঙ্গাইলে ৩৭৬ এবং মানিকগঞ্জে ১৩১ হেক্টর বিলীন হতে পারে। গঙ্গা তীরবর্তী তিন জেলার পাঁচটি স্থান নদীভাঙনের কবলে পড়তে পারে। এর মধ্যে পবনায় ৫০, রাজশাহীর ৪৪ এবং রাজবাড়ীর ৩২৬ হেক্টর এলাকা বিলীন হতে পারে। এছাড়া পদ্মা নদীর তিন জেলার তিন স্থানে এবারও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে ফরিদপুরে ২৬০, শরীয়তপুরে ৩৫২ এবং মাদারীপুরের ৫৮৮ হেক্টর এলাকা চলতি বছরে নদীভাঙনের কবলে পড়তে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, তিন নদীর ৪২০ মিটার নদী রক্ষাবাঁধ এবং আট হাজার মিটার সড়কও এই ভাঙনের শঙ্কায় আছে। এছাড়া এই এলাকার ৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঁচটি হাটবাজার, ৩৩টি ধর্মীয় উপাসনালয়, একটি এনজিও এবং পাঁচটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রও এই ভাঙনঝুঁকিতে আছে।

জানা গেছে, পূর্বাভাসকৃত উল্লিখিত স্থানগুলোর রাজশাহী বিভাগ বাদে বাকিগুলো বন্যাকবলিত। এগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম ও বগুড়ায় এরই মধ্যে ভাঙন শুরু হয়েছে।

সিইজিআইএসের জুনিয়র স্পেশালিস্ট সুদীপ্ত কুমার হোড় বলেন, স্যাটেলাইটে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর গবেষণা করে এ ২২ স্থান নদীভাঙন ঝুঁকির স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা ভাঙনের তীব্রতা ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে মানুষকে সতর্ক করার কাজ করে থাকেন। পূর্বাভাসকৃত স্থানগুলোর একটি শরীয়তপুরের নড়িয়া। গতবছর নড়িয়ার কেদারপুর এবং মুক্তারের চর এলাকায় পদ্মা নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। ওই পয়েন্টে গতবছর এক কিলোমিটার এলাকা পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। উপজেলা সদরে অবস্থিত একমাত্র হাসপাতালটির নতুন ভবন নদীতে চলে গেছে। পুরনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার কাজ চলছে ডাক্তারদের কোয়ার্টারে।

ওই এলাকার বাসিন্দা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রাজেশ মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, এ বছর এখন পর্যন্ত ভাঙন শুরু হয়নি। পানি নামা শুরু করলে কী ঘটবে, সেটা বলা যাচ্ছে না। তবে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীমের উদ্যোগে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জিও ব্যাগ ফেলে সুরক্ষা তৈরির কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত নদীভাঙন শুরু হয় বন্যার পর। এখন অনেক এলাকা পানির নিচে থাকায় ভাঙনের বিষয়টি বোঝা যাবে না। বন্যার কারণে এখন মাটি নরম হবে। এরপর যখন পানি ব্যাপকভাবে নামতে থাকবে, তখন তীব্র ভাঙন শুরু হবে। এই ভাঙন রোধে সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×