মুদ্রানীতি ঘোষণা বুধবার: অর্থের চরম টানাটানি

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ বছরে সর্বনিম্ন

  হামিদ বিশ্বাস ২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমেছে। জুন শেষে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা গত ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৩ সালের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হয়েছিল।

চরম তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংকের কাছে ঋণ দেয়ার মতো টাকা না থাকায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থার মধ্যেই বুধবার নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

জানতে চাইলে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে। এমন এক প্রেক্ষাপটে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হচ্ছে যখন বেসরকারি খাতে অর্থের চরম টানাটানি চলছে।

তিনি বলেন, আশানুরূপ আমানত না পাওয়ায় ব্যাংকগুলো সেভাবে ঋণ বাড়াতে পারছে না। কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বর্তমানের এ ঋণ প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে লক্ষ্য বাড়ানোর সঙ্গে কিভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে সে দিকনির্দেশনাও দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু অর্জিত হয়েছে ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ।

আর ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য থাকলেও অর্জিত হয় ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।

জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মোট ঋণ গেছে ১০ লাখ ৯ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। আগের বছরের জুন শেষে যা ছিল ৯ লাখ ৭ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। সাম্প্র্রতিক কোনো বছরে এত কম হারে ঋণ বাড়েনি।

এর আগে পুঁজিবাজারে ব্যাপক ধসের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাপক কড়াকড়ির পর ২০১৩ সালে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে আসে। ওই বছরের জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। যদিও ২০১২ সালের জুন শেষে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।

আর ২০১১ সালের জুন শেষে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এরপর আর কোনো বছর বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ ছাড়ায়নি।

এ বিষয়ে কয়েকজন ব্যাংকার বলেন, ব্যাপক তারল্য সংকটের কারণে আশানুরূপভাবে ঋণ বাড়াতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, উচ্চ সুদের কারণে সঞ্চয়পত্রে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ, নামে-বেনামে বিপুল অংকের ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত না দেয়াসহ নানা কারণে তারল্য সংকটে পড়েছে ব্যাংকগুলো। মেয়াদি আমানতে ১০-১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়েও বেশিরভাগ ব্যাংক টাকা পাচ্ছে না।

এছাড়া সেপ্টেম্বরের মধ্যে ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) নতুন সীমায় নামিয়ে আনার একটি চাপ রয়েছে। এসব কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ হারে বাড়ছে না।

তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, গুণগতমানের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বার্থে বেসরকারি ঋণে গতি আনার বিকল্প নেই। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এবারের মুদ্রানীতি অনেক চ্যালেঞ্জিং।

মোটা দাগে মুদ্রা বিনিময় হারে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। আর ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগে আরও মনোযোগ দিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হতে পারে।

এমন অবস্থার মধ্যেই বুধবার ঘোষণা করা হচ্ছে নতুন মুদ্রানীতি। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. আখতারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, একটি খসড়া মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। আরও একটি বৈঠক করে চূড়ান্ত করা হবে। এর বাইরে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

মুদ্রানীতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বল্প মেয়াদে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের পাশাপাশি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দাভাব, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য সংঘাতজনিত অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সংকুচিত অর্থ ব্যবস্থা, বিলম্বিত ব্রেক্সিট পরিস্থিতির সঙ্গে দেশীয় অর্থবাজারে ক্রমবর্ধমান শ্রেণিকৃত ঋণের হার এবং কিছুটা সংকুচিত উদ্বৃত্ত তারল্য পরিস্থিতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এ ঊর্ধ্বগতির ধারা ব্যাহত করতে পারে। এমন বাস্তবতা মাথায় রেখেই নতুন মুদ্রানীতি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য ঋণ প্রবৃদ্ধির একটি আগাম ধারণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এ লক্ষ্যে প্রতি ৬ মাসের আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি প্রাক্কলন করা হয়। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮.২ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫.৫ শতাংশ।

সূত্র জানিয়েছে, নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ চলতি মুদ্রানীতির চেয়ে বেশ খানিকটা কমিয়ে ধরা হচ্ছে। অর্থাৎ আরও সংকোচনমুখী হচ্ছে নতুন মুদ্রানীতি। যদিও তা চলতি মুদ্রানীতির প্রকৃত অর্জনের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রকৃত অর্জন থেকে কিছুটা বাড়িয়ে ধরা হবে। তবে চলতি মুদ্রানীতি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে তা অনেকটাই কমবে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত