‘গ্যাং কালচারে’ ভয়ংকর হয়ে উঠছে কুমিল্লা

নগরীতে ‘ঈগল স্টার’, ‘আরজিএস’সহ অন্তত ১০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় * দুই বছরে নিহত অন্তত ৬ জন

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবুল খায়ের, কুমিল্লা ব্যুরো

কুমিল্লা ম্যাপ

‘গ্যাং কালচারের’ ধাক্কায় কাবু কুমিল্লা। তথাকথিত রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ ছত্রছায়ায় ভয়ংকর হয়ে উঠছে কুমিল্লার স্কুল না পেরুনো কিশোরদের বড় একটি অংশ। তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আধিপত্য নিয়ে খুনের ঘটনাও ঘটছে।

রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিংয়ে যাওয়ার সুবাদে তথাকথিত বড় ভাইদের আনুকূল্যও পাচ্ছে এরা। ‘ঈগল স্টার’, ‘আরজিএস’সহ অন্তত ১০টি গ্যাং দাবড়ে বেড়াচ্ছে কুমিল্লা। শুরুতে হর্ন বাজিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটে বেড়ানো, রাস্তার ধারে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও স্থানীয় ছোটখাটো সমস্যায় যুক্ত করার মধ্যেই তাদের কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা জড়িয়ে পড়ছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, প্রকাশ্যে ধূমপান, গাঁজা সেবনসহ খুনখারাবির মতো ঘটনায়। সংঘাত-হানাহানিও রয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ‘ঈগল গ্যাং’য়ের সদস্য সংখ্যা এখন হাজার ছুঁই ছুঁই। এ ছাড়া ‘বার্থ টু ফ্লাইং’ (জন্মেছি ওড়ার জন্য) স্লোগান নিয়ে আরেকটি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। দুই বছরে অন্তত ৬ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছে তাদের হাতে, আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। তবে স্থানীয় পুলিশ ‘গ্যাং কালচার’ দমনে সম্প্রতি তৎপর রয়েছে। জেলায় ১৭টি উপজেলায়ই কিশোররা অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

কিশোর অপরাধ নিয়ে কথা হয় কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংগুলো দমনে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা নগরীর বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালিয়ে সব ধরনের চাকু ছুরি উদ্ধার করে এসব পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করছি। তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে অভিভাবকদের আগে সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে মিশছে নিয়মিত স্কুল-কলেজে যায় কিনা সে বিষয়ে তদারকি করতে হবে।

কুমিল্লা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সাদিক হোসেন মামুন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর অপরাধ আমাদের কুমিল্লা শহরকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে ঈগল গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে আদিল খুনের ঘটনার পর থেকে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

কিশোর অপরাধ দমন করতে না পারলে নগরীসহ জেলার শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। কুমিল্লা নগরীতে অন্তত ১০টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের খোঁজ পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে- ব্লাক স্টার, ডার্ক, ঈগল স্টার, আরজিএস, র‌্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমএইচ, মডার্ন ও রকস্টার ডিসকো। প্রতিটি গ্রুপে দলনেতা রয়েছে। তারা ফেসবুকেও সক্রিয়।

এসব গ্যাংয়ের মধ্যে ‘ঈগল স্টার’ এবং ‘আরজিএস’ সবচেয়ে ভয়ংকর। এই দুই গ্রুপ আবার নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়িয়ে পড়ার রেকর্ডও রয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও আছে। এরা গ্রুপ ভারি করার জন্য স্কুলছাত্রদের দলে ভেড়ানোর জন্য চাপ দেয়। এরকম কয়েকজন ছাত্র জানায়, গ্রুপে যোগ না দিলে মোবাইল কেড়ে নেয়া, টিফিনের টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়া, টিফিন খেয়ে ফেলা এমনকি শারীরিক নির্যাতনও করে।

তাদের স্কুলব্যাগে বই-খাতার সঙ্গে থাকে ধারালো ছুরি, গাঁজা ও সিগারেট। চায়ের দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের সড়ক, শপিংমলের আশপাশে এদের প্রায়ই ঘোরাফেরা করা, মেয়ে দেখলেই নানা অঙ্গভঙ্গি করার দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। কুমিল্লা মডার্ন হাইস্কুল, জিলা স্কুল, কালেক্টরেট স্কুল ও হাইস্কুল, অ্যাথনিকাসহ নগরীর আরও কিছু স্কুলের ছাত্র গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়েছে। কোনো তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে হুটহাট যে কাউকে আক্রমণ করে বসাই তাদের বড় সমস্যা।

কমিল্লার মোগলটুলি এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ঈগল গ্যাং। কুমিল্লা জিলা স্কুল ও কুমিল্লা হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির ছাত্ররাই এই গ্যাংয়ের সদস্য। আদর, অনিক, জাহিদ, খাইরুল নামের ৪ কিশোর এই গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। গত ১৩ মে নগরীর মোগলটুলি এলাকায় আধিপত্য নিয়ে তাদের হাতে খুন হয় আজনাইন আদিল নামে এক শিক্ষার্থী। মামলা হলে ওই গ্যাংয়ের ৪ সদস্য গ্রেফতার হলে তারা কিছুটা চাপে পড়ে। সম্প্রতি এই গ্রুপের হাল ধরেছে সাদী এবং টিটুসহ প্রায় ৮-১০ জন। এরা ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

কুমিল্লা মডার্ন হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা ‘আরজিএস’ নামের গ্রুপ সৃষ্টি করে নগরীর নজরুল এভিনিউ, তালপুকুরপাড় এলাকা, বাগিচাগাঁও, কান্দিরপাড়, ঝাউতলা, ঠাকুরপাড়ায় নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির করার কাজে নিয়োজিত। এই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিল কিশোর অপরাধী আমিন, সৌরভ হোসেন পল্টু, তুষার আহাম্মেদ রিয়াদসহ বেশ কয়েকজন। গত ২১ এপ্রিল শবেবরাতের রাতে এই গ্রুপের হাতে খুন হয় মডার্ন স্কুলের ছাত্র মুমতাহিন হাসান মিরন।

ওই মামলায় গ্রুপের সামনের সারির তিনজন সদস্য গ্রেফতার হওয়ার পর নেতৃত্ব দিচ্ছে নিপু, পিয়াস, আকাশসহ বেশ কয়েকজন। একই দিন ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জের ধরে নগরীর নূরপুর এলাকায় এই গ্রুপের সদস্য ইরফান, হৃদয়সহ কয়েকজন মিলে শাহজাহান নামে এক অটোরিকশাচালককে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে ২৩ এপ্রিল সে মারা যায়।

কথা হয় সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি বদরুল হুদা জেনুর সঙ্গে। তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। যে কোনো মূল্যে কুমিল্লাকে কিশোর অপরাধমুক্ত করতে হবে। না হলে এসব কিশোর অপরাধীরা আস্তে আস্তে ভয়ংকর অপরাধীতে রূপ নেবে। গত ১০ মার্চ নগরীর দিশাবন্দ এলাকায় ক্রিকেট খেলা নিয়ে তর্কবিতর্কের জেরে সাজ্জাতুল ইসলাম অনিক (১৬) নামে এক ছাত্রকে নগরীর চর্থা এলাকার কিছু কিশোর ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।

অনিকের মা মোর্শেদা বেগম বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই তারা আমার ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করে আমার বুক খালি করেছে, আমি ছেলে হারানোর বেদনায় কাতরাচ্ছি, আমি এ শোক কিছুতেই সইতে পারছি না। এর আগে ২০১৮ সালের ১১ জুলাই প্রেম নিয়ে বিরোধের জেরে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে কুমিল্লা অজিতগুহ কলেজের ছাত্র অন্তুকে নগরীর ধর্মসাগরপাড়ে খুন করে নগরীর কিশোর অপরাধীরা।

২০১৭ সালের ২৭ মে কিশোর গ্যাং চক্রের লিডার শাফায়েত উল্লাহ শৈকত, অর্পণ আশ্চার্য দিপনসহ একদল কিশোর অপরাধী নগরীর নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকায় ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটির বিবিএ’র ছাত্র শাহজাদা ইসলামকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। শাহজাদার বাবা শহিদ মিয়া বলেন, বিনা কারণে আমার ছেলেকে হত্যা করে শৈকতসহ তার গ্রুপের ছেলেরা। তিনি বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা করে তারা নিজেদের বড় নেতা হিসেবে আবির্ভাব করতে চেয়েছিল। পুলিশ যেন অতিদ্রুত কুমিল্লা শহরের কিশোর অপরাধীদের দমন করে সেই দাবি শাহজাদার বাবার।

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আনোয়ারুল হক বলেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, কোনোভাবেই নগরীতে এদের অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাতে দেয়া হবে না। আমরা যে কোনো মূল্যে কুমিল্লা নগরীকে অপরাধমুক্ত রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।