কোরবানির চামড়া ক্রয়: পুরনো সব খেলাপি নতুন ঋণ নিয়মিত

এবার চার ব্যাংক দেবে ৫৫৫ কোটি টাকা

  হামিদ বিশ্বাস ০৮ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এবার চার ব্যাংক দেবে ৫৫৫ কোটি টাকা

খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত চামড়া খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংক থেকে চামড়া খাতে বিতরণ করা পুরনো ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।

এ খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। যার বেশির ভাগই দীর্ঘদিনের পুরনো ঋণ। বাকি ৬৬৭ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত রয়েছে।

এগুলো চার ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গত কয়েক বছরে বিতরণ করে। এর মধ্যে একটি অংশ আদায় হয়েছে। আর কিছু ঋণ বকেয়া থাকলেও তা গ্রাহক-ব্যাংকার সম্পর্কের ভিত্তিতে সমন্বয় করে আবার নতুন ঋণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এবার কোরবানির চামড়া ক্রয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ঋণ দেবে প্রায় ৫৫৫ কোটি টাকা।

চামড়া খাতে সরকারি সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করে।

এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে উত্তরা, ন্যাশনালসহ কয়েকটি ব্যাংক কিছু ঋণ বিতরণ করে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর, নানা অব্যবস্থাপনা, ট্যানারি নেতাদের অতিমাত্রায় ঋণ গ্রহণ, যাচাই-বাছাই না করে ঋণ অনুমোদন ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার কারণে বিতরণকৃত ঋণের একটি বড় অংশ খেলাপি হয়ে গেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক গত ৬ বছরে চামড়া শিল্পে ঋণ বিতরণ করেছে প্রায় ৮১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ও নন ফান্ডেড মিলে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ঋণ গেছে নিয়মিত চামড়া শিল্পে।

বাকি ৭৩৩ কোটি টাকা গেছে কোরবানির চামড়া ক্রয়ে। এসব ঋণ ১০ প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে প্রায় ৫৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভুলুয়া ট্যানারি, আমিন ট্যানারি, কালাম ব্রাদার্স ট্যানারি এবং মোহাম্মদিয়া লেদারের কিছু টাকা বকেয়া থাকলেও লেনদেন নিয়মিত রয়েছে।

কিন্তু বাকি ৬ প্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত দিচ্ছে না। তাদের দেয়া ঋণ পুরোটাই এখন কু-ঋণে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে ভারসেজ সুজের কাছে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা, গ্রেট ইস্টার্ন ট্যানারির কাছে ১ কোটি টাকা, এক্সিলেন্ট ফুটওয়্যারের কাছে ১০ কোটি টাকা, দেশমা সু ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে সাড়ে ২৩ কোটি, এসএনজেট ফুটওয়্যারের কাছে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা এবং আনান ফুটওয়্যারের কাছে সাড়ে ৭ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোনালী ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, তিনটি প্রতিষ্ঠান ভালো হওয়ায় তাদের এবারও নতুন করে ৭০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হবে। এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বকেয়া টাকা আদায়ে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জনতা ব্যাংক এ পর্যন্ত চামড়া শিল্পে ১ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ৩২টি প্রতিষ্ঠানকে এসব ঋণ দেয়া হয়েছে। পুরনো ঋণের বেশির ভাগই খেলাপি। গত বছর ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছিল ৩০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বকেয়া রয়েছে ২৫৬ কোটি টাকা। এবার ভালো দেখে ৫ প্রতিষ্ঠানকে ২০০ কোটি ঋণ দেবে জনতা ব্যাংক।

জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের এমডি আবদুছ ছালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, যারা খেলাপি হয়েছেন, তারা খেলাপি থেকে বের হওয়ার নতুন সার্কুলারের সুবিধা পাবেন। ইতিমধ্যে অনেকে আবেদনও করেছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংক এ পর্যন্ত চামড়া শিল্পে ঋণ বিতরণ করেছে ৬৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।

ব্যাংকটি ২০১৩ সালে ৮ প্রতিষ্ঠানকে ৯০ কোটি ৮৯ লাখ, ২০১৪ সালে ৪ প্রতিষ্ঠানকে ১২৭ কোটি ৫০ লাখ ও ২০১৫ সালে ৩ প্রতিষ্ঠানকে ১৩০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।

২০১৬ সালে ব্যাংকটি এ খাতে ৬০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। এসব ঋণের বেশিরভাগই অনাদায়ী। আদায় পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ২০১৭ সালে এ খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেও শেষ পর্যন্ত কোনো ঋণ দেয়নি ব্যাংকটি। তবে ২০১৮ সালে ১০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। এবার দেবে ১৩০ কোটি টাকা।

অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যেসব চামড়া ব্যবসায়ী আগের ঋণ পুরোপুরি শোধ করেছেন, শুধু তাদেরই ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানটিকে শতভাগ উৎপাদনে থাকতে হবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রূপালী ব্যাংক ২০১৭ সাল পর্যন্ত চামড়া শিল্পে ঋণ বিতরণ করেছে ৭৯৩ কোটি টাকা। এছাড়া পুরনো খেলাপি আছে ১৩৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে হোসেন ব্রাদার্স ট্যানারির কাছে ২৭ কোটি ২০ লাখ, মাইজদী ট্যানারির কাছে ২৪ কোটি, এফকে লেদারের কাছে ৫১ কোটি ও মিজান ট্রেডার্সের কাছে ৩২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।

এসব ঋণ ১৯৮৫ সাল থেকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। তবে ২০১৭ সালে কয়েকটি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানকে মন্দের ভালো বিবেচনায় নিয়ে ১৪৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সামিনা ট্যানারিকে ৫৫ কোটি, বেঙ্গল লেদার ৬৫ কোটি ও এইচএনএইচ লেদার অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজকে দেয়া হয়েছে ১৫ কোটি টাকা।

বাকি অর্থ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে। এসব ঋণ নিয়মিত থাকায় গত বছর ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। এবার দেয়া হবে ১৫৫ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, চামড়া খাতে যেসব ঋণ আদায় হচ্ছে না, খেলাপি হয়ে গেছে; এগুলো অনেক পুরনো ঋণ।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে খেলাপি ১৩৫ কোটি টাকা আদায়ে মামলা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেয়া ঋণগুলো নিয়মিত আছে। তাই এবার চামড়া খাতে ১৫৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : চামড়া ব্যবসায় সিন্ডিকেট

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×