কিশোর গ্যাং: সিলেটে তুচ্ছ ঘটনায় সংঘাতে কিশোররা

৭ মাসে বন্ধুদের হাতেই ৫ কিশোর খুন সক্রিয় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং

  ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট ব্যুরো ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোর গ্যাং

সিলেটের কিশোররা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় কিছু দিন আগের একটি ঘটনা থেকেই। জুতা চুরির ওই ঘটনায় সহপাঠীকে নির্মমভাবে খুন করা হয়।

সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) শিক্ষার্থী তানভীর হোসেন তুহিন খুনের তদন্তে নেমে কিশোর অপরাধের ভয়ংকর কাহিনী বের হয়ে আসে। মে মাসে নাম নিয়ে কটূক্তির জেরে বন্ধুদের ছুরিকাঘাতে নিহত হয় আব্দুল জব্বার জামাল নামের এক কিশোর।

এর ঠিক দু’মাস আগে নগরীর হাউসিং এস্টেট এলাকায় একদল কিশোর বন্ধুকে মারধরের প্রতিশোধ নিতে খুন করা হয় ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র শাহেদ আহমদকে। অর্থাৎ তুচ্ছ ঘটনায় কিশোররা খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে।

কিছুদিন আগেও এসব কিশোর কিছু কিছু স্পটে আড্ডা দেয়া এবং বড়জোড় ইভটিজিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে এরা সংঘাত হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে। চলতি বছরই নগর এবং নগরীর বাইরে কিশোরদের হাতে ৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশের তদন্তেও সবগুলো হত্যাকাণ্ডের ধরন প্রায় একই দেখা গেছে। কারণও প্রায় অভিন্ন। অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী ঘরের এই সন্তানরা সংঘবদ্ধ হয়ে গ্যাং সৃষ্টি করায় অপরাধের ধরন যেমন পাল্টেছে, তেমনি বেড়েছে অপরাধও।

এ পর্যন্ত সিলেটেই অন্তত অর্ধশত গ্যাং গড়ে উঠেছে। এরা নগরী ও নগরীর বাইরে নির্দিষ্ট এলাকায় সক্রিয়। এদের মধ্যে যারা ‘বড় ভাইদের’ আনুকূল্য পাচ্ছেন তারাই হয়ে উঠছেন ভয়ংকর। জড়িয়ে পড়ছেন খুন-খারাবিতে।

নগরী ও শহরতলীর একাধিক স্পট ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর প্রায় সব এলাকাতেই ‘বড় ভাইদের’ দাপুটে পদচারণা। মোড়ে মোড়ে অন্তত ১০-২০ জনের জটলা। কোথাও কোথাও ওই আড্ডার সংখ্যা ৫০ জন ছাড়িয়ে যায়। নানা অপরাধ করে কিশোরদেরকে এদের কাছে ছুটে আসতে দেখা যায়।

১৩ মার্চ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার দরাকুল এলাকায় বন্ধুরা বাড়ি থেকে ডেকে নেয় বদরুল আমিনকে। পরদিন সকালে গলাকাটা লাশ মিলে তার। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

১৫ মার্চ ওসমানীনগর উপজেলার মান্দারুকা গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান মছু (১৫) নামের এক কিশোরের লাশ স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে উদ্ধার করা হয়। আগের দিন সন্ধ্যায় তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল তারই তিন বন্ধু। পরে পুলিশ মো. জীবন নামে মছু’র এক বন্ধুকে গ্রেফতার করে। তিন বন্ধু মিলে মছুকে হত্যার কথা আদালতে স্বীকারও করেছে জীবন।

এ নিয়ে কথা হয় সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার জেদান আল-মুসার সঙ্গে। তিনি বলেছেন, এই কিশোরদের অনেকের বিরুদ্ধে খুনোখুনিসহ অনেক অপরাধের মামলা রয়েছে। তাদের এসব অপরাধের বিষয়টি নজরদারি করা হচ্ছে। অপরাধ হলে অবশ্যই অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসব। তবে এরা যাতে অপরাধ করতে না পারে সে জন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রচলিত আইনে এদের ব্যাপারে বলা আছে। এই আইন প্রয়োগ হচ্ছে।

তবে এই পুলিশ কর্মকর্তা অভিভাবকদের সচেতনতার ওপরই বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি বলেছেন, অভিভাবকরা সচেতন হলে শিশুদের বাজে আড্ডা বন্ধ হয়ে যাবে। তারা অপরাধে জড়িত হতে পারবে না। এরপরও যদি কেউ সোজা পথে না আসে তাহলে সে ক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো গতি থাকবে না।

কিশোর অপরাধের আরেকটি ঘটনা তুলে ধরা হলেই কিশোরদের বখে যাওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠেবে। ২৭ জুলাই সকালে ফেঞ্চুগঞ্জের ফরিজা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে একজন ছাত্রী একাই হেঁটে স্কুলে যাচ্ছিল।

বিদ্যালয়ের সামনে আল-আমিন নামের এক বখাটে কিশোর তাকে দেখে অশ্লীল সব অঙ্গভঙ্গি করে। নানা রকম অশ্লীল কথাবার্তা বলার সঙ্গে মুঠোফোনে মেয়েটির ছবিও তুলে রাখে।

মেয়েটি বিদ্যালয়ের ফটকে কর্তব্যরত পুলিশকে ঘটনা জানালে আল-আমিনকে আটক করা হয়। তার মুঠোফোনে ওই ছাত্রীর ছবি পাওয়ায় তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন ইউএনও জসীম উদ্দিন।

১৫ এপ্রিল দুপুরে ডিবি পুলিশ ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত নাইভ-চাকুসহ রফিকুল হাসান, আ. রাজ্জাক সাকিব, তানবির রহমান, মো. শাহরিয়ার ইসলামকে নগরীর লামাবাজার থেকে আটক করে। এরা সবাই এসএসসি পরীক্ষার্থী। পরে তাদের অভিভাবকরা মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।

কিশোরদের অত্যাচারের একটি ধরন উঠে এসেছে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ফারিয়া রহমানের কথায়ও। তিনি যুগান্তরকে বলেন, কলেজের সামনের রাস্তাটি একমুখী হওয়ায় চৌহাট্টা পয়েন্ট থেকে হেঁটে কলেজে আসতে হয়। এই রাস্তাটুকুতে প্রায়ই বখাটে কিশোরদের উৎপাত সহ্য করতে হয়।

অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে রিকশা ডেকে দেয়া, ভাড়া দেয়ার চেষ্টা থেকে শুরু করে প্রকাশ্যে প্রেমের প্রস্তাবে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। চৌহাট্টা পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ বক্স থাকলেও তারা বেশিরভাগ সময় যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকার সুযোগ নেয় এই বখাটেরা।

এই কলেজের সামনে থেকে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের তুলে নেয়ার চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে।

আম্বরখানা গার্লস স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যুগান্তরকে জানান, স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে অশালীন উক্তি, শিস দেয়া, গান গাওয়া ও প্রেম নিবেদন নিত্যকার ঘটনা। অনেক সময় প্রকাশ্যে বখাটে কিশোররা মেয়েদের পিছু নিলেও কেউ প্রতিবাদ পর্যন্ত করে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সুশাসন এবং স্বচ্ছতা না থাকার কারণে এমনটি ঘটছে। বিচারহীনতা এখানে সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না। এসব কারণে অপরাধ প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে। তারা আরও বড় অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি মনে করেন, যথাযথভাবে আইন প্রয়োগ হলে সব অপরাধ কমে আসবে। সাধারণ মানুষ মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×