কিশোর গ্যাং

গাজীপুরে আধিপত্যের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হ্রাস ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ঘাটতির প্রভাব এটি -অধ্যক্ষ মুকুল কুমার

  শাহ সামসুল হক রিপন, গাজীপুর ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুরে আধিপত্যের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা
র‌্যাবের হাতে আটক একটি কিশোর গ্যাং ফাইল ছবি

গাজীপুর মেট্রোপলিটন সদর, বাসন, গাছা, কোনাবাড়ি, কাশিমপুর, টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম থানা এলাকায় ভয়ঙ্কর কিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।

বিচিত্র সব নামে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা হত্যাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ‘ডিসকো’ ও ‘নাইন স্টার’ গ্রুপের তৎপরতার কথা অনেকেরই জানা। আধিপত্যের জেরে নিজেরাও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েছে। গত বছর ৬ জানুয়ারি উত্তরায় ‘ডিসকো’ ও ‘নাইন স্টার’ গ্রুপের দ্বন্দ্বে ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৯ম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির প্রকাশ্যে খুন হওয়ার পর গাজীপুরের টঙ্গীতেও পর পর দুটি খুনের ঘটনা ঘটে। ছোটখাটো বিষয় নিয়েই এরা বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে।

গত ৭ জুলাই গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী পূর্ব থানাধীন বিসিক পাগারের ফকির মার্কেট এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ফিউচার ম্যাপ স্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্র শুভ আহাম্মেদকে (১৬) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান শুভকে খুন করার পর তার পিতার করা মামলায় গ্রেফতার ৪ জনই কিশোর। এরা হচ্ছেন এলাকার মৃদুল হাসান পাপ্পু (১৭), সাব্বির আহাম্মেদ (১৬), রাব্বু হোসেন রিয়াদ (১৬) ও নূর মোহাম্মদ রনি (১৬)। আদালতে এরা হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।

কথা হয় র‌্যাব-১ এর পোড়াবাড়ি ক্যাম্প কমান্ডার লে. কমান্ডার আবদুল্লাহ আল-মামুনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, টঙ্গী ও পার্শ্ববর্তী রাজধানীর উত্তরায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে। এরা বিভিন্ন নামে পরিচিত। অভিভাবকের অবহেলা ও পশ্চিমা কালচারের আদলে এসব গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। তিনি বলেন, শুভ হত্যার একদিন আগে ভিকটিমের সঙ্গে স্থানীয় নবগঠিত মৃদুল হাসান পাপ্পুর গ্যাং গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে ঝগড়া ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল। এরই জেরে শুভকে হত্যা করা হয়।

এই ঘটনার কয়েকদিন পর ২৪ জুলাই একই থানার কাজী পাড়া চন্দ্রিমা এলাকায় বাসায় ঢুকে তৌফিজুল ইসলাম মুন্না (১৫) নামে এক স্কুল শিক্ষার্থীকে খুন করা হয়।

টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন জানান, মুন্না রাজধানীর মগবাজারের বিএফ শাহিন একাডেমির ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। মুন্নার মা ছোট মেয়েকে স্কুল থেকে বাসায় এসে দেখেন খাটে মুন্নার রক্তাক্ত নিথর মরদেহ পড়ে আছে। অপরাধীদের এখনও শনাক্ত করা যায়নি। তবে পুলিশের সন্দেহ কিশোর গ্যাং গ্রুপের কেউ হয়তো এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন হাড়িনাল ভোট কেন্দ্রে খুন হয় কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও যুবলীগ নেতা লিয়াকত হোসেন। ওই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক রং দেয়ার চেষ্টা করা হলেও আসলে দুই গ্যাং গ্রুপের পূর্বশত্রুতার জের বলে জানা গেছে। প্রায় একই সময়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের হাজীবাগ এলাকার স্থানীয় সামসুল হকের ছেলে বাবুকে (১৫) একটি বিয়েবাড়ির পাশে ডেকে নিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

একই এলাকায় কাচের বোতল ভেঙে স্থানীয় কলিম উদ্দিনের পেটে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এর আগে কালু কলিম উদ্দিনের মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় মামলাও করে কলিম উদ্দিন। ওই মামলা তুলে নিতেই কালু কলিম উদ্দিনের পেটে ভাঙা বোতল ঢুকিয়ে দেয়া হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় একটি গ্যাং গ্রুপের আস্তানা হচ্ছে হাজীবাগের জনৈক আলম সাহেবের জঙ্গলে। ওই জঙ্গলে তারা পরস্পরে ল্যাজার লাইটের ইশারায় রাতে চলাফেরা করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টঙ্গীর ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, টঙ্গী সরকারি কলেজ, সফিউদ্দিন একাডেমি অ্যান্ড কলেজ, কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ, চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয়, রানী বিলাস মণি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, হাড়িনাল উচ্চ বিদ্যালয়সহ শহরকেন্দ্রিক কলেজ ও স্কুলগুলোতে কিশোর গ্যাং কালচার ঢুকে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষার্থী একাধিক ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ খুলে অপতৎপরতা চালাচ্ছে।

মেসেঞ্জার গ্রুপে তারা বিভিন্ন ধরনের ধারালো অস্ত্র কেনা বা সংগ্রহে বার্তা আদান-প্রদান করছে। গ্রুপ সদস্যরা রাজনৈতিক বড় ভাইদের সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় ও স্থান নিয়ে নিজেদের মেসেঞ্জারে বার্তা আদান-প্রদান করে থাকে। এছাড়া ফেজবুক আইডিতে তারা নিজেদের মাফিয়া ডন, ব্যাডবয়, তোর বাপ, খারাপ ছেলে, ইবলিশ শয়তান, লিপস্টিক রিমোভারসহ অসংখ্য অ্যাকশন মুভির ভিলেন চরিত্র ও ছাপার অযোগ্য ভাষায় উপস্থাপন করছে।

রানী বিলাস মণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের উপরের ক্লাসের কয়েকটি সক্রিয় মেসেঞ্জার গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের পারস্পরিক আলাপচারিতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে পারলে যে কোনো ব্যক্তিরই গা শিউড়ে উঠবে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. শরিফুর রহমান বলেন, গাজীপুরে নাম দিয়ে কিশোর গ্যাং আছে বলে আমাদের জানা নেই।

তবে মহানগরীর টঙ্গীতে সম্প্রতি দু’জন স্কুল শিক্ষার্থী খুনের ঘটনা ঘটেছে। ওই খুনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন কিশোর অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণ নিয়ে জানতে চাইলে চান্দনা চৌরাস্তা সংলগ্ন ভাষা শহীদ কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক বলেন, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, অতিমাত্রায় ইন্টারনেট আসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়া ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ঘাটতির কারণে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এরই জেরে কিশোররা অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ছেন।

মঙ্গল ও বুধবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি সংলগ্ন রানী বিলাস মণি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি পকেট গেট রয়েছে। ভেতরে মাঠের একটি বড় অংশজুড়ে প্যান্ডেল টানানো রয়েছে।

গত ২৮ এপ্রিল গাজীপুর জজ আদালতের আইন সহায়তা দিবস পালন উপলক্ষে সিটি কর্পোরেশন প্যান্ডেলটি তৈরি করে। ওই প্যান্ডেলের ভেতরে লাল-নীল রঙের ছাতার নিচে ইউনিফরমধারী স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জোড়ায় জোড়ায় গভীর প্রেমে মগ্ন থাকতে দেখা যাচ্ছে।

এই প্যান্ডেলে সংঘবদ্ধ হয়ে কিশোরদের ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। এই মাঠ ঘিরে চা-সিগারেট, বাদাম, চানাচুর, ঝালমুড়ি, আলুরচপ-বেগুনিসহ প্রায় অর্ধশত ভাসমান দোকানও গড়ে উঠেছে।

এছাড়া গাজীপুর শহরে জোর পুকুরের উত্তর পাড়ে গভীর রাত পর্যন্ত কিশোরদের আড্ডা দিতে দেখা যায়। এছাড়া শ্মশান ঘাট, বারেকের টেক, ফুলস্টপ গলিসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের মোড়ে, লোকালয়ে দাঁড়িয়ে নারীদের ইভটিজিং ছাড়াও বীরদর্পে সিগারেট ফুঁকতে দেখা গেলেও এদের বিরুদ্ধে কাউকে মুখ খুলতে দেখা যায়নি। এদের বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে।

এছাড়া গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের উত্তর ছায়াবীথি, দক্ষিণ ছায়াবীথি, বরুদা, মধ্যপাড়া, রথখোলা, ভোড়া, হাজীবাগ, ছোট দেওড়া, নীলের পাড়া, কানাইয়া, সাহা পাড়া, বিলাসপুর, মারিয়ালী, কলাবাগান, লক্ষ্মীপুরা, থানা কাউন্সিল, শিমুলতলী, পোড়াবাড়ি, সালনা, দীঘির চালা এলাকায় কিছু কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।

এদের মধ্যে আধিপত্য, মাদক, নারী, স্ট্যান্ড দখল, সিনিয়র, জুনিয়র দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, মারামারি, কোপাকুপির ঘটনাও ঘটছে। গাজীপুর মহানগরীর নীলের পাড়া (পূর্ব পাড়া) এলাকার দিনমজুর মোতালিব মিয়ার ছেলে রনি শাহর নেতৃত্বে একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।

এ গ্রুপে জাহিদ, ইমন, শাহীন, আল আমিন, সোহান, লিমনসহ ১৫-১৬ জন সদস্য সক্রিয়। সম্প্রতি ওই এলাকায় বিয়েবাড়ি বেড়াতে এসে দুই মহিলা তাদের পরনের সোনার গহনা ও মোবাইল খুইয়েছেন। বিয়েবাড়ি থেকে বের হওয়ার পর অস্ত্র ঠেকিয়ে তাদের স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইল কেড়ে নেয়া হয়। এ জন্য এই গ্রুপের জাহিদদের দায়ী করা হচ্ছে।

এ গ্রুপের অপর সদস্য শাহীন চলতি সপ্তাহে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সোহেল মাস্টারকে পিটিয়ে আহত করে। সোহেল মাস্টার থানায় অভিযোগ করারও সাহসও পায়নি।

এই গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই ও হানাহানির একাধিক ঘটনার পর এরা পুলিশের জালে ধরা পড়লেও পরে এক যুবলীগ নেতার মধ্যস্থতায় তারা ছাড়া পান।

এছাড়া উত্তর ছায়াবীথি এলাকার স্থানীয় এক প্রভাবশালী পিতার সন্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরও একটি গ্যাং গ্রুপ। এছাড়া জেলা শহরে হিট লিস্টে রয়েছে হিমেল, কালু, রাসেলসহ একাধিক ভয়ঙ্কর অপরাধী। এদের বিরুদ্ধে মাদক, চুরি, ছিনতাই, খুনের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×