ডেঙ্গু চিকিৎসা

হাসপাতালে ব্যতিক্রমী ঈদ চিকিৎসক রোগী স্বজনের

  হাসিব বিন শহিদ ১৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাসপাতালে ব্যতিক্রমী ঈদ চিকিৎসক রোগী স্বজনের

প্রতিবারই ঈদের দিন ছেলেকে নিয়ে ফাঁকা ঢাকায় ঘুরে বেড়ানো রাশেদ রাব্বির এবারের ঈদ কেটেছে হাসপাতালে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬ বছরের একমাত্র ছেলে রুদ্রকে ঈদের দু’দিন আগে ধানমণ্ডি সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফলে রাশেদ রাব্বি দম্পতির ঈদ কেটেছে হাসপাতালেই।

শুধু তাই নয়, চিকিৎসকদের নিয়ে আগে অনেক অভিযোগ থাকলেও এবার ডেঙ্গু মোকাবেলায় তাদের ভূমিকা ছিল প্রশংসিত।

রোগী নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসিএইচ) একজন চিকিৎসকের ব্যস্ততাই তার প্রমাণ মেলে। ঈদের দিন ডিএমসিএইচের সপ্তমতলার ডক্টরস রুমের দরজা ঠেলে ঢুকছিলেন একজন সাংবাদিক। চিকিৎসক একমনে রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখছিলেন।

পাশেই উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীর স্বজন চিকিৎসকের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। পরিচয় দিয়ে কক্ষে ঢোকার অনুমতি চাইতেই মুখ তুলে চিকিৎসক বললেন, ‘আমার এক রোগীর অবস্থা ভীষণ ক্রিটিক্যাল, কথা বলার মতো অবস্থাতে নেই, প্লিজ কিছু মনে করবেন না।’ নাম জিজ্ঞেস করতেই চোখ তুলে বললেন, ‘আমি অনারারি মেডিকেল অফিসার সেজুতি সরকার।’

রাজধানী ও বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে সরেজমিন ঘুরে এভাবেই রোগী-স্বজন-চিকিৎসকের ঈদের ছুটি পার করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে চিকিৎসক ও নার্সরা নিরবচ্ছিন্নভাবে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়, গত জানুয়ারি থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৬ হাজার ৩৫১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৮ হাজার ৪৪২ জন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন।

কথা হয় ডিএমসিএইচের সহকারী পরিচালক ডা. মো. নাছির উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোবাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। দিন-রাত সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

সাধারণত ঈদের দিন অনেকেই ছুটি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করে থাকেন। এবার ব্যতিক্রম। স্বজনেরা যেমন হাসপাতালে ঈদ কাটিয়েছেন, আমরাও রোগীদের সেবায় হাসপাতালেই ঈদ কাটিয়েছি। এতে তিল পরিমাণ দুঃখ নেই। কারণ রোগীদের সেবা করাই ডাক্তারের ধর্ম।

ডিএমসিএইচের ষষ্ঠতলার মেডিসিন ওয়ার্ডে কথা হয় ডা. রিমা আক্তারের সঙ্গে। ঈদের দিনে ডিউটি করছেন, কেমন লাগছে জানতে চাইতে ডা. রিমা বলেন, ‘পরিবার ছেড়ে হাসপাতালে আছি, ডিউটি করছি। এতে আমাদের কিন্তু মন খারাপ হচ্ছে না, মন খারাপ হচ্ছে পরিবারের মানুষগুলোর। আমরা যেহেতু চিকিৎসক যে কোনো পরিস্থিতিতে আমাদের কাজ করতে হবে এটাই আমাদের ধর্ম, আমরা সে মানসিকতা নিয়েই এ পেশায় আছি, আমাদের পূর্বসূরিদেরও তাই দেখেছি।’

ঈদের দিন রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন গোলাম মোস্তফা (২৫)। প্রতি বছর তিনি পরিবারসহ গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে ঈদ উদযাপন করতেন।

তার অসুস্থতার কারণে পরিবারের অন্যরাও গ্রামে যেতে পারেননি। ঈদের আনন্দের পরিবর্তে দেখা গেছে তাদের মলিন মুখ, কপালে চিন্তার বলিরেখা। মোস্তফার মতো অনেকেরই ঈদের দিন কেটেছে হাসপাতালে।

কেউ ১০ দিন, কেউ এক সপ্তাহ, কেউবা ৫ দিন ধরে হাসপাতালে। ঈদের দিন সকালে মুগদা হাসপাতালে গোলাম মোস্তফার বাবা মোতালেব হোসেন (৫৫) বলেন, ৭ দিন ধরে ছেলেটাকে নিয়ে হাসপাতালে। সিট নেই। কাপড় বিছিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

হাসপাতালে জুঁই নামের এক নারী বলেন, ঈদের দু’দিন আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছি। রক্তের প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে, আতঙ্কে আছি। বাঁচলে অনেক ঈদ আসবে।

ঈদের দিন ডিএমসিএইচ, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, মিটফোর্ড, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ধানমণ্ডি সেন্ট্রাল হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসাপাতাল ঘুরে ডেঙ্গু রোগীর স্বজনদের কাউকে রক্ত সংগ্রহ করা, কাউকে রিপোর্ট নিয়ে দৌড়ঝাঁপ আবার কাউকে প্রিয়জনকে নিয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে।

ঈদের দিন কথা হয় যশোরের চৌগাছা উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের আবু বকর সিদ্দিকের (৩০) সঙ্গে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, এই প্রথম হাসপাতালে ঈদ কেটেছে।

আমি হাসপাতালে থাকায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি। আর কাউকে যেন এভাবে ঈদ না করতে হয়। হাসপাতালে আবু বকর সিদ্দিকের ভাই লিয়াকত আলী বলেন, এবার ঈদ কিভাবে চলে গেল বুঝতেই পারিনি। সবার মনে কষ্ট।

যুগান্তরের যশোর ব্যুরো ইন্দ্রজিং রায় জানান, যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নারী ও শিশু ছাড়া ৪০ জন পুরুষ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। রোগীদের পরিবারে এবার ঈদের আনন্দ নেই।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নারে দায়িত্বরত সেবিকা সঞ্চিতা অধিকারী যুগান্তরকে বলেন, ঈদের দিন রোগীদের পাশে থাকতে পেরে ভালো লাগছে। যশোর শহরের চাঁচড়া এলাকার বাসিন্দা শিক্ষার্থী জাহিদ আল হাসান শুভ বলেন, জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছি। ঈদের আনন্দ মাটি হয়েছে। এমন ঈদ যেন কারও জীবনে না আসে।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মাগুরা গ্রামের মাহবুবুর রহমান বলেন, খুব ভুগছি। শরীরটা ভালো নেই। পরিবারের সবাই হাসপাতালে। অথচ গ্রামে ঈদের নামাজ আমারই পড়ানোর কথা ছিল। তার বাবা আবদুল আজিজ বলেন, অসুস্থ ছেলের কাছে পরিবারের সবাই। এবার আমাদের ঈদের আনন্দ নেই।

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×