কিশোর গ্যাং

তুচ্ছ ঘটনায় খুনোখুনিতে ফেনীর কিশোররা

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে-এসপি খোন্দকার নুরুন্নবী

  যতন মজুমদার, ফেনী ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফেনী জেলায় অন্তত ১০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা এখন বেপরোয়া, ভয়ংকর। এদের রাজত্ব জেলা শহর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত। বড় বড় হাটবাজার ঘিরেও এদের প্রভাব। মাদকের জগতেও রয়েছে এদের বিচরণ। সংঘবদ্ধ হয়ে ছিনতাই, নারী উত্ত্যক্ত, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, হানাহানি থেকে শুরু করে খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়েছে এরা।
ফাইল ছবি

ফেনী জেলায় অন্তত ১০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা এখন বেপরোয়া, ভয়ংকর। এদের রাজত্ব জেলা শহর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত। বড় বড় হাটবাজার ঘিরেও এদের প্রভাব। মাদকের জগতেও রয়েছে এদের বিচরণ। সংঘবদ্ধ হয়ে ছিনতাই, নারী উত্ত্যক্ত, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, হানাহানি থেকে শুরু করে খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়েছে এরা।

রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও এদের ডাক পড়ে। উঠতি বয়সীদের এ ভয়ংকর রূপ ভাবিয়ে তুলেছে অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। ফেনীতে কান পাতলেই ‘কসাই’ ‘হিমিল’ ‘শান্ত’ ‘জেকে’ ‘পিটু’ ‘চাকমা জাবেদ’সহ একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা শোনা যায়।

কথা হয় ফেনী জেলা পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, শিশু ও কিশোর অপরাধ এবং কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। সহযোগিতা দরকার অভিভাবকদেরও; তাহলেই শিশু-কিশোর নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে। কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এক মাস ধরে কাজ করছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে সমাবেশ করে সন্ধ্যার পর কিশোর ও স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের রাস্তাঘাটে আড্ডা না দেয়ার কথা বলা হচ্ছে।

সোনাগাজী উপজেলায় এ ধরনের অন্তত তিনটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের পর নুরউদ্দিন-শামিম গ্রুপের অনেকেই কারাগারে থাকায় গ্রুপটি এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। ২৭ মার্চ আলিম পরীক্ষার্থী রাফির যৌন নিপীড়নের মামলা কেন্দ্র করে গত ৬ এপ্রিল নুরউদ্দিন ও শামিম গ্রুপ তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। দেশজুড়ে আলোচিত ওই ঘটনায় নুরউদ্দিন ও শামিমসহ গ্রুপের বেশ কয়েকজন সদস্য এখন কারাগারে।

নুরউদ্দিন-শামিম গ্রুপের নিষ্ক্রিয়তায় সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ইমাম উদ্দিন ভূঞা গ্রুপের (সিনিয়র গ্রুপ) আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা কিশোর গ্যাং ‘তুষার গ্রুপ’ এখন এলাকা দাবড়ে বেড়াচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে- সোনাগাজীর এক মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে এবং প্রবাসীর স্ত্রী ও তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিজের কব্জায় নিতে ব্যর্থ হয়ে ইমাম ভূঞা তারই লালিত তুষার গ্রুপকে লেলিয়ে দিয়েছেন মা-মেয়ের ওপর। মা-মেয়েকে প্রস্তাবে রাজি করাতে না পেরে তাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে নানা আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন।

শেষপর্যন্ত গত ৬ জুলাই প্রবাসীর স্ত্রী তার সন্তানকে নিয়ে জেলার এসপি ও র‌্যাবের কাছে ইমাম ভূঞা ও তুষারদের বিরুদ্ধে নানা হয়রানির লিখিত অভিযোগ করেন। এরা এতটাই প্রভাবশালী যে, শেষপর্যন্ত জীবনের নিরাপত্তা না পেয়ে মা-মেয়ে তাদের বাসাবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

গত ১১ আগস্ট আধিপত্যের জেরে সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের চর সোনাপুর গ্রামের দাসপাড়ার কিশোর সাঈদ আনোয়ারের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ ছাত্রলীগ নেতা শামীমকে হত্যা করে। শামীম সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের মুহুরী প্রজেক্ট সংলগ্ন গ্রামের কৃষক মুনাফ মিয়ার ছেলে।

সাঈদ আনোয়ার ও তার গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদকের একাদিক মামলা আছে। সোনাগাজী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পৌর কাউন্সিলর ইমাম উদ্দিন ভূঞা বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা ও আমার সম্মানহানির চেষ্টা। আমার কোন কিশোর গ্রুপ নেই। তুষার পাটোয়ারী আমার নিকটাত্মীয়।

ফেনী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) সাজেদুল যুগান্তরকে বলেন, গত কয়েক মাসে ফেনীর শহরতলিতে যেসব অপরাধ হয়েছে তার অধিকাংশই শিশু এবং কিশোররা ঘটিয়েছে। তারা নানা গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে এদের বেশিরভাগই বহিরাগত। ফেনীতে সাম্প্রতিক ৫টি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, খুনের অপরাধে জড়িতদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর।

সূত্র জানায়, ফেনী শহরের গাজীক্রস রোডের হাসান আলী ভূঞা বাড়িসংলগ্ন হক ম্যানশন থেকে গত ৩০ মে রাতে একটি স্কুলের পিয়ন সফিউল্যার (৬০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মাঈন উদ্দিন ভূঞা যে চারজনকে গ্রেফতার করেছে তারা সবাই কিশোর।

এরা হচ্ছে- বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ থানার পঞ্চকরণ গ্রামের চাঁন মিয়া হাওলাদারের ছেলে সোহেল হাওলাদার (১৯) ও তার ভাই রনি (১৬), একই থানার সুনিজর গ্রামের কাজীবাড়ির আব্বাস খানের ছেলে মো. ইয়াছিন সাকিব (১৬), লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানার চর মোহনা গ্রামের আলীমুদ্দিন দেওয়ান বাড়ির জয়নাল আবেদীনের ছেলে মেহেদী হাসান রাব্বি (১৬)। চারজনই চুরি করতে গিয়ে সফিউল্যাকে খুন করার কথা স্বীকার করেছে। গত ১৯ মে সদর উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের উত্তর ছনুয়া গ্রামে নিখোঁজের দুই দিন পর বেলায়েত হোসেন (৪৫) নামের এক পোলট্রি ব্যবসায়ীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জড়িত সন্দেহে ওই দিন ফার্মের কর্মচারী মো. ফুজায়েল আহম্মদকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ফেনী মডেল থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম ও বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর ওমর হায়দার জানান, মনোমালিন্যের জের ধরে বেলায়েতকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে ফুজায়েল। ফুজায়েল নেত্রকোনা জেলার বারহাটি থানার আবদুল ওহাবের ছেলে।

এদিকে নিখোঁজের এক সপ্তাহ পর ৭ এপ্রিল ভোরে স্কুলছাত্র আরাফাত হোসেন শুভর (১৪) অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আরাফাত পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের তেমুহনী মাদার কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। শুভ দক্ষিণ কাশিমপুর কালা মিয়া কন্ডাক্টর বাড়ির প্রবাসী ইমাম হোসেনের ছেলে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সুরেজিৎ বড়ুয়া জানান, এ ঘটনায় ৮ এপ্রিল পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের মধ্যম মাথিয়ারা গ্রামের আবদুস সালাম মিস্ত্রী বাড়ি থেকে কামাল উদ্দিনের ছেলে ও তেমুহনী মাদার কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ইসমাইল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। তুচ্ছ ঘটনায় ইসমাইল হোসেন (১৪) হত্যার কথা স্বীকার করেছে তারা।

এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি শহরের পাঠানবাড়ী এলাকা থেকে নিখোঁজ স্কুলছাত্র আরাফাত হোসেনের (১২) লাশ পরের দিন পাঠানবাড়ির জেবি টাওয়ারের সামনে থেকে উদ্ধার করা হয়। ফেনী মডেল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, ঘটনার মূলহোতা কিশোর সাব্বিরকে গ্রেফতার করা হয়। সাব্বির ও তার সহযোগীরা সপ্তম শ্রেণির ছাত্র আরাফাতকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে আদালতে। জবানবন্দিতে সাব্বির জানিয়েছে, মুন্না ও তুহিনসহ চারজন পা ভাঙ্গার পর আরাফাতকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার অধিবাসী সাব্বির শ্রমিক হিসেবে আরাফাতদের নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করত।

ফেনীর সিনিয়র আইনজীবী গিয়ান উদ্দিন নান্নু ও ফেনীর অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী জেলা খেলাঘর কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম নান্টু যুগান্তরকে জানান, ফেনীতে কিশোর অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। কিশোর অপরাধীদের দিয়ে কতিপয় রাজনৈতিক নেতা তাদের অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পরিবহনের চাঁদা আদায়েও তাদের ব্যবহার করা হয়। ফলে এরা দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। অনেকের কাছেই দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এদের অবস্থান করতে দেখা যায়। এক শ্রেণির মানুষ তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×