কিশোর গ্যাং: ধরন পাল্টে কিশোররা খুন ধর্ষণে জড়িয়ে পড়ছে

টাঙ্গাইলের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে স্কাউট আন্দোলন জোরদার করা হয়েছে -ডিসি শহীদুল ইসলাম

  জাফর আহমেদ, টাঙ্গাইল ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোর গ্যাং
কিশোর গ্যাং। প্রতীকী ছবি

টাঙ্গাইলে কিশোরদের সুনির্দিষ্ট কোনো গ্যাং না থাকলেও সংঘবদ্ধ কিশোর অপরাধ থেমে নেই। প্রযুক্তির ‘কল্যাণে’ কিশোরদের মধ্যে অপরাধের ধরন পাল্টানোর প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

নানা ছুতোয় ‘পার্টির আয়োজন’ করা, হর্ন বাজিয়ে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, রাস্তার মোড়ে মোড়ে নারীদের উত্ত্যক্ত করা টাঙ্গাইলে একরকম নিয়মে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে টাঙ্গাইল শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যান, শহরের ক্যাম্পুল মার্কেট, আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন লেকের পাড়, টাঙ্গাইল গার্লস স্কুল মোড়সহ আরও বেশকিছু স্থানে আড্ডার নামে চলে ১৪-২০ বছর বয়সী কিশোরদের বখাটেপনা।

অভিভাবক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতার সঙ্গে ‘বড়ভাইদের’ প্রশ্রয়ে এরা দিন দিন হয়ে পড়ছে নিয়ন্ত্রণহীন। বিশেষ করে দল বেঁধে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ঘরের উঠতি বয়সী এই কিশোরদের মোটরসাইকেলের রেস স্থানীয়দের জন্য আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাঙ্গাইলে এরকম একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।

কথা হয় মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে। তারা বলেন, কিশোর গ্রুপগুলোর মধ্যে পাল্লা ভারি করার একটা প্রবণতা রয়েছে। দল বড় হলে কথিত বড়ভাইদের কাছেও কদর বাড়ে।

তাছাড়া খেলার মাঠের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, সংঘাত ও মারামারিতে বিজয়ী হওয়াসহ রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে টাঙ্গাইল মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম জানান, মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদসহ পারিবারিক নানা অশান্তির কারণে তাদের সন্তানরা স্কুলে ঝরে পড়ছে।

সেখান থেকেই তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে মাদকসেবন ও মাদক বহন থেকে শুরু করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিশোর বয়সেই তারা হয়ে যাচ্ছে অপরাধী।

কিশোরদের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কথা স্বীকার করে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম বলেছেন, কিশোররা যাতে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে না পরে, এজন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কাউট আন্দোলন জোরদার করা হয়েছে।

স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মানুবর্তিতা ও ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। ফলে স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কমে আসছে। কিশোর অপরাধ যাতে শূন্যের কোঠায় চলে আসে, সেজন্য স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক শিক্ষা দেয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি শহরের আদালতপাড়ার একদল কিশোর সন্ধ্যার পর পার্শ্ববর্তী মিরের বেতকায় দোকানের সামনে মদ্যপান করছিল। স্থানীয় লোকজন তাদের বাধা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তারা চলেও যায়।

কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকজন কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে ওই স্থানে ফিরে এসেই উপস্থিত লোকজনের ওপর হামলা চালায়। তাদের এলোপাতাড়ি ধারালো অস্ত্রের কোপে অন্তত ৪ ব্যক্তি আহত হন।

পরে আহতদের উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া ২৮ মার্চ রাতে দুই গ্রামের যুবকদের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী ইউনিয়নের রক্ষিতবেলতা গ্রামে ৩ বছরের মেয়ের সামনে তার মা রোজিনা বেগমকে গলা কেটে হত্যা করে একদল কিশোর।

টাঙ্গাইলের সংঘবদ্ধ কিশোররা শুধু মারামারি-কাটাকাটিতেই নয়, ধর্ষণ এবং মাদক বহন ও সেবনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। ১২ এপ্রিল রাতে টাঙ্গাইল নতুন বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল এক দম্পতি।

এ সময় কয়েকজন বখাটে কিশোর ওই দম্পতিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে গৃহবধূর স্বামীকে মারধর করে স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে সারা রাত ধর্ষণ করে। খবর পেয়ে ওইদিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে পৌর এলাকার সাবালিয়া চোরজানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা থেকে ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে বিভিন্ন স্থনে অভিযান চালিয়ে কোদালিয়ার আলম মিয়ার ছেলে ইউসুফ রানা, আবদুল রশীদের ছেলে মো. রবিন, মো. রবিকুল ইসলামের ছেলে তানজীরুল ইসলাম তাছিন, তালতলা মোড়ের মৃত মজনু মিয়ার ছেলে মো. মফিজ, একই এলাকার আল বিরুনীর ছেলে ইব্রাহিম ও দেওলা গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে জাহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তারা ধর্ষণের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।

২০ মে দুপুরে মধুপুরে বাড়িতে একা পেয়ে শতবর্ষী এক বৃদ্ধাকে ১৫ বছরের সোহেল নামের কিশোর ধর্ষণ করে। পরে এ ঘটনায় ২২ মে ওই বৃদ্ধার ছেলে বাদী হয়ে মধুপুর থানায় মামলা করলে পুলিশ রাতেই ধর্ষক সোহেলকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার সোহেল ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।

কিশোরদের বিপথগামী হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এই বয়সী ছেলেদের পড়ার টেবিল ছাড়াও থাকার কথা খেলার মাঠে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

সেদিকে না গিয়ে কাউকে কাউকে টাকার নেশায় মত্ত থাকতে দেখা গেছে। মাদকসেবনসহ নেশার টাকা জোগাড় করতে এরা জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাইয়ের মতো ঘৃণ্য কাজেও। স্বার্থের লোভে বন্ধুকে হত্যার দৃষ্টান্তও রয়েছে টাঙ্গাইলে।

১৪ জুন বিকালে সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের বাহিরশিমুল নানাবাড়ি থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হওয়ার পরই নিখোঁজ হয় সজিব মিয়া। ১৬ জুন দুপুরে কালিহাতী উপজেলার হাতিয়ায় গলায় রশি ও মুখে স্কচটেপ প্যাঁচানো অবস্থায় সজিবের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশি তদন্তে এর সঙ্গে পুলিশ কনস্টেবল মোশারফ হোসেন ও সজিবের বন্ধু মো. সজিবের সম্পৃক্ততা পায়।

পরে এরা দু’জনই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। জেলার বেশকিছু কিশোর মাদকসেবনেও জড়িয়ে পড়েছে। নেশার ঘোরে প্রায়ই এদের অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে দেখা গেছে।

নিজেদের সংগঠিত করার জন্য এরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারকে ব্যবহার করছে হরদম। টাঙ্গাইলে সক্রিয় প্রতিটি গ্রুপের সদস্যদের কাছে রয়েছে ধারালো অস্ত্র। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিজেদের মধ্যেও খুনাখুনির ঘটনাও ঘটছে।

সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব থেকে ঘটছে সংঘাত-হানাহানি। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এদের নেটওয়ার্ক। কথা হয় র‌্যাব ও পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা বলেছেন, কিশোরদের বখে যাওয়ার পেছনে পরিবারের উদাসীনতা অনেকাংশে দায়ী।

মাদকের ছোবলে এরা অশান্ত হয়ে উঠছে। আর এই গ্যাং কালচারে শিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত দুই শ্রেণির কিশোররাই সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে জাহির করার একটা প্রবণতা ভীষণভাবে কাজ করছে। কথা হয় টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়ের সঙ্গে।

তিনি বলেন, কিশোর অপরাধে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকজনকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে টাঙ্গাইলে যেন আর কিশোর অপরাধ না বাড়ে, এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×