যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকার

সফলতার সঙ্গে আছে ব্যর্থতাও: ফরিদপুর পৌর মেয়র

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাকি প্রতিশ্রুতি পূরণের অঙ্গীকার

  জাহিদ রিপন, ফরিদপুর ব্যুরো ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফরিদপুর পৌর মেয়র
ফরিদপুর পৌর মেয়র শেখ মাহাতাব আলী মেথু। ছবি: যুগান্তর

ফরিদপুর শহর পৌরসভায় রূপান্তর হয় ১৮৬৯ সালে। ১৭ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ড ছিল। পৌরসভাটি ১৯৮৩ সালে ‘গ’ থেকে ‘খ’ এবং ১৯৮৬ সালে ‘খ’ থেকে ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়।

বর্তমানে ৯টি ওয়ার্ড ভেঙে এবং আয়তন বর্ধিত করে ২৭টি ওয়ার্ডে উন্নীত করা হয়েছে। ফলে পৌরসভার আয়তন বেড়ে হয়েছে ৬৬ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার। পৌর এলাকার ভোটার ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৪ জন।

সাবেক শ্রমিকনেতা হাসিবুল হাসান লাবলু দীর্ঘদিন ছিলেন পৌর চেয়ারম্যান। দুর্নীতির কারণে তিনি কারাবরণ করলে তৎকালীন ওয়ার্ড মেম্বার থেকে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে এবং পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন শেখ মাহাতাব আলী মেথু। তারপরের নির্বাচনগুলোয় তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়ে আসছেন।

সব মিলে ২০ বছরের অধিক সময় তিনি মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। এ দীর্ঘ সময়ে পৌর এলাকার বেশ উন্নয়ন হয়েছে। তারপরও রয়ে গেছে অনেক সমস্যা।

জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশন, ময়লা-আবর্জনা, পুকুর-ডোবার কচুরিপানার বিস্তার, মশার উপদ্রব, সড়কে কুকুরের উপদ্রব, রাস্তা-ফুটপাথ-খাল দখল; মাদক, সন্ত্রাস- এ সমস্যাগুলো এখনও দূর করতে পারেননি তিনি। এছাড়া তার বড় ব্যর্থতা হল- পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত না করতে পারা। এসব কারণে সমালোচিতও তিনি।

দীর্ঘ সময় পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালনকারী শেখ মাহাতাব আলী মেথু নিজের সফলতা ও ব্যর্থতার কথা বলতে যুগান্তরের মুখোমুখী হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তার প্রায় ৯০ ভাগ পূরণ করতে পেরেছি।

কিছু প্রতিশ্রুতি বাকি রয়েছে। আশা করছি, আগামী নির্বাচনের আগেই তা বাস্তবায়ন করতে পারব। দায়িত্ব নিয়েই পৌরসভাকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ ব্যাপারে অনেকটাই সফল হয়েছি।

ব্যর্থতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশন ও ফরিদপুরকে বিভাগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম; কিন্তু তা পারিনি। জলাবদ্ধতা নিরসন ও মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে।’

মেয়র বলেন, ‘পৌরসভার দায়দেনা ছিল ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা। দায়িত্বভার গ্রহণের পর এই দেনা প্রায় পরিশোধ করেছি। পৌর এলাকার রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার ৯০ ভাগ সম্পন্ন করেছি। আগে পিচঢালা রাস্তা ছিল।

এর মধ্যে ১০ থেকে ১২টি সিমেন্ট-পাথর দিয়ে আরসিসি ঢালাই করা হয়েছে। কিছু রাস্তার কাজ বৃষ্টিবাদলের কারণে বন্ধ রয়েছে। আবহাওয়া ভালো হলেই আবার কাজ শুরু হবে।

দীর্ঘ চেষ্টার পর আলীপুর মোড় থেকে বাদামতলী সড়ক পর্যন্ত খালের জায়গার মধ্য দিয়ে কংক্রিটের ড্রেন নির্মাণ এবং পাশে রাস্তা নির্মাণ কাজ শুরু করতে সক্ষম হয়েছি। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পৌরসভা এবং পৌরবাসীর উন্নয়নে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এই সময়ের বাইরেও পৌরবাসীর কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি।’

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মেয়র বলেন, ‘পৌর এলাকার রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। এডিস মশার বিস্তার ঠেকাতে প্রতিদিনই সড়ক ও ড্রেন পরিষ্কার রাখার কাজ চলছে। কখনাও নিজেরা আবার কখনও বিভিন্ন এনজিওর সহায়তা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। মশা নিয়ন্ত্রণে ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।’

শহরের ব্যস্ততম সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ রোডের পাশের ডোবা, অনাথের মোড় রাজেন্দ্র কলেজ হোস্টেলের পেছনে কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনার কারণে মশার বিস্তার বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে পৌর মেয়র বলেন, ‘ দ্রুত এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে।’

নিজের ব্যর্থতার বিষয়ে মেয়র শেখ মাহতাব আলী বলেন, ‘পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশন ও ফরিদপুরকে বিভাগ বাস্তবায়ন করতে না পারা আমার বড় ব্যর্থতা।

এ বিষয়ে আমাদের বর্তমান এমপি ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগে পৌর এলাকায় ৯টি ওয়ার্ড ছিল, বর্তমানে তা বর্ধিত করে ২৭টি ওয়ার্ড হয়েছে।

৯টি ওয়ার্ডের জন্য সরকারি যে ভাতা ছিল, বর্তমানে ২৭টি ওয়ার্ডের জন্য তা আসে। এ কারণে ওয়ার্ডগুলোকে চাহিদামাফিক ভাতা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

মেয়র বলেন, ‘আমার আরেকটি ব্যর্থতা হচ্ছে- পৌরসভার কর্মকর্তা, কর্মচারী তথা স্টাফদের ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা সঠিকভাবে প্রদান করতে না পারা।’

শহরের পূর্বখাবাসপুর শান্তিবাগ সড়ক, কালামের মোড়ের পাশের ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রামকৃষ্ণ মিশনের পাশের সড়কের ড্রেনেজ ব্যবস্থার বিষয়ে মেয়র বলেন, ‘পৌরবাসী জায়গা না ছাড়ার কারণে এ কাজগুলো করা দুরূহ হয়ে পড়েছে।’

দুর্নীতির বিষয়ে মেয়র বলেন, ‘পৌরসভার দুর্নীতি প্রায় রোধ করতে পেরেছি। দুর্নীতির কারণে লাইসেন্স ইন্সপেক্টর ও নাগরিক সার্টিফিকেট বিভাগের দুইজনকে শোকজ করা হয়েছে।

পৌরসভাকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করেতে পেরেছি- সে দাবি করব না। ভেকু-ট্রাকে এখনও অনিয়ম রয়ে গেছে। এর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিচ্ছি। পৌরসভাকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

মেয়র জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল উদ্ধার এবং সড়ক, ফুটপাত ও খাসজমি উদ্ধারে জোরালো অভিযান চালানো হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌর এলাকায় ৩০ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘পৌরসভার মধ্যে প্রতিটি ওয়ার্ডে সভা, সেমিনার করে এসব বিষয়ে জনগণকে সচেতন করছি। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধীদের তালিকা করা হচ্ছে। শিগগিরই এদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে।’

তিনি বলেন, ‘পৌরসভার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। গভর্নিংবডির সভাপতিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।’

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন এ হাসপাতালে ২ ট্রাক ক্লিনিক্যালি বর্জ্য জমা হয়। বর্তমানে ডাস্টবিন না থাকায় এলাকার পরিবেশ খারাপ হচ্ছে।

তাই একটি আধুনিক ডাস্টবিন খুবই জরুরি। এ ব্যাপারে পৌর মেয়র বলেন, ‘জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। অচিরেই একটি আধুনিক ডাস্টবিন করা হবে।’

শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এ কারণে স্কুল ও কলেজগামী ছেলে-মেয়েদের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মেয়র বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে কুকুর নিধন বন্ধ আছে।

শহরের বেওয়ারিশ কুকুর ধরে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। আর যাদের কুকুর তাদের হেফাজতে রাখতে হবে, যাতে পৌরবাসীর চলাফেরায় কোনো সমস্যা না হয়।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×